শনিবার, ২৪ অক্টোবর, ২০২৬
৯ই কার্তিক, ১৪৩৩

ডেইলি বরিশাল

দক্ষিণাঞ্চলের শীর্ষস্থানীয় ও বস্তুনিষ্ঠ দৈনিক পত্রিকা

রাজনীতি

এনসিপি নিতে চায়, তাসনিম জারা-জাবিনসহ পদত্যাগী নেতারা কি ফিরবেন?

এনসিপি নিতে চায়, তাসনিম জারা-জাবিনসহ পদত্যাগী নেতারা কি ফিরবেন?...

ন
নাজমুল ইসলাম· বিশ্লেষক
প্রকাশ: ২৪ অক্টোবর ২০২৬, ৮:৫৭ পিএমসর্বশেষ: ২৪ অক্টোবর ২০২৬, ৮:৫৭ পিএম
এনসিপি নিতে চায়, তাসনিম জারা-জাবিনসহ পদত্যাগী নেতারা কি ফিরবেন?

তরুণদের সংগঠন জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) আরও শক্তি সঞ্চয় করতে চায়। ঢাকা থেকে তৃণমূল পর্যন্ত সংগঠন ঢেলে সাজাতে চায় তারা। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের অগ্রসেনানী, প্রতিশ্রুতিশীল, ক্লিন ইমেজধারী ও প্রতিভাবানদের সামনে রাখতে চায়। এই প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে কেন্দ্র থেকেই। সম্প্রতি কেন্দ্রীয় কমিটিতে পরিবর্তন এনেছে এনসিপি। মূলত আসন্ন সিটি নির্বাচন ও স্থানীয় নির্বাচনে এককভাবে লড়তে চায় এনসিপি। সে কারণে সংগঠন শক্তিশালী করতে নানা উদ্যোগ নিচ্ছে তারা।

এনসিপি চাইছে দলছুট নেতাদের দলে ফেরাতে। আরও শক্তিশালী রূপে রাজপথে দৃঢ় অবস্থান নিয়ে সরকারের নেতিবাচক কর্মকাণ্ডের কড়া জবাব দিতে। এজন্য যারা অভিমান করে দূরে সরে আছে তাদের যথাযথ মর্যাদা দিয়ে দলে ফেরাতে চায়।

ত্রয়োদেশ জাতীয় নির্বাচনের আগে এনসিপিতে ভাঙন দেখা দেয়। তরুণ মেধাবী ও প্রতিশ্রুতিশীল কিছু নেতা বেরিয়ে যান। দলটির প্রতিষ্ঠাকালীন জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সদস্য সচিব ডা. তাসনিম জারা, যুগ্ম আহ্বায়ক খালেদ সাইফুল্লাহ ও যুগ্ম আহ্বায়ক তাজনূভা জাবিনসহ সারাদেশের বিভিন্ন স্তরের নেতাকর্মীরা এনসিপি থেকে পদত্যাগ করে দূরে সরে যান।তখন সামান্তা শারমিনসহ আরও কয়েকজন শীর্ষ নেতার দল থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়। তবে শেষ পর্যন্ত তারা দল ছাড়েননি। নির্বাচনের পর থেকেই পদত্যাগীদের দলে ফেরানোর চেষ্টা করে আসছে এনসিপি। সম্প্রতি এনসিপি বেশ কিছু নেতার বক্তব্যে তাদের দলে ফেরানোর বিষয়ে আগ্রহ শোনা যায়।

মূলত ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের আগে জামায়াতের সঙ্গে জোট গঠন করা নিয়ে দ্বিমত তৈরি হয় এনসিপির নেতাদের মধ্যে। স্বাধীনতা যুদ্ধে জামায়াতের ভূমিকা এবং পরবর্তীতে সেই ঘটনায় জামায়াতের ক্ষমা না চাওয়ার ঘটনায় এনসিপির অনেক নেতাই চাননি ইসলামপন্থি দলটির সঙ্গে তাদের জোট হোক। কিন্তু শেষ পর্যন্ত জামায়াতের সঙ্গে জোট করে ভোটে অংশ নেয় নাদিহ-আখতার-হাসনাতরা। এই নির্বাচনে এনসিপি ৬ টি আসনে জয়ী হয়।

এনসিপি ছেড়ে দেওয়া ক্লিন ইমেজধারী তাসনিম জারা ঢাকার একটি একটি আসন থেকে স্বতন্ত্র নির্বাচন করেন। তবে তিনি পাশ করতে পারেননি। অপর দুই যুগ্ম আহ্বায়ক খালেদ সাইফুল্লাহ ও তাজনূভা জারিন ভোটে অংশ নেননি।

তাজনূভা জারিন নতুন রাজনৈতিক প্লাটফর্ম অল্টারনেটিভস গঠন করেন। অদ্যাবধি তিনি সেখানে সংগঠক হিসেবে কাজ করছেন। এই সংগঠনে সাবেক উপদেষ্টা মাহফুজও রয়েছেন।

