রহিমা ও রাবেয়া। যমজ দুই বোন। অভাব তাদের নিত্যসঙ্গী। বাবা মনির হোসেন সরদারের স্থায়ী কোনো কাজ না থাকায় দীর্ঘদিন ধরেই আর্থিক সংকটের মধ্যে চলছে তাদের সংসার। সীমিত আয়ে পরিবারের ভরণপোষণের পাশাপাশি দুই বোনের পড়াশোনার খরচ চালানো ছিল কঠিন। কিন্তু অভাবের কাছে হার মানেননি তারা। নিজেদের স্বপ্ন পূরণ এবং পরিবারের কষ্ট কিছুটা হলেও লাঘব করার প্রত্যয় নিয়ে পড়াশোনা চালিয়ে গেছেন দুই বোন। সেই সংগ্রামের স্বীকৃতি মিলেছে এবারের এইচএসসি পরীক্ষায়। দুজনই মানবিক বিভাগ থেকে পেয়েছেন জিপিএ-৫।
কুড়িগ্রামের রাজারহাট উপজেলার ১৪টি কলেজের মধ্যে তারাই একমাত্র জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থী।
রহিমা সরদার ও রাবেয়া সরদারের বাড়ি রাজারহাট উপজেলার ছিনাই ইউনিয়নের রামকার্জী গ্রামে। তারা দুজনই রাজারহাট সরকারি মীর ইসমাইল হোসেন কলেজের শিক্ষার্থী। চলতি বছর কলেজটি থেকে ১৪২ জন শিক্ষার্থী এইচএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছেন। তবে জিপিএ-৫ পেয়েছেন শুধু এই সহোদর যমজ বোন।
মেয়েদের এমন সাফল্যে আবেগাপ্লুত মা নাসিমা বেগম।
তিনি বলেন, ‘অনেক কষ্ট করে মেয়েদের লেখাপড়া করাচ্ছি। সামর্থ্য না থাকায় সব সময় তাদের প্রয়োজনীয় খরচ জোগাতে পারতাম না। শিক্ষকরা দুই বোনকে বিনা পারিশ্রমিকে পড়িয়েছেন। তাদের ভর্তি, ফরম পূরণসহ বিভিন্ন পরীক্ষার ক্ষেত্রে নামমাত্র টাকা নিয়েছে কলেজ কর্তৃপক্ষ। সবার সহযোগিতা না পেলে এত ভালো ফল করতে পারত না ওরা।
যমজ দুই বোনের বাবা মনির হোসেন সরদার জানান, স্থানীয় ব্যবসায়ীদের সঙ্গে চুক্তিতে কাজ করেন তিনি। কিন্তু সব সময় কাজ মেলে না। অধিকাংশ সময়ই বেকার থাকতে হয়।
তিনি বলেন, ‘আমাদের মেয়েরা পড়াশোনার জন্য খুবই সংগ্রাম করছে। তাদের কোনো চাহিদা ছিল না।
অভাবের সংসারে বেড়ে ওঠা দুই বোনের কাছে ভালো ফল করা শুধু নিজেদের স্বপ্ন পূরণের বিষয় ছিল না, ছিল পরিবারের দুঃখ-কষ্ট কিছুটা হলেও কমানোর প্রত্যয়।
রহিমা সরদার বলেন, ‘অনেক সীমাবদ্ধতা ছিল, তবে আমরা হাল ছাড়িনি। এখন আমাদের স্বপ্ন ভালো কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করা। সে লক্ষ্যেই প্রস্তুতি নিচ্ছি।
দুই বোনের এই সাফল্য শুধু পরিবারের মুখেই হাসি ফোটায়নি, গর্বিত করেছে শিক্ষক ও এলাকাবাসীকেও।
কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক মুহা. জহুরুল ইসলাম বলেন, ‘আর্থিক সীমাবদ্ধতার মধ্যেও তাদের এই অসাধারণ সাফল্য প্রশংসনীয়। কলেজ কর্তৃপক্ষ তাদের এমন অর্জনে আনন্দিত ও গর্বিত।
দুই বোনের সামনে এখন উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন পূরণের নতুন চ্যালেঞ্জ। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি ও পড়াশোনার ব্যয় বহন নিয়ে চিন্তিত তাদের পরিবার।
মা নাসিমা বেগম বলেন, ‘আগামীতে মেয়েদের পড়াশোনার ভার কীভাবে চালাব, তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছি। আর্থিক জোগান না পেলে হয়তো মেয়েদের পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যেতে পারে।






