মঙ্গলবার, ৩ নভেম্বর, ২০২৬
১৮ই কার্তিক, ১৪৩৩

ডেইলি বরিশাল

দক্ষিণাঞ্চলের শীর্ষস্থানীয় ও বস্তুনিষ্ঠ দৈনিক পত্রিকা

সারাদেশ

হোটেল বয়ের কাজ করেও সেরা সাফল্য কৌশিকের

হোটেল বয়ের কাজ করেও সেরা সাফল্য কৌশিকের...

র
রাহুল হাসান· প্রতিবেদক
প্রকাশ: ৩ নভেম্বর ২০২৬, ৩:৪৭ পিএমসর্বশেষ: ৩ নভেম্বর ২০২৬, ৩:৪৭ পিএম
হোটেল বয়ের কাজ করেও সেরা সাফল্য কৌশিকের

ভূমিহীন পরিবার। ভিটেমাটির এক টুকরো জমিও নেই। অন্যের জমিতে ভাঙা চালাঘরে মাথা গুঁজে থাকা। সংসারের অভাব মোচন ও লেখাপড়ার খরচ জোগাতে দিনমজুরি, হোটেল বয় ও টিউশনির কাজ করেছেন কৌশিক। কিন্তু এক মুহূর্তের জন্যও লক্ষ্যচ্যুত হননি। সব বাধা পেরিয়ে এবারের এইচএসসির ফলাফলে অর্জন করেছেন ঈর্ষণীয় সাফল্য। সব বিষয়ে এ প্লাসসহ জিপিএ-৫ পেয়েছেন বিশাল সরকার কৌশিক।

বিশাল সরকার কৌশিক কুড়িগ্রাম সরকারি কলেজ থেকে চলতি বছর বিজ্ঞান বিভাগে জিপিএ-৫ পেয়েছেন। কাঁঠালবাড়ী বিদ্যাকানন থেকে পঞ্চম শ্রেণিতে সাধারণ গ্রেডে বৃত্তি পাওয়ার পর বুকভরা স্বপ্ন নিয়ে ১০ কিলোমিটার দূরের কুড়িগ্রাম সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে ভর্তি হন। সেখান থেকে এসএসসিতে সব বিষয়ে এ প্লাসসহ জিপিএ-৫ পেয়ে সবাইকে তাক লাগিয়ে দেন। স্বপ্ন দানা বাঁধতে শুরু করে। ভর্তি হন কুড়িগ্রাম সরকারি কলেজে। এবার ফলাফল বিপর্যয়ের মাঝেও দারুণ সাফল্য পেয়েছেন তিনি। তার এই ধারাবাহিক সাফল্যের পেছনে রয়েছে নিদারুণ কষ্ট আর সংগ্রামের কাহিনি।

চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন পূরণে কৌশিকের প্রধান বাধা চরম দারিদ্র্য ও পরিবারের ওপর ঋণের বোঝা। দুটি এনজিও থেকে নেওয়া ঋণের কিস্তি সপ্তাহে ২ হাজার ৩০০ টাকা। সেটাই জোগানো দায়। ধারদেনাও বাড়ছে। তাই সেরা ফলের আনন্দ ফিকে কৌশিকের পরিবারে।

কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার কাঁঠালবাড়ী বাজারের পাশে কৌশিকদের জীর্ণ কুটির। তার বাড়িতে গিয়ে দেখা গেছে, ছোটখাটো ভাঙাচোরা তিনটি চালাঘরে দারিদ্র্যের ছাপ আর দুঃখের জীবন। পুরোনো টিনের চালে অসংখ্য ফুটো। বাঁশঝাড়ের এক কোণায় খোলা রান্নাঘর। কৌশিকের মা কণা রানী একটি কিন্ডারগার্টেন স্কুলের আয়া। সামান্য সম্মানী পান। বাবা সুকুমার সরকার অসুস্থতা সত্ত্বেও পেটের দায়ে সপ্তাহে দুদিন হাটবারে খোলা জায়গায় টি-স্টল চালান। এই সামান্য আয়ে সংসারে নুন আনতে পান্তা ফুরানোর অবস্থা।

