বাংলাদেশে গত সাত বছরে মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা বেড়েছে, কিন্তু এসব প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।
এদিকে, পড়াশোনার খরচ তুলনামূলক কম হলেও সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়েও শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমেছে। বিপরীতে, নিবন্ধিত আলিয়া মাদ্রাসায় শিক্ষার্থী বেড়েছে।
বাংলাদেশ শিক্ষাতথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর (ব্যানবেইস) সর্বশেষ প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৮ সালে সরকারি ও বেসরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণিতে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল ৮৮ লাখ ৫৭ হাজার। ২০২৫ সালে তা কমে দাঁড়িয়েছে ৭০ লাখ ৭৪ হাজারে। অর্থাৎ সাত বছরে শিক্ষার্থী কমেছে প্রায় ১৭ লাখ ৮৩ হাজার বা ২০ দশমিক ১ শতাংশ।
শিক্ষার্থী কমলেও একই সময়ে সাধারণ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা বেড়েছে। ২০১৮ সালে এসব প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ছিল ১৬ হাজার ১৮৬টি, যা ২০২৫ সালে দাঁড়ায় ১৬ হাজার ৭৩৭টিতে।
মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) মহাপরিচালক অধ্যাপক খান মইনুদ্দীন আল মাহমুদ সোহেল সাংবাদিকদের বলেন, মাধ্যমিক পর্যায়ে শিক্ষার্থী কমে যাওয়ার বিষয়টি সতর্কতার সঙ্গে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
তার ভাষ্য, ‘কোভিড-১৯-এর প্রভাব, পরবর্তী সময়ে পরিবারের আর্থিক সংকট, শিশুশ্রম বৃদ্ধি এবং শিক্ষার্থীদের অন্য ধরনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে চলে যাওয়ার মতো সম্ভাব্য কারণগুলো আমরা খতিয়ে দেখব।
শিক্ষাবিদেরা মনে করেন, এ পরিস্থিতির পেছনে আরও কয়েকটি কারণ থাকতে পারে। বাল্যবিবাহ ও মেয়েদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের পাশাপাশি সাধারণ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের পরিবর্তে মাদ্রাসা বা ইংরেজি মাধ্যমের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বেছে নেওয়ার প্রবণতাও শিক্ষার্থী কমার কারণ হতে পারে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক সিদ্দিকুর রহমান বলেন, বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমে যাওয়া শিক্ষা খাতে পরিকল্পনার ঘাটতির ইঙ্গিত দেয়।
তিনি বলেন, ‘আমরা জানি না, আসলে কতটি বিদ্যালয় প্রয়োজন, ভবিষ্যতে কতজন শিক্ষার্থী থাকবে, কী ধরনের বিদ্যালয় ও কলেজ দরকার, কিংবা উচ্চশিক্ষার চাহিদা কেমন।
বাংলাদেশের মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রায় ৯৭ শতাংশই বেসরকারি। তবে বিশেষ করে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে সরকারি বিদ্যালয়গুলো এখনো বেশ জনপ্রিয়। তা সত্ত্বেও এসব প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থী কমছে।
সাধারণ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ছেলে ও মেয়ে উভয় শিক্ষার্থীর সংখ্যাই কমেছে। তবে সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ছেলেদের ক্ষেত্রে এই পতন তুলনামূলক বেশি।
২০১৮ সালে সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ছেলেশিক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল ৩ লাখ ২১ হাজার। ২০২৫ সালে তা কমে দাঁড়ায় ২ লাখ ৩৩ হাজারে। অর্থাৎ সাত বছরে ছেলেশিক্ষার্থী কমেছে ৮৭ হাজার ৮২৪ জন বা ২৭ দশমিক ৪ শতাংশ।