খালেদ সাইফুল্লাহ ও তাসনিম জারা কোনো দলে যোগ দেননি কিংবা কোনো সংগঠন করেননি। তবে জারা বিভিন্ন সময়ে কিছু সামাজিক কর্মকাণ্ডে নিজেকে ব্যস্ত রাখছেন।

তৃণমূল শক্তিশালী করার লক্ষ্যে সম্প্রতি জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক কমিটিতে রদবদল আনা হয়েছে। ২১৭ সদস্যের কমিটি ছোট করে ১৯৬ সদস্যে নামিয়ে আনা হয়েছে। আহ্বায়ক পদে নাহিদ ইসলাম এবং সদস্য সচিব পদে আখতার হোসেন বহাল থাকলেও বিলুপ্ত করা হয়েছে মুখ্য সংগঠক, মুখ্য সমন্বয়ক ও মুখপাত্রের মতো পদ। এর পরিবর্তে সৃষ্টি করা হয়েছে সাংগঠনিক সম্পাদকসহ বিভিন্ন সম্পাদকীয় পদ।

পুনর্গঠিত কমিটিতে কয়েকজন নেতার পদোন্নতি হয়েছে, আবার কয়েকজনের পদাবনতি ঘটেছে। বাদ পড়েছেন আগের কমিটির কয়েকজন নেতা।

জুলাই অভ্যুত্থানে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখা সামান্তা শারমিন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপির) প্রথম সারির নেতা। তিনি এনসিপির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক হিসেবে এতদিন দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন। তবে এনসিপি ঘোষিত নতুন কমিটিতে তাকে শুধু যুগ্ম আহ্বায়ক পদে রাখা হয়েছে। এনসিপির এই নেত্রীর পদাবনতি হয়েছে। তাকে দলের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম রাজনৈতিক পরিষদ থেকেও বাদ দেওয়া হয়েছে। রাজনৈতিক মহলে আলোচনা আছে, জামায়াতের সঙ্গে জোট নিয়ে দলের সঙ্গে তার এখনও দূরত্ব রয়ে গেছে।

জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নতুন কমিটিতে আরিফুল ইসলাম আদীবেরও পদাবনতি হয়েছে। আগের কমিটিতে সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়কের দায়িত্বে থাকলেও পুনর্গঠিত কমিটিতে তাকে যুগ্ম আহ্বায়ক করা হয়েছে। তবে দলের রাজনৈতিক পরিষদে তার অবস্থান বহাল রয়েছে।

এছাড়া জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আগের কমিটিতে জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সদস্য সচিব পদে ছিলেন নাহিদা সারোয়ার নিভা। নতুন কমিটিতে তাকে যুগ্ম সদস্য সচিব পদে রাখা হয়েছে।

এসব পদাবনতির সুনির্দিষ্ট কারণ জানায়নি এনসিপি। তবে একটি সূত্র বলছে—নেতাদের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পারফরমেন্স, কিছু পদ বিলুপ্ত হওয়ায় প্রভাবশালীদের শীর্ষস্থানে রাখতে এসব সমন্বয় আনা হয়েছে। বিশেষ করে মুখ্য সংগঠক, মুখ্য সমন্বয়ক ও মুখপাত্রের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে আগে কয়েকজন প্রভাবশালী নেতা ছিলেন। কিন্তু এই পদ বিলুপ্ত করায় তাদের একোমোডেশনের স্বার্থে অন্যদের পদাবনতি দেওয়া হয়েছে।

এ বিষয়ে আরিফুল ইসলাম আদিবের বক্তব্য জানতে ফোন করা হলে তিনি সাংবাদিকদের জানান, এটা আসলে পদাবনতি না। আগে আমাদের সাংগঠনিক কাঠামো একরকম ছিল।সেখানে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের নায়কদের মুখ্য সংগঠক, মুখ্য সমন্বয়ক নানা ফরমেটে দায়িত্ব পালন করেছেন। এখন এনসিপি ওইসব পদ বিলুপ্তির সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তাই তাদেরকে (হাসনাত, পাটওয়ারী, সারজিস) সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক ও সিনিয়র সদস্য সচিব পদ দেওয়া হয়েছে।

আদীব বলেন, সাংগঠনিক কাঠামোতে আমি আগেও ৮ নম্বরে ছিলাম। এখনও ৮ নম্বরে আছি।

এদিকে পদত্যাগী নেতাদের এনসিপিতে ফেরাতে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে সংগঠনটির পক্ষ থেকে।এনসিপির একাধিক নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তারা চাইছেন জারা, খালেদ, জাবিনরা এনসিপিতে ফিরে আসুক।