সংসারের বোঝাটা আরও বড় হয়েছে ঋণের দায় থাকায়। অভাব আর ছেলেমেয়েদের লেখাপড়ার খরচ জোগাতে গ্রামীণ ব্যাংক থেকে ৮০ হাজার টাকা ঋণ নিয়েছেন মা কণা রানী। কিস্তি শোধ করার মতো আয় না হওয়ায় বেসরকারি সংস্থা আশা থেকে আরও ৩০ হাজার টাকা ঋণ নেন। সপ্তাহে ২ হাজার ৩০০ টাকার কিস্তির ভার সইতে না পেরে ধার করেন আরও ৫০ হাজার টাকা। এভাবেই ঋণের জালে জড়িয়ে সহায়-সম্বলহীন পরিবারটি ধুঁকছে। বড় ছেলে কর্ণ সরকার টিউশনি করিয়ে কোনোরকমে নিজের পড়ালেখার খরচ জোগান।

কৌশিকের সফলতার পেছনে সংগ্রাম আর বেদনার নানা টুকরো গল্প রয়েছে। কৌশিক এ প্রতিবেদককে জানান, স্কুলে ভর্তির পর বন্ধুর দেওয়া পুরোনো প্যান্ট আর জুতা দিয়েই শুরু হয় তার স্কুলজীবন। নবম শ্রেণি পর্যন্ত অর্থাভাবে কোনো প্রাইভেট টিউশনি পড়তে পারেননি। পরে কয়েকজন শিক্ষক তাকে বিনা মূল্যে পড়িয়েছেন। একইভাবে এসএসসিতেও প্রবাসী এক ব্যক্তির সহায়তাসহ শিক্ষকদের আন্তরিকতায় তার স্বপ্ন পূরণের যাত্রা অব্যাহত থাকে।

কৌশিক আরও বলেন, অটোরিকশার ভাড়া না থাকায় অনেক দিন স্কুল ও কলেজে যাওয়া হয়নি। সারাদিন অভুক্ত থেকেছেন। ক্ষুধার যে কী কষ্ট, কেউ বুঝবে না। চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন পূরণে বিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হন তিনি। কিন্তু পড়াশোনার খরচ দিতে পারছিলেন না তার বাবা। এবারও এইচএসসিতে কয়েকজন শিক্ষক তাকে বিনা মূল্যে টিউশনি পড়িয়েছেন এবং অন্যান্য সহায়তা করেছেন। নিজেও হোটেল বয়ের কাজ করে পড়াশোনার খরচ জুগিয়েছেন।

কৌশিকের বাবা সুকুমার সরকার জানান, তার তিন ছেলেমেয়েই মেধাবী। তার একটি ছোট টি-স্টল ছিল সড়কের ধারে সরকারি খাসজমিতে। ২০২০ সালে উচ্ছেদের সময় ঘরবাড়ির সঙ্গে দোকানটিও উচ্ছেদ হয়। এরপর এক প্রতিবেশীর সুপারি বাগান ও বাঁশঝাড়ের পাশে মাথা গুঁজে আছেন। বড় ছেলে কর্ণ সরকার কুড়িগ্রাম সরকারি কলেজে অনার্সে পড়েন। আর একমাত্র মেয়ে সূচনাকে এসএসসি পাশ করার পর বিয়ে দিয়েছেন।

বড় ভাই কর্ণ জানান, চরম অভাব-অনটনের মধ্যেও ছোট ভাইয়ের সেরা ফলাফলে আনন্দের বদলে কান্না এসেছিল। তার স্বপ্ন কীভাবে পূরণ হবে, সেটাই এখন পরিবারের সবার দুশ্চিন্তার কারণ।

মা কণা রানী জানান, তাদের দুজনের সামান্য আয়ে সংসারের খরচ মেটে না। তার ওপর রয়েছে ঋণের বোঝা। এ অবস্থায় ছেলের স্বপ্ন পূরণে লেখাপড়ার খরচ জোগানোর কোনো উপায় দেখছেন না। ছেলের স্বপ্ন পূরণে তিনি সরকার ও হৃদয়বান ব্যক্তিদের এগিয়ে আসার আহ্বান জানান।

📢এই সংবাদটি শেয়ার করুন

📢 আপনিও হোন পাঠক সাংবাদিক!

আপনার এলাকার যেকোনো খবর, সমস্যা বা ভিডিও সরাসরি আমাদের নিউজ পোর্টালে জমা দিন

সংবাদ পাঠান ↗
র

রাহুল হাসান

প্রতিবেদক

জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক, ডেইলি বরিশাল। সাংবাদিকতায় ১৫ বছরের অভিজ্ঞতা।

সম্পর্কিত আরও সংবাদ