নিজের জন্য পছন্দের কিছু কেনা হোক কিংবা প্রিয়জনকে ছোট্ট কোনো উপহার দেওয়া, প্রতিটি কেনাকাটার পেছনেই থাকে কিছু ইচ্ছা, অপেক্ষা আর আনন্দের গল্প। তবে অনেকেই অপেক্ষা করেন উপযুক্ত সময়ের, যখন পছন্দের জিনিসটি নিজের বাজেটের মধ্যেই কেনা সম্ভব হয়। বাংলাদেশের অনেক অনলাইন ক্রেতার কাছে এমন একটি সময়ের নাম এখন দারাজ ১১.১১।
নভেম্বর এলেই শুরু হয় কেনাকাটার নানা পরিকল্পনা। কেউ পছন্দের পণ্য কেনার জন্য অপেক্ষা করেন, কেউ তৈরি করেন পরিবারের প্রয়োজনীয় জিনিসের তালিকা, আবার কেউ খোঁজেন প্রিয় ব্র্যান্ডের বিশেষ অফার। ২০১৮ সালে বাংলাদেশে যাত্রা শুরুর পর আটটি আয়োজন পেরিয়ে দারাজ ১১.১১ এখন শুধু একটি বার্ষিক অনলাইন বিক্রয় আয়োজন নয়, বরং অনেকের কেনাকাটার পরিকল্পনা ও অভ্যাসের অংশ হয়ে উঠেছে।
দারাজ ১১.১১-এর গল্প শুরু হয়েছিল বাংলাদেশের অনেক দূরে, চীনে। সেখানে ১১ নভেম্বর পরিচিত ছিল ‘সিঙ্গেলস ডে’ হিসেবে। ২০০৯ সালে আলিবাবা গ্রুপ এই দিনকে কেন্দ্র করে বিশেষ অনলাইন শপিং ক্যাম্পেইন চালু করে। মাত্র ২৭টি মার্চেন্ট নিয়ে শুরু হওয়া এই উদ্যোগ সময়ের সঙ্গে বিশ্বের অন্যতম বড় অনলাইন শপিং উৎসবে পরিণত হয়। সেই ধারণা থেকেই ২০১৮ সালে বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো ১১.১১ নিয়ে আসে দারাজ।
প্রথম আয়োজনেই তৈরি হয় ব্যাপক আগ্রহ। ইউনাইটেড নিউজ অব বাংলাদেশ (ইউএনবি)-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮ সালের ক্যাম্পেইনে প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার অর্ডার এসেছিল, যার মোট মূল্য ছিল প্রায় ৪৫ কোটি টাকা। তখন অনেকের কাছেই অনলাইনে পণ্য দেখা, অর্ডার দেওয়া এবং ঘরে বসে তা হাতে পাওয়ার অভিজ্ঞতা ছিল নতুন। প্রতি বছর নতুন অফার, ভাউচার ও বিভিন্ন ব্র্যান্ডের অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে ক্যাম্পেইনটি পৌঁছে যায় আরও বেশি ক্রেতার কাছে।
এই আট বছরের পথচলায় বদল এসেছে ক্রেতাদের কেনাকাটার পছন্দেও। একসময় অনলাইন কেনাকাটা মূলত স্মার্টফোন, গ্যাজেট ও ফ্যাশন পণ্যকেন্দ্রিক থাকলেও এখন এতে যুক্ত হয়েছে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য, গ্রোসারি, ব্যক্তিগত পরিচর্যার সামগ্রী, গৃহস্থালি সরঞ্জাম ও আসবাব।
২০২৫ সালের দারাজ ১১.১১ ক্যাম্পেইনেও এই পরিবর্তনের চিত্র দেখা গেছে। সবচেয়ে জনপ্রিয় পণ্যশ্রেণির মধ্যে ছিল হোম অ্যাপ্লায়েন্স, মোবাইল অ্যাকসেসরিজ, লন্ড্রি ও গৃহস্থালি সামগ্রী, বাথ অ্যান্ড বডি এবং ফ্যাশন। অন্যদিকে সবচেয়ে বেশি কেনা পণ্যের তালিকায় ছিল ওয়াশিং মেশিন, অ্যাডিডাস স্নিকার্স, নিভিয়া ক্রিম, অফিস চেয়ার, হায়ার গিজার, চিনিগুঁড়া চাল, স্টারশিপ মিল্ক পাউডার, সার্ফ এক্সেল লিকুইড ও ইলেকট্রিক কেটলির মতো পণ্য। অর্থাৎ একই ক্যাম্পেইনে কেউ ঘরের জন্য অ্যাপ্লায়েন্স কিনছেন, কেউ পরিবারের প্রয়োজনীয় পণ্য, আবার কেউ বেছে নিচ্ছেন নিজের পছন্দের ফ্যাশন বা ব্যক্তিগত পরিচর্যার সামগ্রী।
