বিতর্কিত ভোটার তালিকা সংশোধনের প্রতিবাদে ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে শুরু হওয়া ককরোচদের আন্দোলন এবং প্রধান বিরোধী দলগুলোর গণবিক্ষোভ কঠোর পুলিশি দমন-পীড়নের মাধ্যমে পণ্ড করে দেওয়ার ঘটনা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। এ নিয়ে শীর্ষ আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম রয়টার্স, বিবিসি, আল জাজিরা এবং ডয়চে ভেলের (ডিডাব্লিউ) বিশেষ প্রতিবেদনে দিল্লির অঘোষিত লকডাউন ও নজিরবিহীন পুলিশি ব্যবস্থার চিত্র উঠে এসেছে।
রয়টার্স তাদের বিশেষ প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে যে, শুধু দিল্লিতেই দুই হাজারের বেশি (২,০০০+) বিক্ষোভকারীকে আটক করেছে পুলিশ। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সূত্রের বরাতে তারা জানায়, মুম্বাইয়েও আরও প্রায় ৪০০ জনকে আটক করা হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, দিল্লির গান্ধী স্মৃতিসৌধ ও বিভিন্ন বাজারে ছড়িয়ে ছিটিয়ে তরুণরা ‘বিপ্লব দীর্ঘজীবী হোক’ বলে স্লোগান দেওয়ার চেষ্টা করলে পুলিশ তাদের টেনেহিঁচড়ে বাসে তোলে। এছাড়া সংবাদ সংগ্রহের সময় রয়টার্সের একজন সাংবাদিকসহ আরো অন্তত চারজন স্থানীয় গণমাধ্যমকর্মীকে পুলিশ সাময়িকভাবে আটক করে।
বিবিসি জোর দিয়েছে আন্দোলনের প্রেক্ষাপট ও জেন-জি (Gen-Z) তরুণদের প্রতিক্রিয়ার ওপর। প্রতিবেদনে বলা হয়, ভারতের প্রধান বিচারপতি এক সময় কর্মহীন যুবকদের ব্যঙ্গ করে ককরোচ বলার পর অভিজিৎ দিপকে এই ব্যঙ্গাত্মক ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি) প্রতিষ্ঠা করেন। বিবিসি জানায়, দিল্লির যন্তর মন্তরে বিক্ষোভের অনুমতি না দিয়ে বিমানবন্দর থেকেই সিজেপির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দিপকে এবং অন্য নেতাদের ফ্লাইট নামার পরপরই আটক করা হয়।
আল জাজিরা পুরো রাজধানীকে লকডাউন করার ওপর আলোকপাত করেছে। তাদের প্রতিবেদনে বলা হয়, এক হাজারের বেশি আইনজীবী, ছাত্রনেতা ও বিরোধী রাজনীতিবিদকে আটক করে সরকার আন্দোলন দমাতে চেয়েছিল। বিজেপি মুখপাত্র সম্বিত পাত্র বিক্ষোভকারীদের নৈরাজ্যবাদী উপাদান এবং সমাবেশকে ‘ফ্লপ শো’ বলে উড়িয়ে দিয়ে দাবি করেন যে দেশ সুশাসনের দিকে এগোচ্ছে।
ডিডাব্লিউ ভোটার তালিকা থেকে কোটি কোটি নাম কাটার কারসাজি ও বিরোধীদের বক্তব্যকে বড় করে তুলেছে। প্রতিবেদনে বিরোধী নেতা রাহুল গান্ধীর উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়, তিনি এই দমন-পীড়নকে ‘কাপুরুষোচিত’ বলে আখ্যা দেন এবং নরেন্দ্র মোদি ও অমিত শাহকে এই গল্পের মূল খলনায়ক হিসেবে অভিহিত করেন। কংগ্রেস এমপি প্রিয়াঙ্কা গান্ধী ভদ্র মন্তব্য করেন, ভারত আর কোনো গণতন্ত্র নেই, এটি নরেন্দ্র মোদি ও অমিত শাহের পরিচালিত একনায়কতন্ত্র।
সমাবেশস্থল যন্তর মন্তরে কাউকে পৌঁছাতে না দিতে পুরো এলাকা কাঁটাতার, ব্যারিকেড ও কংক্রিটের ব্লক দিয়ে পুরোপুরি সিলগালা করে দেওয়া হয়। দিল্লির মূল প্রবেশপথগুলোতে চেকপোস্ট বসিয়ে প্রতিটি গাড়িতে তল্লাশি চালানো হয়।
দিল্লিগামী বেশ কিছু দূরপাল্লার ট্রেন বাতিল করা হয়, ডজনখানেক গুরুত্বপূর্ণ মেট্রো স্টেশন ও কেন্দ্রীয় বাজার বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং সেন্ট্রাল বিজনেস ডিস্ট্রিক্টসহ স্পর্শকাতর এলাকাগুলোতে মোবাইল ইন্টারনেট সেবা সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়।
মুম্বাই থেকে দিল্লির ইন্দিরা গান্ধী বিমানবন্দরে নামার সঙ্গে সঙ্গেই ফ্লাইটের ভেতর ঢুকে পুলিশ সিজেপি নেতাদের আটক করে।
হাজার হাজার পুলিশ ও আধাসামরিক বাহিনীর সদস্য রাস্তায় টহল দেয় এবং রাজপথগুলোতে টিয়ারগ্যাস উৎক্ষেপক সাঁজোয়া (অ্যান্টি-রায়ট) যান নামিয়ে আতঙ্ক সৃষ্টি করা হয়।
বিক্ষোভের সরাসরি ফুটেজ ও খবর বন্ধ করতে রয়টার্সসহ স্বাধীন ডিজিটাল গণমাধ্যমের সাংবাদিকদের ক্যামেরা কেড়ে নেওয়া ও সাময়িকভাবে প্রিজন ভ্যানে আটকে রাখা হয়।
ভারতের নির্বাচন কমিশনের দাবি, প্রায় ১৩ কোটি মৃত, স্থানান্তরিত বা ভুয়ো ভোটার বাদ দিতেই এই নিয়মিত হালনাগাদ করা হয়েছে। তবে বিরোধীরা এটিকে আসন্ন বিধানসভা ও সাধারণ নির্বাচনের আগে বিরোধী ভোটারদের ছাঁটাই করার সরকারি চক্রান্ত হিসেবে দেখছে।



