সার সংকট নিরসনে সারা দেশে নতুন করে সরকারের বিসিআইসির সার ডিলার নিয়োগ তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছে। সরকারের মহৎ উদ্যোগ দলের নেতাকর্মীদের অপকর্মে ম্লান হয়ে গেছে। ডিলার নিয়োগে মানা হয়নি নীতিমালাও। দলের নেতার স্ত্রী, অনার্সপড়ুয়া মেয়ে, ছেলে, শ্বশুর, ফুফাতো ভাই, ভাতিজা, শ্যালক, স্বজনের নামে সারের ডিলার নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। শুধু তাই নয়, দলীয় অফিসকে সার ডিলারের গোডাউন দেখানোর রেকর্ড রয়েছে। এই ভয়াবহ অনিয়ম ও স্বজনপ্রীতি হয়েছে রংপুরের আট উপজেলায়।
এসব ঘটনায় গত রোববার রংপুর ডিসি সম্মেলনকক্ষে জেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির মাসিক সভায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন রংপুর-১ আসনের এমপি রায়হান সিরাজী। তিনি বলেছেন, ডিলার নিয়োগে নীতিমালা উপেক্ষা করে ‘বানরের পিঠা ভাগের মতো’ বণ্টন করা হয়েছে। এটি দলীয়করণের লজ্জাজনক উদাহরণ। এক অনুসন্ধানে এসব অনিয়মের চিত্র ওঠে এসেছে। এসব কারণে সার সংকট নিরসনের এ উদ্যোগ ভেস্তে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে।
রংপুরের পীরগঞ্জ উপজেলায় যাদের সারের ডিলার নিয়োগ দেয়া হয়েছে তাদের মধ্যে, উপজেলা বিএনপি সভাপতির স্ত্রী, উপজেলা যুবদলের সভাপতি, ইউনিয়ন বিএনপি সভাপতি ও ওয়ার্ড বিএনপি সভাপতিরা রয়েছেন। পীরগঞ্জের ১ নম্বর চৈত্রকোল ইউনিয়নে ডিলার নিয়োগ পেয়েছে মেসার্স রাজিব ট্রেডার্স, ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি রাজিবুল হাসান, ২ নম্বর ভেন্ডাবাড়ী ইউনিয়নের বিএনপি সভাপতির চাচাত ভাই তৌহিদুল ইসলাম, ৩ নম্বর বড়দরগা ইউনিয়নের বিএনপির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সভাপতি আবুল কালাম আজাদ, ৪ নম্বর কুমেদপুর ইউনিয়নে বিএনপির সভাপতি মোশাররফ হোসেন, ৫ নম্বর মদনখালি ইউনিয়নে পেয়েছেন রংপুর জেলা পরিষদের প্রশাসক ও জেলা বিএনপির আহ্বায়ক মো. সাইফুল ইসলামের ভাতিজা মাজহারুল আনোয়ার এবং ৬ নম্বর ইউনিয়নে পেয়েছেন জেলা পরিষদের প্রশাসক ও জেলা বিএনপির আহ্বায়ক মো. সাইফুল ইসলামের বোন জামাই মো. নুরুজ্জামান, ৭ নম্বর বড় আলমপুর ইউনিয়নে ১ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি মো. বাদশা মিয়া, ৮ নম্বর রায়পুর ইউনিয়নে পীরগঞ্জ উপজেলা বিএনপির সভাপতি মাহমুদুন্নবী চৌধুরী পলাশের স্ত্রী মোছা. ফাহিমা আক্তার খানম, ৯ নম্বর পীরগঞ্জ সদর ইউনিয়নের বিএনপি সভাপতি মামুনুর রশিদ বাদলের স্ত্রী মোছা. শাহানা খানম, ১০ নম্বর শানেরহাট ইউনিয়নে পেয়েছেন ৪ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি নুর মোহাম্মদ খান, ১১ নম্বর পাঁচগাছি ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি মো. ইকরামুল হক, ১৩ নম্বর রামনাথপুর ইউনিয়নে পীরগঞ্জ উপজেলা যুবদলের সভাপতি মো. আনিছুর রহমান, ১৪ নম্বর চতরা ইউনিয়নে ৭ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি নুর মোহাম্মদ মণ্ডল, ১৫ নম্বর কাবিলপুর ইউনিয়নের বিএনপির সাবেক সভাপতি মাসুদুর রহমান, মেসার্স দিগন্ত ট্রেডার্স, প্রো. মোছা. দৌলতুন নাহার, তিনি মিঠিপুর ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক রায়হান প্রধানের স্ত্রী। পৌরসভা বিএনপির সভাপতি সাইফুল আজাদ মণ্ডল সারের ডিলার নিয়োগ নিয়েছেন তার স্ত্রী লাকি বেগমের নামে, অলিন ট্রেডার্সের নাম দিয়ে।
