মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব নিত্যপণ্যের বাজারে এমনিতেই দিশেহারা মানুষ। সংসারের হিসাব মেলাতে যখন হিমশিম খেতে হচ্ছে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারকে, ঠিক তখনই মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা হয়ে এসেছে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি। তেলের দাম বাড়ার একদিন না যেতেই বাজারে উত্তাপ ছড়িয়েছে সবজি, আটা-ময়দা, ভোজ্যতেলসহ অন্তত ১০টি পণ্যের দামে। গ্যাস-বিদ্যুতের সংকটের সঙ্গে জ্বালানি ব্যয়ের বাড়তি চাপ-সব মিলিয়ে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন সব শ্রেণি-পেশা ও সাধারণ মানুষ।
বাজারে দামের ছনট: সবজি থেকে আটা-ময়দা পর্যন্ত ব্যাপক বৃদ্ধি
সোমবার রাজধানীর একাধিক খুচরা বাজার ঘুরে বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রতিকেজি বেগুন আকার ও মানভেদে ৯০-১৩০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, যা একদিন আগে ছিল ৮০-১২০ টাকা। প্রতিকেজি শসা সর্বনিম্ন ৫০ থেকে সর্বোচ্চ ৮০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, অন্যদিনে ছিল সর্বনিম্ন ৪০ টাকা। প্রতিকেজি কাঁচামরিচ বিক্রি হচ্ছে সর্বনিম্ন ১০০ থেকে সর্বোচ্চ ১৬০ টাকা, যা আগে ছিল ৮০ টাকা। প্রতি হালি ফার্মের ডিম বিক্রি হচ্ছে ৫৫ টাকা, দুই দিন আগে ছিল ৫০ টাকা। প্রতিকেজি তেজপাতা বিক্রি হচ্ছে ২৫০-৩০০ টাকা, সপ্তাহ আগে ছিল ১৯০-২৪০ টাকা। আমদানি রসুনের দাম প্রতিকেজি ১৮০ টাকা, যা আগে ছিল ১৬০ টাকা।
এছাড়া খুচরা পর্যায়ে বড় দানার মসুর ডাল প্রতিকেজি বিক্রি হচ্ছে ৯৫-১০০ টাকা, আগে ছিল ৯০-১০০ টাকা। প্রতিকেজি খোলা আটা ৫০ টাকা, যা আগে ৪৮ টাকা। খোলা ময়দা প্রতিকেজি বিক্রি হচ্ছে ৭০ টাকা, আগে ছিল ৬৫ টাকা। খোলা পামওয়েল বিক্রি হচ্ছে লিটারপ্রতি ১৭০ টাকা, যা আগের দিনও ছিল ১৬৬ টাকা। একসাথে দেখলে বোঝা যায়, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্রভাবে প্রায় সব ধরনের পণ্যের দাম একদিনের মধ্যেই বাড়েছে।
মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমছে, সংসারকে চিরতরে চাপ
গয়কালের কয়েকমাস ধরে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ, অর্থনৈতিক মন্দা ও মূল্যস্ফীতির চাপে এমনিতেই কমে গেছে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা। আয় না বাড়লেও ব্যয়ের বোঝা বাড়তে থাকায় সংসারে একের পর এক খরচ কমাতে হচ্ছে। বিশেষ করে মধ্যবিত্তের অবস্থান এখন সবচেয়ে নাজুক। বিভিন্ন খাতে খরচ কমিয়ে বাধ্য হয়ে তাদের জীবনযাত্রার মান কমাতে হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে সরকার রবিবার রাতে ডিজেল, অকটেন, পেট্রোল ও কেরোসিনের দাম লিটারপ্রতি ২০ টাকা করে বাড়ানোর ঘোষণা দিয়ে সোমবার থেকে কার্যকর করার আগেই বাজারে দামের আগুন ছড়িয়ে পড়ে।
এক চাকরিজীবীর সংসার: খরচ বাড়তেই ঋণের গর্তে পড়ছে পরিবার
নয়াবাজারে নিত্যপণ্য কিনতে এসেছেন মো. সোহাগ। তিনি বলেন, তিনি একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে মাসিক ৪২ হাজার টাকা বেতনে চাকরি করেন। মা-বাবা, স্ত্রী ও এক ছেলে নিয়ে তার সংসার। সেখান খাবার জোগাড় করতে মাসে ৫০ কেজি চালে ৪ হাজার, ৫ লিটার তেলে এক হাজার, বাসা ভাড়া ১৪ হাজার, সবজি-মাছ-ব্রয়লার মুরগি সহ তরকারি রান্নার উপকরণে ৯ হাজার, গ্যাস সিলিন্ডার ৩০০০, সাবান-ডিটারজেন্ট ও শ্যাম্পুতে ৫০০, মুদি বাজারে ২ হাজার, বিদ্যুৎ বিল ২ হাজার ও মোবাইল টকটাইমে ৫০০ টাকা। মা-বাবার হাতে ৫ হাজার টাকা দিলে মোট খরচ হয় ৪১ হাজার টাকা। সংসারের খরচ বহন করতে না পেরে তিনি ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়েছেন বলে যুগান্তরকে জানান।
নয়াবাজারের মুদি ব্যবসায়ী মো. আমিনুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি পণ্যের দামে সরাসরি প্রভাব ফেলছে। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে বাজার স্থিতিশীল রাখতে নজরদারি জোরদার করা হবে এবং কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে মানুষের কাছে প্রশ্ন হলো—আয় না বাড়লে মূল্যবৃদ্ধির চাপ কীভাবে সহ্য করা যাবে? তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাবে টিকে থাকাই দায় হয়ে পড়বে, এবং সরকারকে এই বিষয়টি নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করা উচিত।






-6aa955a4eb589.webp)