ক্রেতাদের নিয়মিত কেনাকাটায় সাশ্রয়ের সুযোগ তৈরি করতে দারাজে রয়েছে ‘চয়েস’ নামে আলাদা একটি শপিং চ্যানেল। এখানে সারা বছরই প্রতিদিনের কম দামে বিভিন্ন পণ্য কেনা যায়। পাশাপাশি তিনটি পণ্য কিনলে বিনা মূল্যে ডেলিভারি এবং পাঁচটি পণ্য কিনলে বিনা মূল্যে ডেলিভারির সঙ্গে উপহার পাওয়ার সুযোগ রয়েছে। ফলে বিশেষ ক্যাম্পেইনের বাইরেও ক্রেতারা নিয়মিত কেনাকাটায় বাড়তি সাশ্রয় পান।
সাশ্রয়ী দামে পণ্য কেনার সুযোগও ১১.১১-এর জনপ্রিয়তার অন্যতম কারণ। ২০২৫ সালের ক্যাম্পেইনে ৬০ শতাংশের বেশি ছাড়ের ভাউচার ব্যবহার করে ক্রেতারা মোট ৬ কোটি ৬০ লাখ টাকারও বেশি সাশ্রয় করেছেন। একই বছর দারাজের অন্য যেকোনো ক্যাম্পেইনের তুলনায় ১১.১১-তে ১০ গুণ প্রবৃদ্ধি রেকর্ড করা হয়। এ ছাড়া মোট বিক্রির ২৫ শতাংশের বেশি এসেছে প্রথমবারের মতো কেনাকাটা করা ক্রেতাদের কাছ থেকে। অন্যদিকে ৫০ শতাংশের বেশি বিক্রির মূল্য পরিশোধ করা হয়েছে ব্যাংক ও মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) পার্টনারদের মাধ্যমে।
অনলাইনে কেনাকাটায় পণ্যের সত্যতা ও নির্ভরযোগ্যতাও গুরুত্বপূর্ণ। দারাজমলের মাধ্যমে ক্রেতারা বিভিন্ন ব্র্যান্ডের আসল পণ্য কেনার সুযোগ পান। ২০২৫ সালের ক্যাম্পেইনে দারাজমলের ব্র্যান্ডগুলো সাধারণ সেলারদের তুলনায় ১০ গুণ বেশি প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। হায়ার, রিয়েলমি, টিপি-লিংক, মার্কস, বাটা, ডেটল, নিভিয়া, হিমালয়া ও এসকেএফসহ বিভিন্ন পরিচিত ব্র্যান্ডও এতে অংশ নেয়।
অনলাইন কেনাকাটার বিস্তৃতি এখন বড় শহরগুলোর মধ্যেও সীমাবদ্ধ নেই। ২০২৫ সালের ক্যাম্পেইনে একটি অর্ডার রংপুর থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত পৌঁছেছিল, যার দূরত্ব ছিল ৬৯০ কিলোমিটার। দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে পণ্য পৌঁছে দেওয়ার এই উদাহরণ অনলাইন কেনাকাটার বিস্তৃত পরিসর তুলে ধরে। ঘরে বসে পণ্য দেখা, দাম তুলনা করা, অর্ডার দেওয়া এবং হোম ডেলিভারির সুবিধা দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষের কেনাকাটাকে সহজ করছে।
২০২৬ সালে বাংলাদেশে দারাজ ১১.১১-এর নবম আয়োজনও আসছে নতুন কিছু কার্যক্রম নিয়ে। ‘অ্যাড টু কার্ট অ্যান্ড উইন’, স্পিন দ্য হুইল, ব্র্যান্ড রাশ আওয়ার, ফ্ল্যাশ ভাউচার, ফ্ল্যাট ৫০% আওয়ার এবং সুপার ব্র্যান্ড ফেস্টের পাশাপাশি থাকছে বিভিন্ন ব্র্যান্ড ও পণ্যশ্রেণিভিত্তিক আয়োজন। ১০ নভেম্বর রাত ৮টা থেকে শুরু হয়ে ২১ নভেম্বর পর্যন্ত চলবে মূল ক্যাম্পেইন, এরপর থাকবে বর্ধিত কেনাকাটার সুযোগ।
তবে একটি ক্যাম্পেইনের জনপ্রিয়তা ধরে রাখতে শুধু আকর্ষণীয় ছাড়ই যথেষ্ট নয়। পণ্যের মান, সঠিক পণ্য হাতে পাওয়া, নির্ভরযোগ্য ডেলিভারি, সহজ পেমেন্ট ও প্রয়োজনের সময় গ্রাহকসেবা পাওয়াও সমান গুরুত্বপূর্ণ। ভালো অফার প্রথমবার কেনাকাটায় আগ্রহী করতে পারে, কিন্তু ইতিবাচক অভিজ্ঞতাই একজন ক্রেতাকে আবার ফিরে আসতে উৎসাহিত করে।
২০১৮ সালের প্রথম আয়োজন থেকে ২০২৫ সালের অষ্টম আয়োজন পর্যন্ত দারাজ ১১.১১-এর পথচলা তাই শুধু একটি বিক্রয় আয়োজনের গল্প নয়। এটি বাংলাদেশের মানুষের বদলে যাওয়া কেনাকাটার অভ্যাস, পণ্যের প্রতি আগ্রহের বিস্তৃতি এবং অনলাইন কেনাকাটার সঙ্গে পরিচিত হয়ে ওঠার প্রতিচ্ছবি। একসময় যা ছিল নতুন অভিজ্ঞতা, সময়ের সঙ্গে তা হয়ে উঠেছে অনেকের অপেক্ষার বার্ষিক আয়োজন।



