‘আগেও আমার স্বামীকে মেরে ফেলার চেষ্টা করা হয়। তখন দিনের বেলা কুপিয়ে ফেলে গেছিল। এইবার একেবারে গুলি করে দিছে। অনিয়মের বিরুদ্ধে কথা বলত বলে মানুষটাকে মেরে ফেলতে হবে?
এ প্রশ্ন নেত্রকোণার দুর্গাপুরে দুর্বৃত্তদের গুলিতে নিহত সাংবাদিক লুৎফুজ্জামান ফকির আলিফের স্ত্রী আনন্দিতা সাংমার।
বৃহস্পতিবার রাত ৮টার দিকে শ্যামগঞ্জ-বিরিশিরি সড়কের উত্তরাইল বাজারে গুলি করা হয় সাংবাদিক আলিফকে। মোটরসাইকেলে দুই যুবক এসে তাকে লক্ষ্য করে গুলি চালায় বলে জানিয়েছে পুলিশ।
এ ঘটনায় আনন্দিতা গতকাল শুক্রবার রাতে দুর্গাপুর থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন।
এ তথ্য নিশ্চিত করে দুর্গাপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) খন্দকার শাকের আহমেদ সাংবাদিকদের জানান, নিহত সাংবাদিকের স্ত্রীর লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতে হত্যা মামলা নথিভুক্ত করা হয়েছে।
আলিফ বেসরকারি আইপিটিভি চ্যানেল রূপসী বাংলার নেত্রকোণা প্রতিনিধি ছিলেন। পাশাপাশি তিনি ‘ডিটেকটিভ আর্টিকেল’ নামে একটি ফেসবুক পেজ পরিচালনা করতেন, যেখানে দুর্নীতি, অনিয়ম ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড নিয়ে নিয়মিত পোস্ট করতেন।
তার ছোটভাই সাদেকুর রহমান সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমার ভাই সীমান্তে চোরাকারবার নিয়ে লিখতেন, মাদক কারবারিদের বিরুদ্ধে কথা বলতেন, অনিয়মের বিরুদ্ধে কথা বলতেন। এগুলোই তার জীবনে কাল হয়েছে।
'তিনি সত্য কথা বলতে ভয় পেতেন না। তাই এসব কাজে জড়িত সবার শত্রু হয়ে গিয়েছিলেন,’ বলেন তিনি।
গতকাল তাদের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, কান্নারত আনন্দিতার কোলে ১৮ মাস বয়সী ছেলে আইয়ান সাফয়ান। পাশে বসে আছে ৪ বছরের মেয়ে প্রান্ত।
ঘটনার রাতের বিষয়ে জানতে চাইলে আনন্দিতা বলেন, 'ঘটনার কিছুক্ষণ আগে একবার বাসায় এসে আবার চলে যান আলিফ। তারপর ভাবলাম বাসায় আসবেন। তাই বাচ্চাদের নিয়ে অপেক্ষা করছিলাম। এরই মধ্যে কেউ একজন এসে বললেন যে তাকে গুলি করছে।'
'গুলির শব্দ আমরাও শুনেছি। তখনই আমি বাচ্চাদের রেখে দৌড়ে গিয়ে দেখি তিনি পড়ে আছেন,’ বলেন তিনি।
কথাগুলো বলতে গিয়ে বারবার কান্নায় ভেঙে পড়ছিলেন আনন্দিতা। মায়ের কান্না দেখে কাঁদছিল বাচ্চারাও।
আনন্দিতা সাংমা আরও বলেন, 'আগেও আমার স্বামীকে মেরে ফেলার চেষ্টা করা হয়েছিল। তখন দিনের বেলা কুপিয়ে ফেলে গেছিল। এবার একেবারে গুলি করে দিছে। কী দোষ করেছিলেন? অনিয়মের বিরুদ্ধে কথা বলতেন, এজন্য তাকে মেরে ফেলতে হবে?
প্রত্যক্ষদর্শী তেলনজিয়া এলাকার দোকানদার রবিন রাংসার দোকানে ঘটনার কিছুক্ষণ আগে বসেছিলেন সাংবাদিক লুৎফুজ্জামান আলিফ।
ঘটনার বর্ণনা দিয়ে রবিন সাংবাদিকদের বলেন, ‘সাংবাদিক আলিফ আমার দোকানে বসে চা খেয়েছিলেন। কিন্তু ভুলে দোকানে মোবাইল ফোনটি রেখে চলে যান। পরে আবার নিতে আসেন। সেসময় আরও দুই যুবক এসে আমার কাছে সিগারেট চায়।
‘সিগারেট নিয়ে তারাও আলিফের পেছন পেছনে চলে যায়। এর কিছুক্ষণ পরই গুলির শব্দ পাই,' বলেন তিনি।
গুলির পর স্থানীয়রা সেখানে গেলে দুর্বৃত্তরা পালিয়ে যায় বলে জানান তিনি।
ঘটনার দুইদিন পরেও এখন পর্যন্ত কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ।
তদন্ত নিয়ে জানতে চাইলে নেত্রকোণার পুলিশ সুপার মো. তরিকুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, ‘ঘটনার পর থেকেই পুলিশ, ডিবি ও সিআইডির একাধিক টিম কাজ শুরু করেছে। ইতোমধ্যে বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে পাঁচ সদস্যের একটি তদন্ত টিম গঠন করে দেওয়া হয়েছে।'
‘হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের দ্রুত শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে অভিযান চালানো হচ্ছে। বিভিন্ন জায়গায় চেকপোস্ট বসানো হয়েছে। জড়িত কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না,’ বলেন তিনি।
শুক্রবার বিকেলে কলমাকান্দা উপজেলার পোগলা ইউনিয়নের ধিতপুর শুনুই গ্রামে পৈত্রিক বাড়িতে নিহত সাংবাদিক আলিফের জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। সন্ধ্যায় পারিবারিক কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়।



