প্রাচুর্য, বিলাসিতা ও স্বাচ্ছন্দ্যের বিনিময়ে পরাধীনতা নাকি অনিশ্চয়তা ও কষ্টের মধ্যেও স্বাধীন জীবন—এই দ্বন্দ্বকে কেন্দ্রে রেখে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির জাতীয় নাট্যশালায় উদ্বোধিত হয়েছে নাগরিক নাট্যাঙ্গনের নতুন প্রযোজনা ‘দুই পাখি ও নন্দিনী’। শুক্রবার সন্ধ্যায় একাডেমির মূল হলে অনুষ্ঠিত উদ্বোধনী প্রদর্শনীতে দর্শকরা দেখেন প্রায় দেড় ঘণ্টার নাটকটি। প্রতিটি পর্বে স্বাধীনতা, মুক্তি ও মানবিকতার প্রশ্ন নতুন করে তুলে ওঠে।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘দুই পাখি’ কবিতা এবং ‘রক্তকরবী’ নাটকের নন্দিনী চরিত্রকে আশ্রয় করে প্রযোজনাটি নির্মিত হয়েছে। নাটকের পরিকল্পনা ও নির্দেশনা দিয়েছেন নাট্যকার ও নির্দেশক ষড়ৈশ্বর্য লাকী ইনাম। এটি নাগরিক নাট্যাঙ্গনের ২৮তম প্রযোজনা। ইন্টারনেট, স্যাটেলাইট, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং শোষণ-শাসন ও আগ্রাসনের বাস্তবতায় মানুষের জীবন যখন ক্রমশ যান্ত্রিক হয়ে উঠছে, তখন স্বাধীনতার অর্থ ও মুক্তির আকাঙ্ক্ষাকে নতুনভাবে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে নাটকটি।
খাঁচার পাখি ও বনের পাখির সাক্ষাৎ
নাটকে সোনার খাঁচায় নিরাপদ ও আরামদায়ক জীবনের সঙ্গে ঝুঁকি-কষ্টের মধ্যে থাকা মুক্ত বনের পাখির জীবনকে মুখোমুখি করানো হয়েছে। খাঁচার পাখি ও বনের পাখির সাক্ষাৎের মধ্য দিয়ে স্বাধীনতা ও পরাধীনতার দুই সত্তার দ্বন্দ্ব চিত্রিত হয়। তবে নিজস্ব শক্তিতে মুক্তির পখান না খুঁজে পাওয়ার পর ‘রক্তকরবী’-এর নন্দিনীর আবির্ভাব ঘটে। যক্ষপুরীর মকররাজের শোষণ ও ভয়ভীতির মধ্যে খনিতে শ্রম দিতে দেওয়া কিশোর ও ফাগুলালের মতো মানুষ যখন যন্ত্রে পরিণত হয়, নন্দিনী তখন তাদের মানবিক অস্তিত্ব ও মুক্তির পথ খুঁজে দেন।
লাকী ইনাম বলেন, ‘দুই পাখি’ ও ‘রক্তকরবী’ রবীন্দ্রনাথের একই বক্তব্যের দুই ধরনের শিল্পরূপ এবং তার মূলে রয়েছে সর্বপ্রাণী ও সব মানুষের স্বাধীনতা। তাঁর মতে, স্বাধীনতা শুধু আবদ্ধ প্রাচীর বা খাঁচা ভাঙার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। প্রকৃত স্বাধীনতা হলো অন্যকে আটকে রেখে দেওয়ার মানসিকতা থেকে বেরিয়ে এসে নিজের পরিচয়কে উপস্থাপন করা এবং অন্যকেও বাঁচার সুযোগ তৈরি করা। গত ৪ সেপ্টেম্বর ৭৫ বছর বয়সে পদার্পণ করা লাকী ইনাম নিজের শিল্পজীবন উদযাপনের জন্য দলীয় অনুষ্ঠানের বদলে নতুন নাটক নির্মাণ ও মঞ্চায়ন বেছে নিয়েছেন। শৈশব থেকেই তাঁর শিল্পচর্চায় রবীন্দ্রনাথ আশ্রয় ছিলেন বলে জীবনের এই পথে এসেও তিনি রবীন্দ্রসাহিত্যের কাছে ফিরে গেছেন।
নাটকের পাণ্ডুলিপি রচনায় লাকী ইনামকে ভাবনা দিয়ে অনুপ্রাণিত করেছেন অভিনেতা হৃদি হক। অভিনয়, মঞ্চসজ্জা, আবহসংগীত, পোশাক ও দ্রব্যসম্ভারের কাজে নাগরিক নাট্যাঙ্গনের নাট্যকর্মীরা সহযোগিতা দিয়েছেন। প্রযোজনার আলোর পুরোধা ঠান্ডু রায়হান আলোকবিষয়ক উপদেষ্টা হিসেবে যুক্ত হয়েছেন। নাট্যকর্মীদের অংশগ্রহণ ও দলীয়ভাবে উদযাপনের বদলে নাটক নির্মাণের মাধ্যমে জীবনের ৭৫ বছর উদযাপনের সিদ্ধান্তই প্রযোজনাটির সঙ্গে লাকী ইনামের ব্যক্তিজীবনের শিল্পসংগতি দেখিয়ে দেয়।
-6ab6c786d4aaf.jpg)



