ঢাকার পোস্তগোলার একটি ভাঙারির দোকানে কাজ করতেন আরিফুর রহমান ও মো. ফালু। মালিকের অনুরোধে পুরোনো ভাঙারি মালামাল দেখতে গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে মোটরসাইকেলে টঙ্গীর উদ্দেশে রওনা হন দুজন।
কে জানত, এটিই তাদের শেষ যাত্রা হবে! পথে একটি কাভার্ড ভ্যান মোটরসাইকেলটিকে ধাক্কা দিলে ঘটনাস্থলেই মারা যান ফালু। পরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মারা যান আরিফুর।
একই দিনে জয়পুরহাট-হিলি সড়কের কাশিয়ারবাড়ী এলাকায় বাসের সঙ্গে মুখোমুখি সংঘর্ষে নিহত হন মোটরসাইকেল আরোহী আশিফ হোসেন।
এদিকে কুমিল্লার দাউদকান্দিতে মাদলা এলাকায় মোটরসাইকেলের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে সড়কে পড়ে যান শাহাদাত হোসেন। এ সময় একটি প্রাইভেট কার তাকে চাপা দেয়। কুষ্টিয়ায় মোটরসাইকেলের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে তালগাছের সঙ্গে ধাক্কা লেগে মারা যান আরেক আরোহী রোকন।
এসব বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। গতকালের দুর্ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের বাইরেও প্রায় প্রতিদিন সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারাচ্ছেন মোটরসাইকেলচালক ও তাদের সহযাত্রীরা। একইসঙ্গে মোটরসাইকেলের সংখ্যা বাড়তে থাকায় সড়ক নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগও বাড়ছে।
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮ সালে দেশে নিবন্ধিত মোটরসাইকেলের সংখ্যা ছিল ২৪ লাখ ১৩ হাজার। দ্বিগুণেরও বেশি বেড়ে ২০২৬ সালের আগস্টে তা ৫০ লাখ ৮০ হাজারে দাঁড়িয়েছে।
রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের (আরএসএফ) তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় অন্তত ১ হাজার ৩৮৭ জন নিহত হয়েছেন।
মাসভিত্তিক হিসাবে জানুয়ারিতে ১৯৬, ফেব্রুয়ারিতে ১৭৪, মার্চে ২০৪, এপ্রিলে ১১৩, মে মাসে ১১৩, জুনে ১৩৪, জুলাইয়ে ১৩৮, আগস্টে ১৭৬ এবং সেপ্টেম্বরে ১৩৯ জন মারা গেছেন।
গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, অক্টোবরে সারা দেশে মোটরসাইকেল-সংশ্লিষ্ট অন্তত ৪৫টি দুর্ঘটনায় ৫৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। তবে মাসটির দুর্ঘটনা ও মৃত্যুর পূর্ণাঙ্গ হিসাব এখনো কোনো সংস্থা সংকলন করেনি।
আরএসএফের তথ্য বলছে, ২০২০ সাল থেকে ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ১৬ হাজার ৪০২টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন ১৬ হাজার ২৭ জন।
সবচেয়ে বেশি দুর্ঘটনা ঘটেছে ২০২৫ সালে। ওই বছর ৩ হাজার ২৯টি দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান ২ হাজার ৬৭১ জন। তবে এক বছরে সর্বোচ্চ মৃত্যুর ঘটনা ঘটে ২০২২ সালে। ওই বছর ২ হাজার ৯৭৩টি দুর্ঘটনায় মারা যান ৩ হাজার ৯১ জন।
ফাউন্ডেশনের হিসাবে, ২০২০ সালে ১ হাজার ৩৮১টি দুর্ঘটনায় ১ হাজার ৪৬৩ জন, ২০২১ সালে ২ হাজার ৭৮টি দুর্ঘটনায় ২ হাজার ২১৪ জন, ২০২৩ সালে ২ হাজার ৫৩২টি দুর্ঘটনায় ২ হাজার ৪৮৭ জন এবং ২০২৪ সালে ২ হাজার ৭৬১টি দুর্ঘটনায় ২ হাজার ৬০৯ জন নিহত হন।
বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির হিসাবে, ২০২০ সালে ১ হাজার ২৮৬টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ১ হাজার ৯৭২ জন নিহত এবং ২ হাজার ২৭০ জন আহত হন।
সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালে ১ হাজার ৪৬৩টি দুর্ঘটনায় ১ হাজার ৮৭৪ জন, ২০২২ সালে ২ হাজার ১৯৩টি দুর্ঘটনায় ৩ হাজার ৩১৩ জন, ২০২৩ সালে ২ হাজার ৩১টি দুর্ঘটনায় ২ হাজার ১৫২ জন এবং ২০২৪ সালে ২ হাজার ৩২৯টি দুর্ঘটনায় ২ হাজার ৫৭০ জন নিহত হন।
২০২৫ সালে সমিতি ২ হাজার ৪৯৩টি দুর্ঘটনার হিসাব নথিভুক্ত করে। এসব দুর্ঘটনায় ২ হাজার ৯৮৩ জন নিহত এবং ২ হাজার ২১৯ জন আহত হন।
আরএসএফের নির্বাহী পরিচালক সাইদুর রহমান সাংবাদিকদের বলেন, বাংলাদেশে নিবন্ধিত মোট যানবাহনের ৭১ শতাংশই মোটরসাইকেল। এসব মোটরসাইকেলের অনেক আরোহীই কিশোর ও তরুণ।
তিনি জানান, তরুণদের মধ্যে বেপরোয়া মোটরসাইকেল চালানোর প্রবণতা ক্রমেই বাড়ছে। এর পেছনে মোটরসাইকেল প্রস্তুতকারক ও বিপণনকারী প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপনেরও ভূমিকা রয়েছে। এসব বিজ্ঞাপনে রোমাঞ্চ ও অতিরিক্ত গতির প্রতি উৎসাহ দেওয়া হয়।
‘ফলে মোটরসাইকেলচালকরা নিজেরাই দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছেন, একইসঙ্গে পথচারী ও অন্য সড়ক ব্যবহারকারীরাও ঝুঁকিতে পড়ছেন,’ তার ভাষ্য।
দুর্ঘটনার পেছনে বাস ও পণ্যবাহী যানবাহনের চালকদের বেপরোয়া গাড়ি চালানোর প্রবণতাকেও দায়ী করেন তিনি। তার মতে, এসব যানবাহনের অনেক চালকই শারীরিক ও মানসিকভাবে গাড়ি চালানোর উপযুক্ত নন।
সাইদুর রহমান বলেন, মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় নিহত ও আহত ব্যক্তিদের ৫৮ শতাংশের বয়স ১৩ থেকে ৩৫ বছরের মধ্যে।
তিনি বলেন, চার চাকার যানবাহনের তুলনায় মোটরসাইকেলে দুর্ঘটনার ঝুঁকি ৩০ গুণ বেশি। পর্যাপ্ত গণপরিবহনের অভাব ও যানজটের কারণে মানুষ বেশি করে দুই চাকার যানবাহনের দিকে ঝুঁকছেন।
নিম্নমানের হেলমেট ব্যবহারকেও মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ার পেছনে বড় কারণ হিসেবে চিহ্নিত করে তিনি বলেন, ‘মানসম্মত হেলমেট দুর্ঘটনায় মৃত্যুর ঝুঁকি ৪৮ শতাংশ কমায়।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের (এআরআই) সহকারী অধ্যাপক কাজী মো. সাইফুন নেওয়াজ বলেন, মোটরসাইকেলের সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এ-সংক্রান্ত ঝুঁকিও বাড়ছে।
দুর্ঘটনা কমাতে মোটরসাইকেলের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি বিবেচনা করা উচিত বলে মনে করেন তিনি। পাশাপাশি চালক ও সহযাত্রী—উভয়ের জন্য যথাযথ নিরাপত্তামানসম্পন্ন হেলমেট ব্যবহার নিশ্চিত করার ওপর জোর দেন।
তিনি বলেন, ‘বিদ্যমান আইনে মোটরসাইকেলচালকদের হেলমেট পরা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। তবে কী ধরনের হেলমেট ব্যবহার করতে হবে, সে বিষয়ে নিরাপত্তামান স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করা প্রয়োজন।
এ বিষয়ে সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত সচিব আনিসুর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা কমাতে সড়ক নিরাপত্তা আইনের আওতায় সরকার প্রাথমিক কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে।
তিনি জানান, মহাসড়কে মোটরসাইকেলে চালকসহ দুজনের বেশি আরোহী থাকা যাবে না এবং ডিজিটাল নম্বরপ্লেট থাকতে হবে। চালকদের নির্ধারিত সার্ভিস লেন ব্যবহার করতে হবে, গতিসীমা মেনে চলতে হবে এবং চালক ও সহযাত্রী—উভয়কেই বিএসটিআই অনুমোদিত হেলমেট পরতে হবে। এসব নিয়ম অমান্য করলে জরিমানা করা হবে।
তিনি আরও বলেন, ‘তবে শুধু আইন প্রয়োগ করলেই হবে না। সড়ক ব্যবহারকারীদেরও অবশ্যই ট্রাফিক আইন ও সরকারি নির্দেশনা মেনে চলতে হবে।