পতনের হার কম হলেও মেয়েদের ক্ষেত্রেও একই প্রবণতা দেখা গেছে। সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে মেয়েশিক্ষার্থীর সংখ্যা ২০১৮ সালের ২ লাখ ৬৪ হাজার থেকে কমে ২০২৫ সালে ২ লাখ ২৫ হাজারে দাঁড়িয়েছে। এ সময়ে কমেছে ৩৯ হাজার ১৮ জন বা ১৪ দশমিক ৮ শতাংশ।
শিক্ষাবিদেরা বলছেন, সরকারি বিদ্যালয়ে বেতন ও ফি নামমাত্র হলেও পড়াশোনার পেছনে পরিবারগুলোকে বাড়তি অর্থ ব্যয় করতে হয়। কোচিং, গাইডবই, যাতায়াত ও শিক্ষা উপকরণের খরচ অনেক পরিবারের জন্য বড় চাপ হয়ে দাঁড়ায়।
গণসাক্ষরতা অভিযানের (ক্যাম্পে) নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে চৌধুরী বলেন, শিক্ষায় সরকারি ও সামাজিক বিনিয়োগ প্রত্যাশিত ফল দিচ্ছে না।
তিনি বলেন, ‘এর অর্থ হলো, শিক্ষা বিনা মূল্যে দিলেই সবাই বিদ্যালয়ে যাবে, তা নিশ্চিত হয় না। অনেকের মধ্যেই এমন ধারণা তৈরি হয়েছে যে সরকারি বিদ্যালয়ে মানসম্মত শিক্ষা দেওয়া হয় না।
সাধারণ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী কমলেও নিবন্ধিত আলিয়া মাদ্রাসায় তাদের সংখ্যা বেড়েছে। ব্যানবেইসের তথ্য অনুযায়ী, এসব প্রতিষ্ঠানে ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণিতে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ২০১৮ সালের ৩ লাখ ৬২ হাজার থেকে বেড়ে ২০২৫ সালে ৩ লাখ ৯৮ হাজার হয়েছে। সাত বছরে বেড়েছে ৩৬ হাজার ৬৬০ জন বা ১০ দশমিক ১ শতাংশ।
ইংরেজি মাধ্যমের বিদ্যালয়েও শিক্ষার্থী বেড়েছে। ২০১৮ সালে এসব প্রতিষ্ঠানে ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণিতে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল ২২ হাজার ৫৫৪। ২০২৫ সালে তা দাঁড়ায় ২৪ হাজার ৫৩০-এ, যা ৮ দশমিক ৮ শতাংশ বৃদ্ধি।
তবে শিক্ষা কর্মকর্তারা বলছেন, ইংরেজি মাধ্যমের শিক্ষার্থীর চিত্র এই পরিসংখ্যানে পুরো উঠে আসে না। কারণ, অনেক ইংরেজি মাধ্যমের বিদ্যালয় এখনো তথ্য সংগ্রহ ও প্রতিবেদন ব্যবস্থার বাইরে রয়েছে।
সাধারণ মাধ্যমিক বিদ্যালয় ছেড়ে যাওয়া শিক্ষার্থীরা কোথায় যাচ্ছে, সে বিষয়ে অবশ্য নির্ভরযোগ্য সরকারি তথ্য নেই। তারা আলিয়া বা কওমি মাদ্রাসা, ইংরেজি মাধ্যমের বিদ্যালয় কিংবা কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি হচ্ছে, নাকি পড়াশোনা ছেড়ে কর্মজীবনে প্রবেশ করছে, তা অনুসরণের কোনো সরকারি ব্যবস্থা ব্যানবেইসের নেই।
ব্যানবেইসের এক কর্মকর্তা জানান, কওমি মাদ্রাসা সরকারি নিয়ন্ত্রণের বাইরে পরিচালিত হওয়ায় এসব প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের বিষয়ে সংস্থাটির কাছে সরকারি পরিসংখ্যান নেই।
গত ১৪ জুলাই সংসদে শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহসানুল হক মিলন জানিয়েছিলেন, দেশে প্রায় ২৫ হাজার কওমি মাদ্রাসা রয়েছে, যেখানে শিক্ষার্থী প্রায় ৭০ লাখ।
ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক মনজুর আহমেদ বলেন, সাধারণ বিদ্যালয়ে পড়াশোনার খরচের বড় একটি অংশ জুড়ে রয়েছে ব্যক্তিগত কোচিং ও বাণিজ্যিক গাইডবই। এসব ব্যয় বহন করতে না পেরে অনেক পরিবার সন্তানদের তুলনামূলক কম খরচের জন্য মাদ্রাসায় পাঠায়।
সাধারণ বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী কমার সম্ভাব্য কারণ হিসেবে মাদ্রাসার বিস্তার ও ইংরেজি মাধ্যমের শিক্ষার প্রতি বাড়তি আকর্ষণের কথাও উল্লেখ করেন অধ্যাপক সিদ্দিকুর রহমান।
তিনি বলেন, মধ্যবিত্ত পরিবারের কিছু অভিভাবক সরকারি বিদ্যালয়ের তুলনায় বেসরকারি বিদ্যালয়কে ভালো মনে করেন। একইভাবে, ইংরেজি মাধ্যমের বিদ্যালয়কেও অনেকে ভালো বিকল্প হিসেবে বিবেচনা করেন।