দল থেকে যারা চলে গেছেন তাদের ফিরিয়ে আনা প্রসঙ্গে এর আগে যুগ্ম আহ্বায়ক মনিরা শারমিন বলেছিলেন, যারা চলে গেছেন, তাদের কারও পদত্যাগপত্র গ্রহণ করা হয়নি। আমরা একসঙ্গে আন্দোলন করেছি, একসঙ্গে হেঁটেছি-সংগ্রাম করেছি। আমাদের দরজা খোলা, যারা চলে গেছেন-তাদের কী করে ফিরিয়ে আনা যায় এবং আগামী দিনে দল আরও শক্তিশালী কীভাবে করা যায়, এ বিষয়ে আলোচনা হবে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দলের এক শীর্ষ নেতা বলেন, আমরা এখন দলকে আরও শক্তিশালী করছি। যারা চলে গেছেন, তারাও আসবেন। নতুন করে দলে আরও নেতাকর্মী যুক্ত হবে। নির্বাচনে আমরা সাধারণ মানুষের যে অংশগ্রহণ পেয়েছি, তাদের নিয়ে দল আরও এগিয়ে যাবে, শক্তি অর্জন করবে। ইতোমধ্যে দলের শীর্ষ নেতারা সাফ জানিয়েছেন, দলকে আরও এগিয়ে নিতে যা যা করণীয় তা করা হবে। ত্রয়োদশ নির্বাচনে এনসিপির প্রার্থীদের অনেকেই বিপাকে পড়েছিলেন তৃণমূলে যথাযথ সংগঠন না থাকায়। এখন তৃণমূলে সংগঠন দাঁড় করাতে সব ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বিশেষ করে সিটি ও উপজেলা নির্বাচনে এনসিপি এককভাবে প্রার্থী দিতে চায়। সেজন্য সংগঠন শক্তিশালী করতে চায় তারা।

পদত্যাগীদের দলে ফেরানোর উদ্যোগ নিয়ে জানতে চাইলে আরিফুল ইসলাম আদীব বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে যারা ছিলেন তাদের প্রত্যেকের জন্য এনসিপির দরজা খোলা রয়েছে। আমরা চাই তাদের নিয়ে সংগঠন আরও শক্তিশালী হতে। পদত্যাগীদের দলে ফেরার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, সামাজিক বিভিন্ন অনুষ্ঠানে আলোচনায় তাদেরকে ফিরে আসার কথা বলা হয়েছে।

পদত্যাগীদের এনসিপি ছাড়ার মূল কারণ ছিল জামায়াতের সঙ্গে নির্বাচনি ঐক্য। তারা মনে করেন, যে স্বপ্ন নিয়ে তরুণরা জুলাই অভ্যুত্থান করেছিল সেই নতুন বন্দোবস্ত থেকে এনসিপি সরে গেছে। বিশেষত স্বাধীনতাবিরোধী জামায়াতকে সাধারণ মানুষ ভালোভাবে নিচ্ছে না।এনসিপি জামায়াতের সঙ্গে ঐক্য করে মূলত ইসলামপন্থি দলে পরিণত হচ্ছে। এতে অদূর ভবিষ্যতে এনসিপির জামায়াতে বিলিন হওয়ার শঙ্কা রয়েছে।

এনসিপিতে ফিরবেন কিনা এমন প্রশ্নে তাজনূভা জাবিন সাংবাদিকদের বলেন, আমি তো একটা প্লাটফর্মে আছিই। অলটারনেটিভস। শিগগিরই বড় আকারে আমরা সাংগঠনিক শক্তি প্রকাশ করবো। অলটারনেটিভকে আমরা নিজ পায়ে দাঁড় করাতে চাই না। এনসিপিতে ফিরে আসতে চাই না।

তিনি বলেন, সংগঠন দাঁড় করানো কঠিন। তবে অসাধ্য নয়। আমরা অলটারনেটিভস নিয়ে সেই চেষ্টাটাই করে যাচ্ছি।

এনসিপির সঙ্গে দূরত্বের কারণ নিয়ে তিনি বলেন, যে স্বপ্ন নিয়ে জুলাই গণঅভ্যুত্থান হয়েছিল, তরুণরা যে নতুন বন্দোবস্ত দেখতে চেয়েছিল সেটি তো আর হয়ে উঠল না। নতুন রাজনৈতিক বিকাশ এনসিপিকে দিয়ে সম্ভব না। এ কারণেই তো আমরা বেরিয়ে গেলাম। তিনি বলেন, জামায়াত নিয়ে এনসিপি জুলাই স্বপ্ন কিভাবে পূরণ করবে।

তাসনিম জারার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায়নি।

📢এই সংবাদটি শেয়ার করুন

📢 আপনিও হোন পাঠক সাংবাদিক!

আপনার এলাকার যেকোনো খবর, সমস্যা বা ভিডিও সরাসরি আমাদের নিউজ পোর্টালে জমা দিন

সংবাদ পাঠান ↗
ন

নাজমুল ইসলাম

বিশ্লেষক

রাজনৈতিক রিপোর্টার, বিশ্লেষক ও কলামিস্ট।

সম্পর্কিত আরও সংবাদ