বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা (ড্যাপ) ২০২২-২০৩৫-এর তিনটি গুরুত্বপূর্ণ বিধান সংশোধন করেছে সরকার। এর আওতায় আবাসিক প্লটের জন্য অতিরিক্ত ফ্লোর এরিয়া রেশিও (এফএআর) সুবিধা প্রদান, তিনটি প্লটের জমির শ্রেণী পরিবর্তন এবং পানি প্রবাহ এলাকার বিধিমালায় সংশোধনী আনা হয়েছে।
এসব সংশোধনী এনে গত ১৪ অক্টোবর গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় গেজেট প্রকাশ করে। তবে এ নিয়ে নগর পরিকল্পনাবিদদের মধ্যে সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে। তারা পদ্ধতিগত অনিয়ম এবং এর ফলে পরিবেশের ওপর সম্ভাব্য নেতিবাচক প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছেন।
মন্ত্রণালয়ে এক বোর্ড সভায়ও এই পরিবর্তনগুলো সমালোচনার মুখে পড়ে। সভা সূত্র জানায়, এ বিষয়ে রাজউক একটি বিবৃতি দিয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেবে বলে সিদ্ধান্ত হয়েছে।
মন্ত্রণালয়ের জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. আলমগীর হোসেন বলেন, ‘রাজউক আগামীকাল (সোমবার) এ বিষয়ে একটি বিবৃতি দেবে।
তবে রাজউক চেয়ারম্যান মো. রিয়াজুল ইসলাম এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
সংশোধিত বিধিমালা অনুযায়ী, পূর্বাচল ও ঝিলমিল প্রকল্পের যেসব আবাসিক প্লটের আয়তন অন্তত পাঁচ কাঠা, সেগুলোর মালিকেরা অতিরিক্ত শূন্য দশমিক ৫ এফএআর সুবিধা পাবেন। তবে এই সুবিধা পেতে হলে ১৫ অক্টোবর থেকে আগামী ছয় মাসের মধ্যে ভবনের নকশা অনুমোদনের আবেদন করতে হবে।
এই সুবিধা নিতে হলে চূড়ান্ত অনুমোদন পাওয়ার এক বছরের মধ্যে ভবনের নির্মাণকাজ প্লিন্থ লেভেল (ভিত্তি) পর্যন্ত শেষ করতে হবে। তাতে ব্যর্থ হলে নকশা অনুমোদনের জন্য যে ফি দেওয়া হয়েছিল, তার ২০ গুণ জরিমানা গুনতে হবে।
তবে রাস্তার প্রশস্ততা, সেটব্যাক, গ্রাউন্ড কভারেজ এবং ভবনের উচ্চতা সংক্রান্ত বর্তমান নিয়মগুলো আগের মতোই বহাল থাকবে।গেজেটে শ্যামপুর ও কদমতলীর আইলবাহার মৌজার ১ হাজার ৪৭, ১ হাজার ৪৮ এবং ১ হাজার ৫০ নম্বর প্লটের শ্রেণি পরিবর্তনের কথা বলা হয়েছে। প্লটগুলো এখন ‘উন্মুক্ত স্থান’ নয়, বরং ‘ভারী শিল্প এলাকা’ হিসেবে ব্যবহারের সুযোগ থাকবে।
এই পুনঃশ্রেণীকরণের জন্য বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ছাড়পত্র লাগবে। এ ছাড়া, নদীর তীর রক্ষা সংক্রান্ত নিয়মকানুন মেনে চলতে হবে এবং ভবন নির্মাণের জন্য রাজউকের অনুমোদন নিতে হবে।
আরেকটি সংশোধনী আনা হয়েছে ‘পানি প্রবাহ এলাকা’ বিষয়ক ৭.৫.৮(খ) ধারায়। নতুন নিয়ম অনুযায়ী, জমির ব্যবহার নিয়ে কোনো অসামঞ্জস্য দেখা দিলে এখন থেকে প্রস্তাবিত ভূমি ব্যবহারের নির্দেশিকা (যার মধ্যে অনুমোদিত আবাসিক নকশাও অন্তর্ভুক্ত) অনুযায়ী ব্যবহারের ধরন ঠিক করা হবে। তবে খাল, পুকুর, রাস্তা, জলাশয় বা সরকারি খাস জমির ক্ষেত্রে এই নিয়ম কার্যকর হবে না।