'প্রাথমিক বা ইবতেদায়ি পর্যায় থেকেই অনেক পরিবার সন্তানদের মাদ্রাসায় পাঠাতে আগ্রহী। ধর্মের প্রতি মানুষের অনুরাগও মাদ্রাসায় শিক্ষার্থী বাড়ার একটি কারণ। কিছু শিক্ষার্থী কওমি মাদ্রাসায় চলে যেতে পারে। অনেকের ধারণা, আলিয়া মাদ্রাসার তুলনায় কওমি মাদ্রাসায় ধর্মীয় শিক্ষার ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়', বলেন তিনি।
রাশেদা কে চৌধুরী বলেন, মূলধারার মাদ্রাসা হিসেবে পরিচিত আলিয়া মাদ্রাসায় শিক্ষার্থীর সংখ্যা স্থিতিশীল রয়েছে। তিনি বলেন, ‘মাদ্রাসা নিয়ে নানা ধরনের সমালোচনা থাকলেও আলিয়া মাদ্রাসার ওপর মানুষের আস্থা এখনো রয়েছে।
মাউশির মহাপরিচালক আল মাহমুদ সোহেল বলেন, মাদ্রাসায় শিক্ষার্থী বেড়ে যাওয়া মূল উদ্বেগের বিষয় নয়। বরং সাধারণ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী কেন কমছে, তা খুঁজে বের করাই এখন অগ্রাধিকার।
তিনি বলেন, ‘কেন এমন হচ্ছে, তা আমরা খতিয়ে দেখব এবং শিক্ষার্থী ভর্তি বাড়ানো ও তাদের বিদ্যালয়ে ধরে রাখার উপায় বের করার চেষ্টা করব।
মাধ্যমিক পর্যায়ে শিক্ষার্থী বাড়াতে সরকার বৃত্তিমূলক ও কর্মসংস্থানমুখী শিক্ষার প্রসারেও কাজ করবে বলে জানান তিনি।
সাধারণ মাধ্যমিক বিদ্যালয় ছেড়ে যাওয়া সব শিক্ষার্থী যে অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হচ্ছে, তা নয়। তাদের একটি অংশ হয়তো পড়াশোনাই ছেড়ে দিচ্ছে।
শিক্ষাবিদদের মতে, পরিবারের আর্থিক সংকট, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং আয়ের প্রয়োজন মেটানোর তাগিদে অনেক শিশু বিদ্যালয় ছেড়ে কাজে যোগ দিতে বাধ্য হচ্ছে।
অধ্যাপক সিদ্দিকুর রহমান বলেন, ‘পরিবার দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে গেলে শিশুশ্রম বাড়তে থাকে। এখন অনেক পরিবারের পক্ষে একজনের আয়ে টিকে থাকা কঠিন।
পরিসংখ্যানেও শিশুশ্রম বৃদ্ধির ইঙ্গিত রয়েছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) ও ইউনিসেফের মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভের (মিকস) তথ্য অনুযায়ী, ৫ থেকে ১৭ বছর বয়সী শিশুদের মধ্যে শ্রমে নিয়োজিত থাকার হার ২০১৯ সালের ৬ দশমিক ৮ শতাংশ থেকে বেড়ে ২০২৫ সালে ৯ দশমিক ২ শতাংশ হয়েছে। অর্থাৎ এই হার বেড়েছে ২ দশমিক ৪ শতাংশ পয়েন্ট।
শিক্ষাবিদেরা বলছেন, মেয়েদের পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার পথেও রয়েছে বাড়তি বাধা। বাল্যবিবাহ ও ঘরের কাজের দায়িত্বের পাশাপাশি বিদ্যালয়ে যাতায়াতের দীর্ঘ পথ নিয়ে নিরাপত্তার উদ্বেগও তাদের শিক্ষাজীবন ব্যাহত করতে পারে।
রাশেদা কে চৌধুরী বলেন, মাধ্যমিক পর্যায়ে শিশুশ্রম ও বাল্যবিবাহ দীর্ঘদিনের সমস্যা।
অধ্যাপক মনজুর আহমেদের মতে, কিছু পরিবারের জন্য সন্তানদের কম খরচের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাঠানো একটি বিকল্প হতে পারে। তবে অন্য অনেক পরিবারের কাছে শিক্ষার ব্যয় বহন করাই কঠিন হয়ে উঠছে।
পরিবারের ওপর এই আর্থিক চাপের চিত্র উঠে এসেছে বিভিন্ন গবেষণাতেও। ইউনেস্কোর ২০২২ সালের বৈশ্বিক শিক্ষা পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশে শিক্ষার মোট ব্যয়ের ৭১ শতাংশ বহন করে পরিবারগুলো।
এ ছাড়া ক্যাম্পের এডুকেশন ওয়াচের গবেষণায় দেখা গেছে, ২০২২ সালের তুলনায় ২০২৩ সালে প্রাথমিক পর্যায়ে শিক্ষার পেছনে পরিবারের নিজস্ব ব্যয় ২৫ শতাংশ এবং মাধ্যমিক পর্যায়ে ৫১ শতাংশ বেড়েছে।



