একটা সময় সকালে আমাদের ঘুম ভাঙত অ্যালার্মের শব্দে নয়, হকারের ডাকে। ‘পুরোনো লোহা-ভাঙারি!’, ‘তরকারি নেবেন?’, ‘ছাই লাগবে ছাইই?’, ‘ডিম...’ কিংবা ‘আইসক্রিমমম...’—এসব ছিল আমাদের শহুরে জীবনের এক অদৃশ্য সুর। দিনজুড়ে এই হকারদের ডাক শুধু পণ্য বিক্রির আহ্বান ছিল না, ছিল একেকটি সময়ের চিহ্ন।
ভোরের আলো ফুটতেই পাড়ার অলিগলিতে দেখা মিলত পত্রিকা বিক্রেতাদের। সাইকেলের ক্রিং ক্রিং শব্দে বাড়ি বাড়ি খবর পৌঁছে দেওয়া হতো। বাবারা নাশতার টেবিলে অপেক্ষা করতেন যত খবরা-খবর জানার জন্য। গলির মোড়েও দেখা যেত পত্রিকা, ফ্যাশন কিংবা খেলার ম্যাগাজিন। অনেকের বাড়িতে রাখা হতো সানন্দা।
সকাল গড়িয়ে দুপুর এলে সময়টা হতো সবজি বিক্রেতাদের! মাথায় ঝুড়ি কিংবা টুকরি, তাতে সাজানো টাটকা শাক-সবজি নিয়ে তারা ডাক দিতেন, ‘তরকারি নিবেন, টাটকা তরকারি?’। মায়েরা বারান্দায় গিয়ে দাম জিজ্ঞেস করতেন, ‘কত?’ কেউ নিচে নেমে দরদাম করতেন।
কোনো বাড়িওয়ালা বিক্রেতাদের উপরে ওঠার অনুমতি দিতেন না। সেক্ষেত্রে ক্রেতাকেই আবার সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামতে হতো। কোনো কোনো বাড়িওয়ালা হয়তো সেই অনুমতি দিতেন। তখন বিক্রেতারাই উপরে উঠে আসতেন। দরদাম করে পানি দিয়ে সতেজ রাখা হরেক রকম সবজি, শাক দেখে দেখে কিনতেন মায়েরা।
বেশিরভাগ সময়েই এই বিক্রেতারা আমাদের পরিচিত হয়ে উঠতেন। কোনো একদিন না এলে আমরা ভাবতাম, ওনারা ঠিক আছেন তো! কেননা এই নিত্যদিনের ডাকের সঙ্গে জড়িয়ে ছিল এক ধরনের নির্ভরতা, যা আজ সুপারশপ আর অনলাইন ডেলিভারির যুগে ক্রমেই হারিয়ে গেছে। ভ্যানগাড়িসহ সবজি বিক্রেতাদের এখনো দেখা গেলেও বাড়ি বাড়ি গিয়ে তরকারি বিক্রির প্রচলন এখন আর নেই বললেই চলে।
দুপুর গড়িয়ে একটু বিকেল নামলেই অন্য এক শব্দের অপেক্ষা শুরু হতো। দূর থেকে ভেসে আসত পরিচিত ‘ক্রিং ক্রিং’ ধ্বনি... আইসক্রিমওয়ালার ঘণ্টির সেই শব্দ যেন আমাদের জন্য ছিল এক বিশেষ আহ্বান। খেলার মাঠ থেকে, পড়ার টেবিল থেকে, কিংবা বারান্দা থেকে ছুটে আসত শিশু-কিশোররা। হাতে কটা টাকা নিয়ে দাঁড়িয়ে যেত রঙিন আইসক্রিমের আশায়। সেই ঘণ্টির শব্দে শুধু আইসক্রিমের স্বাদ ছিল না, ছিল গ্রীষ্মের বিকেল, বন্ধুত্ব আর ছোট ছোট আনন্দের স্মৃতি।
শুধু আইসক্রিম নয়, দিনের বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন হকারের ডাক শহরের ছন্দকে আলাদা রূপ দিত। কেউ বিক্রি করতেন মাটির হাঁড়ি, কেউ মাছ কাটার ছাই, কেউ পুরোনো কাপড়ের বদলে বাসন, কেউ আবার ছুরি-কাঁচিতে ধার দিতেন। প্রতিটি ডাকের ছিল নিজস্ব সুর, নিজস্ব পরিচয়। অনেক সময় শুধু কণ্ঠস্বর শুনেই বোঝা যেত কে এসেছে।
এসব ডাকের পেছনে লুকিয়ে আছে হাজারো মানুষের জীবিকার গল্প। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত রোদ, বৃষ্টি কিংবা যানজট উপেক্ষা করে তারা ঘুরে বেড়াতেন এক গলি থেকে আরেক গলিতে। এই ডাকই যেন ছিল তাদের পরিবারের জন্য দুবেলা খাবার জোগাড়ের সংগ্রামের ভাষা। শহরের মানুষ হয়তো কিছু সবজি, একটি আইসক্রিম কিংবা ছোট কোনো পণ্য কেনেন। কিন্তু সেই কেনার মধ্যেই জড়িয়ে থাকে শ্রমজীবী মানুষের দিনের আয়।
সময়ের সঙ্গে শহর বদলেছে। অনেক পরিচিত ডাক এখন আর শোনা যায় না। আমাদের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে জড়ানো পরিচিত সেই মানুষেরা এখন কেমন আছেন, কোন জীবিকায় আছেন—সেটা জানার সুযোগ হয়তো নেই! অনলাইন বাজার, সুপারশপ আর আধুনিক জীবনযাত্রা ধীরে ধীরে বদলে দিয়েছে পুরোনো অভ্যাস।