এদিকে শনিবার রাজউকের একটি সূত্র অভিযোগ তুলেছে, প্রয়োজনীয় কারিগরি যাচাই-বাছাই ও যথাযথ অনুমোদন প্রক্রিয়া সম্পন্ন না করেই এই সংশোধনীগুলো আনা হয়েছে।
ওই সূত্রের দাবি, ৯ সদস্যের একটি সরকারি কারিগরি কমিটি আগেই সুপারিশ করেছিল, বিআইডব্লিউটিএ ও সংশ্লিষ্ট সিটি করপোরেশনের ছাড়পত্র ছাড়া আইলবাহারের ওই তিন প্লটের শ্রেণি পরিবর্তন করা ঠিক হবে না।
ছাড়পত্র পাওয়ার পর কমিটির দায়িত্ব ছিল সরেজমিনে এলাকাটি পরিদর্শন করা এবং রাজউক বোর্ডের কাছে চূড়ান্ত সুপারিশ পাঠানোর আগে পরিবেশ, প্রতিবেশ ও স্থানীয় বাসিন্দাদের ওপর এর কী প্রভাব পড়বে, তা যাচাই করা।
ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইপিডি) নির্বাহী পরিচালক আদিল মুহাম্মদ খান এই সংশোধনীর সমালোচনা করে বলেন, সরকার জনস্বার্থের চেয়ে শিল্প ও আবাসন খাতের ব্যবসায়িক স্বার্থকেই বেশি গুরুত্ব দিয়েছে।
তিনি বলেন, গুরুত্বপূর্ণ কোনো উন্নয়ন পরিকল্পনা সংশোধনের আগে পেশাদারদের পরামর্শ নেওয়া এবং নিরপেক্ষ মূল্যায়ন করা জরুরি।
এ ছাড়া, সংশোধনী সম্পর্কে নগর পরিকল্পনাবিদ ও রাজউক কর্মকর্তাদের যথাযথভাবে জানানো হয়নি—এমন খবরের বিষয়েও তিনি প্রশ্ন তুলেছেন।
আদিল মুহাম্মদ খান সতর্ক করে বলেন, উন্মুক্ত স্থান, বন্যাপ্রবাহ এলাকা এবং নদীর তীরবর্তী অঞ্চলের সুরক্ষা শিথিল করলে ঢাকার পরিবেশগত বিপর্যয় ও জলাবদ্ধতার সমস্যা আরও প্রকট হবে।
তিনি বিশেষ করে জুরাইন ও পোস্তগোলায় ভারী শিল্প স্থাপনের অনুমতির বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। এ ছাড়া, পূর্ব ঢাকায় বারবার এফএআর বাড়ানোর সমালোচনা করে তিনি বলেন, মূল পরিকল্পনায় জনসংখ্যার যে ধারণা ও লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল, এই সিদ্ধান্তগুলো তার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের সভাপতি ড. মুহাম্মদ আরিফুল ইসলাম বলেন, এভাবে কোনো পরিবর্তন আনা ঠিক নয়। যথাযথ আলোচনা এবং প্রয়োজনীয় তথ্য প্রকাশ না করে এ ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া অনুচিত।
গতকাল এক বিবৃতিতে ড্যাপ সংশোধনীর তৃতীয় ধাপের গেজেটটি অবিলম্বে বাতিলের দাবি জানিয়েছে আইপিডি।
বিবৃতিতে তারা সংশোধনীর বিষয়গুলো পুরোপুরি প্রকাশের দাবি জানিয়েছে। একইসঙ্গে এতে কোনো দুর্নীতি বা বাণিজ্যিক প্রভাব জড়িত আছে কি না, তা খতিয়ে দেখতে কারিগরি তদন্তের দাবি করেছে সংস্থাটি।
এ ছাড়া, বন্যাপ্রবাহ ও জলাশয় রক্ষা এবং জনসংখ্যার চাপ ও অবকাঠামোগত সক্ষমতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এফএআর বাড়ানোর ওপর জোর দিয়েছে তারা।
আইপিডির অভিযোগ, ২০২২ সাল থেকে বিভিন্ন সরকার ঢাকার পরিবেশ ও বাসযোগ্যতার চেয়ে ব্যবসায়িক স্বার্থকে বেশি গুরুত্ব দিয়ে আসছে। তারা সতর্ক করে বলেছে, সর্বশেষ এই পরিবর্তনগুলো শহরের অবকাঠামোর ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করবে এবং জনস্বার্থকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে।



