শুক্রবার, ৯ অক্টোবর, ২০২৬
২৩শে আশ্বিন, ১৪৩৩

ডেইলি বরিশাল

দক্ষিণাঞ্চলের শীর্ষস্থানীয় ও বস্তুনিষ্ঠ দৈনিক পত্রিকা

ধর্ম ও জীবন

রপ্তানিতে ছিল শীর্ষে, এখন দেনার দায়ে নিমজ্জিত

রপ্তানিতে ছিল শীর্ষে, এখন দেনার দায়ে নিমজ্জিত...

ন
নাজমুল ইসলাম· বিশ্লেষক
প্রকাশ: ৯ অক্টোবর ২০২৬, ৪:০৭ এএমসর্বশেষ: ৯ অক্টোবর ২০২৬, ৪:০৭ এএম
রপ্তানিতে ছিল শীর্ষে, এখন দেনার দায়ে নিমজ্জিত

খুলনার সুপার জুট মিল একসময় প্রতিদিন ২০-৩০ লাখ টাকা লাভ করত। বিশ্বের ২৪টি দেশে রপ্তানি হতো পাটজাত পণ্য। বিদেশি ক্রেতারা পণ্য পাওয়ার আগেই দিতেন অগ্রিম অর্থ। রপ্তানিতে অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে তিনবার রাষ্ট্রীয় পুরস্কারও পেয়েছে। সেই শিল্পপ্রতিষ্ঠানই আজ ঋণের ভারে বিপর্যস্ত। একই পরিণতির পথে প্রতিষ্ঠানটির উদ্যোগে গড়ে ওঠা সুপারেক্স লেদারও।

উদ্যোক্তার দাবি, ব্যবসায়িক ব্যর্থতায় নয়; বরং প্রয়োজনীয় ব্যাংক অর্থায়ন বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। অন্যদিকে ব্যাংক বলছে, ঋণ পরিশোধে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার অভাব এবং কিস্তি পরিশোধে ব্যর্থতার কারণে প্রতিষ্ঠান দুটি সংকটে পড়েছে।

খুলনার ফুলতলা উপজেলার আলকা গ্রামে ২০০৬ সালে প্রায় ২৫০ কোটি টাকা বিনিয়োগে প্রতিষ্ঠিত হয় সুপার জুট মিল। স্থানীয় প্রায় পাঁচ হাজার মানুষের কর্মসংস্থানের পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানটি দেশের পাটপণ্য রপ্তানিতে বেসরকারি খাতে শীর্ষস্থানীয় অবস্থান তৈরি করে।

গুণগতমানের কারণে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ক্রেতাদের কাছে এর পাটজাত পণ্যের চাহিদা তৈরি হয়। একপর্যায়ে প্রতিষ্ঠানটির দৈনিক লাভ ৩০ লাখ টাকা পর্যন্ত হয়েছিল বলে ব্যবস্থাপনা সূত্রে জানা গেছে।

প্রতিষ্ঠানটির ধারাবাহিক সাফল্যের পর শিল্প খাত সম্প্রসারণে উদ্যোক্তাকে উৎসাহিত করে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি। ব্যাংকের পক্ষ থেকে বড় অঙ্কের অর্থায়নের আশ্বাস পেয়ে ২০১৬ সালে খুলনার উত্তরডিহি গ্রামে প্রায় ৭০০ কোটি টাকা বিনিয়োগে সুপারেক্স লেদার প্রতিষ্ঠা করেন উদ্যোক্তা এম ফিরোজ আহমেদ ভূঁইয়া। প্রতিষ্ঠানটি অত্যাধুনিক বিদেশি যন্ত্রপাতি নিয়ে উৎপাদনে যাওয়ার প্রস্তুতি নেয়।

ব্যবস্থাপনা সূত্রের দাবি, সুপারেক্স লেদার লেদার ওয়ার্কিং গ্রুপের (এলডব্লিউজি) সনদপ্রাপ্ত এবং পরিবেশগত মান নিশ্চিত করতে ইতালি থেকে প্রায় ১৪ লাখ ডলার ব্যয়ে ইটিপি প্ল্যান্ট স্থাপন করে। বাংলাদেশে গ্রিন কোম্পানির স্বীকৃতি পাওয়া তিনটি কারখানার একটি হিসেবেও প্রতিষ্ঠানটিকে উল্লেখ করা হয়।

তবে উৎপাদনে যাওয়ার পর প্রয়োজনীয় চলতি মূলধন না পাওয়ায় সংকটে পড়ে প্রতিষ্ঠানটি।

ব্যবস্থাপনা সূত্র জানায়, নিজস্ব অর্থায়নে প্রায় ১৫০ কোটি টাকার চামড়া কেনা হয়েছিল। কিন্তু চামড়া প্রক্রিয়াজাতকরণের জন্য প্রয়োজনীয় রাসায়নিক ও অন্যান্য উপকরণ কেনার অর্থ ব্যাংক থেকে চেয়েও পাওয়া যায়নি। এ কারণে সময়মতো চামড়া প্রক্রিয়াজাত করা সম্ভব হয়নি। এতে প্রতি বর্গফুট ৮০ টাকা দরে কেনা চামড়ার দাম একপর্যায়ে কমে প্রায় ২০ টাকায় নেমে আসে।

