প্রাচুর্য ও স্বাচ্ছন্দ্যের বিনিময়ে পরাধীনতা নাকি অনিশ্চয়তা ও কষ্টের মধ্যেও স্বাধীন জীবন—এই দ্বন্দ্বকে কেন্দ্রে রেখে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির জাতীয় নাট্যশালায় মঞ্চায়ন হয়েছে নাটক ‘দুই পাখি ও নন্দিনী’। গত শুক্রবার সন্ধ্যায় মূল হলে অনুষ্ঠিত উদ্বোধনী প্রদর্শনীতে প্রায় দেড় ঘণ্টার নাটকটি দর্শকদের বিনোদনের পাশাপাশি মুক্তি ও মানবিকতার প্রশ্নের মুখোমুখি করেছে।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘দুই পাখি’ কবিতা এবং ‘রক্তকরবী’ নাটকের নন্দিনী চরিত্রের উপর ভিত্তি করে নাটকটি নির্মিত হয়েছে। সোনার খাঁচায় নিরাপদ ও স্বচ্ছন্দ জীবন কেন পরাধীনতার নামান্তর হয়ে দাঁড়ায়, আবার ঝুঁকি ও কষ্টের মধ্যে থেকেও মুক্ত বনের পাখির মতো স্বাধীনভাবে বাঁচার অর্থ কী—এই বিপরীত বাস্তবতার সাক্ষাৎ ঘটিয়েছে দুই পাখির মধ্যে। ইন্টারনেট, স্যাটেলাইট, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং শোষণ-শাসন ও আগ্রাসনের প্রেক্ষাপটে মানুষের জীবন যখন ক্রমশ যান্ত্রিক হয়ে উঠছে, তখন এই প্রশ্চিদ্দের অত্যধিকার আর কোথায় তা ছাড়া কোথায়—নাটকটি সেই প্রশ্নকেই সামনে রেখেছে।
নাটকের ভাবনায় খাঁচার পাখি ও বনের পাখির দ্বন্দ্বে স্বাধীনতা ও পরাধীনতার দুই সত্তা পরস্পরের মুখোমুখি হলে নিজস্ব শক্তিতে মুক্তির পথ খুঁজে পায় না। যখন যাক্ষপুরীর মকররাজের শোষণ ও ভয়ভীতির শেষে কিশোর ও ফাগুলালের মতো নিরপরাশ মানুষ খনিতে শ্রম দিতে দিতে যন্ত্রে পরিণত হয়, তখন ‘রক্তকরবী’-এর নন্দিনী তাদের মানবিক অস্তিত্ব ও মুক্তির সন্ধান দেন। সেই মূল ভাবনাকে সমকালীন সমাজের বাস্তবতার সঙ্গে মিলিয়ে নাটকে নতুন শিল্পরূপ দিয়েছেন নাট্যকার ও নির্দেশক ষড়ৈশ্বর্য লাকী ইনাম। এটি নাগরিক নাট্যাঙ্গনের ২৮তম প্রযোজনা।
লাকী ইনাম বলেন, ‘দুই পাখি’ ও ‘রক্তকরবী’ রবীন্দ্রনাথের একই বক্তব্যের দুই ধরনের শিল্পরূপ—সর্বপ্রাণী ও সব মানুষের স্বাধীনতা। তাঁর মতে, স্বাধীনতা শুধু নিজের আবদ্ধ প্রাচীর বা খাঁচা ভাঙার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। অন্যকে প্রাচীরের ভেতরে আটকে রাখা বা খাঁচায় পুরে রাখার মানসিকতা থেকে বেরিয়ে আসাই প্রকৃত স্বাধীনতা। নিজের বৈশিষ্ট্য নিয়ে বাঁচার পাশাপাশি অন্যকেও বাঁচার সুযোগ তৈরি করা এই স্বাধীনতার অপরিহার্য অংশ।
শিল্পজীবনের ৭৫ বছর পূর্তিতে লাকী ইনাম দলীয় কর্মীদের জন্মদিন উদযাপনের বদলে নতুন নাটক সৃষ্টি ও মঞ্চায়নের মধ্য দিয়ে নিজের শিল্পচর্চা উদযাপন বেছে নিয়েছেন। শৈশব থেকে আবৃত্তি, গান, নৃত্য, অভিনয়সহ শিল্পজীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে তাঁর আশ্রয় ছিলেন রবীন্দ্রনাথ। তাই জীবনের এই মাইলফলকেও তিনি রবীন্দ্রনাথের দুটি শিল্পকর্মের কাছে ফিরে গেছেন। নাটকের পাণ্ডুলিপি রচনায় হৃদি হক তাকে ভাবনা দিয়ে অনুপ্রাণিত করেন বলে জানিয়েছেন নির্দেশক। পাণ্ডুলিপি, অভিনয়, মঞ্চসজ্জা, আবহসংগীত, পোশাক ও দ্রব্যসম্ভারে নাগরিক নাট্যাঙ্গনের নাট্যকর্মীরা সহযোগিতা করেছেন; আলোকবিষয়ক উপদেষ্টা হিসেবে যুক্ত হয়েছেন ঠান্ডু রায়হান।
-6ab6c786d4aaf.jpg)




