বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমানকে যথাযথ মর্যাদা না দেওয়ায় তিনি জুলাই স্মৃতি স্তম্ভের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে যাননি বলে দাবি করেছেন দলটির সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ‘বিরোধীদল জুলাইকে ধারণ করে না’ বক্তব্যের জবাবে তিনি বলেছেন, জামায়াতই জুলাইয়ের চেতনা ধারণ করছে, আর বিএনপি সরকার গণভোটের রায় ও জুলাই সনদ বাস্তবায়ন না করে সেই চেতনার পরিপন্থী কাজ করছে।
আজ মঙ্গলবার মগবাজারে জামায়াতের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন গোলাম পরওয়ার। এতে জামায়াতের কয়েকজন সংসদ সদস্য ও কেন্দ্রীয় নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
রাজধানীর ঐতিহাসিক ওসমানী উদ্যানে নবনির্মিত জুলাই স্মৃতি স্তম্ভের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে গতকাল সোমবার বিরোধীদলীয় নেতার অনুপস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন তোলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
তিনি বলেন, বিরোধীদল সরকারের মঞ্চে না বসলেও অনুষ্ঠানে এসে জুলাইকে ধারণ করার প্রমাণ দিতে পারতো।
বিরোধিতা করতে গিয়ে স্বৈরাচারের ফেরার পথ উন্মুক্ত করলে তা জুলাই শহীদ ও একাত্তরের মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা হবে বলেও সতর্ক করেন প্রধানমন্ত্রী।
শফিকুর রহমানের অনুপস্থিতির ব্যাখ্যা দিয়ে গোলাম পরওয়ার বলেন, জামায়াতের আমির ও সেক্রেটারি জেনারেল আমন্ত্রণপত্র পেয়েছিলেন। কিন্তু বিরোধীদলীয় নেতার পদমর্যাদা অনুযায়ী অনুষ্ঠানে তাকে যথাযথ সম্মান দেওয়া হয়নি।
তিনি বলেন, ‘বিরোধীদলীয় নেতা হিসেবে একজন মন্ত্রীর পদমর্যাদা হোল্ড করেন। এই সম্মান এই অনুষ্ঠানে তার প্রাপ্য ছিল। আপনারা আমাদের এই বিরোধীদলের নেতাকে এই অনুষ্ঠানের জন্য তার প্রাপ্য যথাযথ সম্মান দিতে ব্যর্থ হয়েছেন।
পরওয়ার বলেন, আমন্ত্রণপত্রে শফিকুর রহমানের আসন কোথায় হবে, তিনি বিশেষ অতিথি নাকি অন্য কোনো মর্যাদায় আমন্ত্রিত—তা স্পষ্ট ছিল না।
তার অভিযোগ, অনুষ্ঠানে গেলে বিরোধীদলীয় নেতাকে সাধারণ শ্রোতাদের আসনে বসতে হতো।
‘আপনারা কি চান এত বড় একটা বিরোধীদলের নেতা এইভাবে একটা বড় ধরনের সরকারি অনুষ্ঠানে গিয়ে তিনি অপমানিত হবেন?’ প্রশ্ন রাখেন তিনি।
বিরোধীদলকে ছোট করার জন্যই এমন ব্যবস্থা করা হয়েছে দাবি করে পরওয়ার বলেন, ‘শুধু অনুষ্ঠানে না যাওয়ার বিষয়টি সামনে এনে বিরোধীদলীয় নেতার সমালোচনা করা অন্যায়।
প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের প্রতিবাদ জানিয়ে গোলাম পরওয়ার বলেন, দেশের মানুষ, জুলাই যোদ্ধা ও শহীদ পরিবারের সদস্যরা জানেন, জামায়াত জুলাইয়ের চেতনা ধারণ করে কি না।
‘জামায়াত ইসলামী জুলাইকে ধারণ করে বলেই গণভোটের গণরায় বাস্তবায়নের জন্য, জুলাই সনদ বাস্তবায়নের দাবিতে আমরা রাজপথে আন্দোলন করছি,’ যোগ করেন তিনি।
তার অভিযোগ, বিএনপি সরকার গণভোটের রায় বাস্তবায়ন না করে, তা এড়িয়ে যাচ্ছে। একইসঙ্গে সাংবিধানিক পদে দলীয় নিয়োগ এবং সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে দলীয় লোকদের বসানোর মাধ্যমে জুলাই সনদের চেতনার পরিপন্থী পদক্ষেপ নিচ্ছে।
জুলাই আন্দোলনে শহীদদের পরিবারের সঙ্গে সাক্ষাৎ, তাদের সহায়তা এবং আহতদের চিকিৎসায় সহযোগিতার কথা তুলে ধরে গোলাম পরওয়ার বলেন, জামায়াত শহীদদের জীবন ও অবদান নিয়ে বাংলা, ইংরেজি ও আরবি ভাষায় সংকলনও প্রকাশ করেছে।
প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর উদ্দেশে তিনি প্রশ্ন রাখেন, তারা কতজন শহীদের বাড়িতে গেছেন? কতজন আহত যোদ্ধার পাশে দাঁড়িয়েছেন এবং দলীয় তহবিল থেকে কত টাকা সহায়তা দিয়েছেন?