উপজেলা বিএনপি অফিস সারের গোডাউন হিসাবে দেখিয়েছেন পাঁচগাছী ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি একরামুল হক মেসার্স আজমল ট্রেডার্সের নামে।
পীরগাছা উপজেলায় একই চিত্র পাওয়া গেছে, ৯টি ইউনিয়নের ৯ জনের তালিকায় বিএনপির সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক ও সাংগঠনিক সম্পাদকসহ তাদের স্ত্রী, অনার্সপড়ুয়া মেয়ে, ছেলে, শ্বশুর, ফুফাতো ভাইসহ স্বজনদের নাম রয়েছে। এর মধ্যে উপজেলা বিএনপির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের স্ত্রী, একজন ইউনিয়ন সভাপতির অনার্সপড়ুয়া মেয়ে, একজন ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদকের শ্বশুর, সিনিয়র সহসভাপতির ছেলে, একজন সাধারণ সম্পাদকের ফুফাতো ভাইয়ের নামসহ দলের নেতাকর্মীদের নাম রয়েছে। তালিকায় স্থান পেয়েছে পীরগাছা সদর ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের অনন্তরাম গ্রামের মোছা. সুলতানা ফেরদৌসির নাম। তিনি উপজেলা বিএনপির সভাপতি আমিনুল ইসলাম রাঙ্গার স্ত্রী। রয়েছে অন্নদানগর ইউনিয়ন জগজীবনের জয়িতা আক্তার জিনি। তিনি ওই ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি জিল্লুর রহমানের প্রথম স্ত্রীর মেয়ে এবং দিনাজপুর সরকারি কলেজের বাংলা চতুর্থ বর্ষের অনার্সের শিক্ষার্থী।
মিঠাপুকুরে খোড়াগাছ ইউনিয়নের ডিলারশিপ পেয়েছেন ওই ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি আইয়ুব আলী, ভাংনীতে পেয়েছেন ইউনিয়ন সভাপতি মাহবুব আলম, কাফ্রিখালে পেয়েছেন ইউনিয়ন সভাপতি মোকলেছার রহমান, বালুয়া মাসিমপুরে পেয়েছেন ৬নং ওয়ার্ড বিএনপি সভাপতি মোজাফফর হোসেন, বড়বালায় পেয়েছেন ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি বাবুল ইসলামের ছেলে মোস্তাফিজর রহমান, মিলনপুরে পেয়েছেন ইউনিয়ন বিএনপির সম্পাদক রবিউল ইসলাম, গোপালপুরে পেয়েছেন উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মোতাহারুল ইসলাম নিক্সন পাইকারের স্ত্রী রেহেনা পারভীন, দুর্গাপুরে পেয়েছেন উপজেলা বিএনপির সভাপতি গোলাম রব্বানী ভাই আল আমিন সরকার, বড় হযরতপুরে পেয়েছেন উপজেলা বিএনপির সভাপতি গোলাম রব্বানীর খালাতো ভাই মিরাজ আহমেদ, মির্জাপুরে পেয়েছেন ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি আব্দুল হামিদ মিয়া ও ইমাদপুরে পেয়েছেন ইউনিয়ন বিএনপির সম্পাদক আব্দুল হান্নান মিয়া।
এ প্রসঙ্গে জেলা বিএনপির সভাপতি ও জেলা পরিষদের প্রশাসক সাইফুল ইসলাম বলেছেন, এর সঙ্গে সরকারের কর্মকর্তারা জড়িত। তারাই বলতে পারবেন কে ডিলারশিপ পেয়েছে।
এই কমিটির সভাপতি রংপুর জেলা প্রশাসক ইসরাত জাহান বলেন, সার ডিলার নিয়োগ প্রক্রিয়াটি সম্পূর্র্ণ কৃষি মন্ত্রণালয় করেছে। আমাদের কাছে প্রতিটি ইউনিয়নের জন্য প্রস্তাবিত তিনটি নামের তালিকা নীতিমালার যোগ্যতার ভিত্তিতে কৃষি মন্ত্রণালয় চেয়েছিল, তা উপজেলা বাছাই কমিটি সম্পন্ন করেছে। আমরা শুধু সেই তালিকা ঢাকায় পাঠিয়েছি, সেখান থেকে চূড়ান্ত তালিকা করে সার ডিলার নিয়োগ দেয়া হয়েছে।



