একদিকে বাড়ছে ডেঙ্গুর প্রকোপ, অন্যদিকে রোগীদের জন্য পৃথক চিকিৎসা ব্যবস্থার সংকটে পড়েছে বরিশাল শের-ই-বাংলা চিকিৎসা মহাবিদ্যালয় (শেবাচিম) হাসপাতাল। পুরুষ মেডিসিন ইউনিটের ১২ শয্যার একটি ডেঙ্গু কর্নারে জায়গা হয়েছে ২৫ রোগীর। অতিরিক্ত ১৩ জনকে রাখতে হয়েছে সাধারণ রোগীদের পাশেই। অনেকের নেই মশারি, নেই পর্যাপ্ত জায়গা। ফলে ডেঙ্গু রোগীর চিকিৎসার পাশাপাশি ঝুঁকিতে পড়েছেন অন্য রোগী ও স্বজনরাও।
বৃহস্পতিবার শেবাচিম হাসপাতালের পুরাতন ভবনের চতুর্থ তলার ৩২ নম্বর ওয়ার্ডের পুরুষ মেডিসিন ইউনিট-১-এর ডেঙ্গু কর্নারে গিয়ে দেখা যায়, নির্ধারিত ১২টি শয্যার বিপরীতে ভর্তি রয়েছেন ২৫ জন। জায়গা না থাকায় ১৩ জন ডেঙ্গু রোগীকে সাধারণ মেডিসিন রোগীদের সঙ্গে রেখেই চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। মশারি ছাড়াই অনেক রোগীকে শুয়ে থাকতে দেখা যায়। পাশের ৩৩ নম্বর ওয়ার্ডের মহিলা মেডিসিন ইউনিট-১ ও ৩-এও একই চিত্র দেখা গেছে। নতুন ভবনের কয়েকটি ওয়ার্ডেও ডেঙ্গু ও সাধারণ রোগীদের পাশাপাশি চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।
তথ্যমতে, চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ২২ অক্টোবর পর্যন্ত বিভাগের সরকারি হাসপাতালগুলোতে ১৬ হাজার ১৬৯ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয়েছেন। চিকিৎসা শেষে ছাড়পত্র পেয়েছেন ১৫ হাজার ৩৮৬ জন। এ সময়ে মারা গেছেন ২৮ জন। এর মধ্যে শেবাচিম হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ২ হাজার ৯৮ জন। অর্থাৎ বিভাগের সরকারি হাসপাতালে ভর্তি হওয়া মোট ডেঙ্গু রোগীর ১৩ শতাংশই চিকিৎসা নিয়েছেন এ হাসপাতালে। শেবাচিম থেকে ছাড়পত্র পেয়েছেন ১ হাজার ৮৮৬ জন এবং মারা গেছেন ২৪ জন।
হাসপাতালে চিকিৎসাধীন সাধারণ রোগী আবদুর রহমান বলেন, ‘একটি রোগের চিকিৎসা নিতে হাসপাতালে এসেছি। এখন ডেঙ্গু রোগীর পাশেই থাকতে হচ্ছে। এতে নতুন করে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হওয়ার ভয় হচ্ছে।’ ডেঙ্গু রোগীর স্বজন মাহফুজা বেগম বলেন, আলাদা জায়গা না থাকায় রোগীকে নিয়ে তারা আতঙ্কে রয়েছেন। মশারি না থাকায় ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীকে মশার কামড় থেকে নিরাপদ রাখাও কঠিন হয়ে পড়েছে। চিকিৎসার জায়গা মিললেও মশারি পাওয়া যাচ্ছে না বলে অভিযোগ করেন তিনি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক নার্স জানান, রোগীর সংখ্যা বেশি হওয়ায় ডেঙ্গু রোগীদের সম্পূর্ণ আলাদা রাখার ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতা তৈরি হয়েছে। নির্ধারিত শয্যা ও জায়গায় সব রোগীকে রাখা সম্ভব না হওয়ায় হাসপাতালের অন্য অংশেও তাদের রাখতে হচ্ছে।
বরিশাল সচেতন নাগরিক সমাজের সদস্য সচিব ডা. মিজানুর রহমান বলেন, শেবাচিম দক্ষিণাঞ্চলের বিপুলসংখ্যক মানুষের চিকিৎসার প্রধান ভরসা। অথচ, রোগীর চাপের তুলনায় হাসপাতালের অবকাঠামো ও জনবল বাড়েনি। দীর্ঘদিন ধরেই এখানে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও চিকিৎসা সরঞ্জামের ঘাটতি রয়েছে।
তিনি বলেন, ‘ডেঙ্গুর মতো মশাবাহিত রোগের রোগীদের পৃথক ব্যবস্থাপনা করা জরুরি। তা না হলে হাসপাতাল থেকেই নতুন সংক্রমণের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। ডেঙ্গু রোগীদের জন্য পর্যাপ্ত পৃথক শয্যা, মশারি, প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সরঞ্জাম ও জনবল নিশ্চিত করতে হবে।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, অতিরিক্ত রোগীর চাপের কারণেই বর্তমানে কিছু ডেঙ্গু রোগীকে সাধারণ রোগীদের সঙ্গে চিকিৎসা দিতে হচ্ছে। ডেঙ্গু রোগীদের জন্য পৃথক ব্যবস্থা থাকলেও সেখানে সব রোগীকে স্থান দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।
এ বিষয়ে শেবাচিম হাসপাতালের সহকারী পরিচালক (প্রশাসন) মাহামুদ হাসানকে কল দিলে তিনি তা রিসিভ করেননি। শেবাচিম হাসপাতাল ৫০০ শয্যার জনবল ও অবকাঠামো নিয়ে তৈরি হলেও বর্তমানে কাগজে-কলমে শয্যা সংখ্যা ১ হাজার। অথচ প্রতিদিন হাসপাতালে ভর্তি থাকেন প্রায় আড়াই হাজার রোগী। বহির্বিভাগেও চিকিৎসা নিতে আসেন আরও প্রায় আড়াই হাজার মানুষ।
হাসপাতালে চিকিৎসকের অনুমোদিত ৫৭১টি পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন ৩৩১ জন। শূন্য রয়েছে ২৪০টি পদ। চিকিৎসকের পাশাপাশি নার্স, কর্মকর্তা-কর্মচারী ও অন্যান্য সহায়ক জনবলেও রয়েছে ঘাটতি।



-6ada09d9dd998.jpg)