পরওয়ার বলেন, জাতীয় ঐকমত্য কমিশনে ৮৪টি বিষয়ে ঐকমত্য হয়েছিল। জামায়াত পাঁচটি বিষয়ে নোট অব ডিসেন্ট দিলেও বৃহত্তর ঐকমত্যের স্বার্থে নিজেদের অবস্থানে অনড় থাকেনি। কিন্তু বিএনপি মৌলিক কয়েকটি বিষয়ে ভিন্নমত বজায় রেখে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন এড়িয়ে যাচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
সরকারের সমালোচনাকে জুলাই শহীদদের বিরোধিতা হিসেবে তুলে ধরারও সমালোচনা করেন গোলাম পরওয়ার।
‘রাষ্ট্র, সরকার আর সরকারি দল—তিনটা কিন্তু আলাদা,’ বলেন তিনি। সরকারের দুর্নীতি, দলীয়করণ ও জনবিরোধী কর্মকাণ্ডের বিরোধিতা করাকে রাষ্ট্রের বিরোধিতা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
পরওয়ারের অভিযোগ, বিএনপি সরকার গণভোটের রায় উপেক্ষা করে এককভাবে সংবিধান সংশোধনের উদ্যোগ নিয়েছে। গণভোটের রায় কার্যকর করতে সাংবিধানিক সংস্কার পরিষদের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় ভূমিকা পালনে বিরোধীদল প্রস্তুত বলেও জানান তিনি।
তবে জনগণের রায় উপেক্ষা করে সংবিধান সংশোধনের উদ্যোগে তারা সহযোগিতা করবেন না, যোগ করেন তিনি।
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীর ‘ফ্যাসিবাদের পথ কোনটি’—এমন প্রশ্নের জবাবে গোলাম পরওয়ার বলেন, ‘চাঁদাবাজি, ধর্ষণ, খুন, লুটপাটের পথই হলো ফ্যাসিবাদের পথ।
সরকারি পদে দলীয় লোক নিয়োগ, জনগণকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ এবং গণভোটের রায় উপেক্ষা করাকেও তিনি ফ্যাসিবাদের পথে হাঁটা বলে উল্লেখ করেন।
সংবাদ সম্মেলনে ১৯৯৪-৯৫ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে আন্দোলন, ওয়াজ মাহফিল ও জামায়াতের সাংগঠনিক কর্মসূচিতে বাধা এবং ইসলামী আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত মাদ্রাসাগুলোর পরিচালনা কমিটি বাতিলের বিষয়েও বক্তব্য দেন গোলাম পরওয়ার। এসব পদক্ষেপের মাধ্যমে সরকার কর্তৃত্ববাদী পথে হাঁটছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
জামায়াত নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলনের পথেই থাকবে জানিয়ে গোলাম পরওয়ার প্রধানমন্ত্রী ও সরকারের দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াত সম্পর্কে অসত্য বক্তব্য না দিয়ে গণতান্ত্রিক শিষ্টাচার বজায় রাখার আহ্বান জানান।