সুপার জুট মিল ও সুপারেক্স লেদারের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফিরোজ আহমেদ ভূঁইয়ার দাবি, ২০১৭ সালের পর ব্যাংক থেকে প্রয়োজনীয় চলতি মূলধন না পাওয়ায় ধীরে ধীরে উৎপাদন ও ব্যবসা সংকুচিত হতে থাকে। তার অভিযোগ, তার দুটি লাভজনক প্রতিষ্ঠানের দিকে তৎকালীন ব্যাংক নিয়ন্ত্রণকারী এস আলম গ্রুপের ‘নজর’ পড়েছিল। অর্থায়ন বন্ধ রেখে প্রতিষ্ঠান দুটিকে দুর্বল করে দখলে নেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল বলেও অভিযোগ করেন তিনি। তবে এ অভিযোগের বিষয়ে এস আলম গ্রুপের বক্তব্য প্রতিবেদনে পাওয়া যায়নি।

ফিরোজ আহমেদ ভূঁইয়া বলেন, তার প্রতিষ্ঠানের সম্পদের মূল্য শেষ হয়ে যায়নি; বরং উৎপাদন চালু রাখার মতো অর্থের সংস্থানই এখন প্রধান সমস্যা। তার দাবি, একসময় সুপারেক্স লেদারের মূল্য প্রায় ৭০০ কোটি টাকায় পৌঁছেছিল। তখন ব্যাংকের পাওনা ছিল প্রায় ৬০০ কোটি টাকা। বর্তমানে সুদাসলসহ ওই দায় বেড়ে প্রায় ৯০০ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে।

ব্যাংকের সহযোগিতা পেলে প্রতিষ্ঠান দুটি পুনরায় উৎপাদনে ফিরতে পারবে বলে মনে করেন তিনি। এজন্য প্রতিষ্ঠান দুটির জন্য প্রায় ২০০ কোটি টাকা চলতি মূলধন চাওয়া হয়েছে বলেও জানান উদ্যোক্তা।

তবে ইসলামী ব্যাংকের দৌলতপুর শাখার ব্যবস্থাপক ইফতেখার হোসেন বলেন, ঋণ পরিশোধের ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে ব্যাংকের কাছে এখনো সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা পাওয়া যায়নি। বাংলাদেশ ব্যাংকের বিশেষ সার্কুলারের আওতায় গত ডিসেম্বরে ২ শতাংশ অর্থ জমা দিয়ে খেলাপিমুক্ত হওয়ার সুযোগ থাকলেও প্রতিষ্ঠানটি তা নেয়নি।

তিনি জানান, প্রতিষ্ঠানটির ঋণ তিন-চারবার পুনঃতফসিল করা হয়েছে। সবশেষ জুলাই থেকে কিস্তি পরিশোধের কথা থাকলেও ইতোমধ্যে তিনটি কিস্তি বকেয়া পড়েছে।

ব্যাংক কর্মকর্তা বলেন, ২০১৫-১৬ সালের দিকে ব্যাংকের হাতে উদ্বৃত্ত তহবিল থাকায় ভালো ব্যবসায়ীদের নতুন বিনিয়োগের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। তবে সুপার গ্রুপকে কী ধরনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল এবং পরে কেন বিনিয়োগ করা হয়নি, সে বিষয়ে তিনি বিস্তারিত বলতে পারেননি। কারণ, ওই সময়ে তিনি সংশ্লিষ্ট শাখায় কর্মরত ছিলেন না।

তবে প্রতিষ্ঠান দুটি ঘুরে দাঁড়াতে ব্যাংকের কাছে বর্তমানে প্রায় ২০০ কোটি টাকা চলতি মূলধন চাওয়া হচ্ছে বলেও জানান তিনি।

একসময় রপ্তানি ও উৎপাদনে সাফল্যের দৃষ্টান্ত তৈরি করা প্রতিষ্ঠান দুটি এখন নতুন করে অর্থায়ন পেলে ঘুরে দাঁড়াতে পারবে কি না, নাকি ঋণের বোঝায় তাদের কার্যক্রম স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে যাবে—সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।

📢এই সংবাদটি শেয়ার করুন

📢 আপনিও হোন পাঠক সাংবাদিক!

আপনার এলাকার যেকোনো খবর, সমস্যা বা ভিডিও সরাসরি আমাদের নিউজ পোর্টালে জমা দিন

সংবাদ পাঠান ↗
ন

নাজমুল ইসলাম

বিশ্লেষক

রাজনৈতিক রিপোর্টার, বিশ্লেষক ও কলামিস্ট।

সম্পর্কিত আরও সংবাদ