স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণের পর অগ্রাধিকারমূলক বাজার সুবিধা বজায় রাখতে মালয়েশিয়ার সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) সইয়ের জন্য আনুষ্ঠানিক আলোচনা শুরু করেছে বাংলাদেশ।
আজ মঙ্গলবার রাজধানীর একটি হোটেলে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব খাদিজা নাজনীনের নেতৃত্বে এ আলোচনা শুরু হয়। আলোচনায় অংশ নিচ্ছে মালয়েশিয়ার ৩০ সদস্যের প্রতিনিধিদল।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা সাংবাদিকদের জানান, প্রথম দফা আলোচনার মূল লক্ষ্য আগামী বছরের মধ্যে চুক্তি সইয়ের দিকে এগিয়ে যাওয়া।
এলডিসি উত্তরণের পর বাংলাদেশ বর্তমানে যেসব বাণিজ্যিক সুবিধা পেয়ে আসছে তার কিছু বাতিল হবে। বিষয়টি মাথায় রেখে সম্ভাব্য বাণিজ্য অংশীদারদের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি সম্প্রসারণের যে উদ্যোগ বাংলাদেশ নিয়েছে, প্রস্তাবিত এফটিএ তারই একটি অংশ।
এলডিসি উত্তরণের পর অগ্রাধিকারমূলক বাজার সুবিধা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ চলতি বছর জাপানের সঙ্গে অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (ইপিএ) এবং দক্ষিণ কোরিয়ার সাথে একটি সমন্বিত অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (সিইপিএ) সই করেছে।
কিন্তু, দেশ দুটির পার্লামেন্টে অনুমোদনের প্রয়োজন থাকায় দুটি চুক্তির একটিও এখনো কার্যকর হয়নি।
বাংলাদেশ ২০২০ সালের ডিসেম্বরে ভুটানের সঙ্গেও একটি অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য চুক্তি (পিটিএ) সই করে। এর অধীনে ভুটানের ৩৪টি পণ্য এবং বাংলাদেশের ১০০টি পণ্য শুল্কমুক্ত সুবিধা পাচ্ছে। চুক্তিটি বর্তমানে কার্যকর আছে।
এফটিএ আলোচনার উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে বাংলাদেশ মালয়েশিয়া চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (বিএমসিসিআই) সভাপতি মো. আনোয়ার শহীদ বলেন, অগ্রাধিকারমূলক বাজার সুবিধা হারানোর চাপ সামলাতে বাংলাদেশের উচিত সম্ভাব্য বাণিজ্য অংশীদারদের সঙ্গে এফটিএ সইয়ের চেষ্টা চালিয়ে যাওয়া।
তিনি বলেন, মালয়েশিয়ার সঙ্গে এফটিএ হলে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) শুল্ক আয় কিছুটা কমতে পারে। কিন্তু এমন বাণিজ্য চুক্তির সম্ভাব্য সুদূরপ্রসারী সুফলগুলোকে উপেক্ষা করা ঠিক হবে না।
আলোচনায় জনশক্তি রপ্তানির বিষয়টিকেও অন্তর্ভুক্ত করার আহ্বান জানান বিএমসিসিআই সভাপতি। বিষয়টির ওপর গুরুত্ব আরোপের আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, মালয়েশিয়ার সঙ্গে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্পর্কের পরিধি এখনো সীমিত এবং তৈরি পোশাক পণ্যের বাইরে বাংলাদেশ নিজের রপ্তানি পণ্য বহুমুখী করতে পারেনি।
মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশ থেকে বর্তমানে টেক্সটাইল ও তৈরি পোশাক, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, পাট ও পাটজাত পণ্য, মাছ ও সামুদ্রিক খাবার এবং ওষুধ রপ্তানি হয়। অন্যদিকে দেশটি থেকে বাংলাদেশে বৈদ্যুতিক ও ইলেকট্রনিক সরঞ্জাম, পাম তেল, যন্ত্রপাতি ও যান্ত্রিক সরঞ্জাম, রাবার পণ্য এবং রাসায়নিক দ্রব্য আমদানি হয়।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে মালয়েশিয়ায় ২৮২ মিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছে বাংলাদেশ এবং দেশটি থেকে ২ দশমিক ২৯ বিলিয়ন ডলারের পণ্য আমদানি করা হয়েছে।
এই বিশাল বাণিজ্য ঘাটতির পেছনে মূলত মালয়েশিয়া থেকে বাংলাদেশের বিপুল পরিমাণ পাম তেল আমদানি।
পলিসি এক্সচেঞ্জ অব বাংলাদেশের (পিইবি) চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ড. এম মাশরুর রিয়াজও এলডিসি উত্তরণের আগে বাজার সুবিধা নিশ্চিত করা এবং রপ্তানি গন্তব্য বহুমুখীকরণের ওপর জোর দেন।
তিনি জানান, বাংলাদেশের মোট রপ্তানির ৮৪ শতাংশই তৈরি পোশাক খাতের ওপর নির্ভরশীল, অন্যদিকে প্রায় একই পরিমাণের রপ্তানি মাত্র তিনটি দেশ ও অঞ্চলে যায়—যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন।
মাশরুর বলেন, এলডিসি মর্যাদার সঙ্গে যুক্ত শুল্কমুক্ত বাজার সুবিধার কারণেই বাংলাদেশের এই রপ্তানি বাজার তৈরি হতে পেরেছে। কিন্তু উত্তরণের পর বদলে যাওয়া পরিস্থিতিতে নতুন বাণিজ্য গন্তব্যের পথ খোঁজা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
তিনি বলেন, বাণিজ্য ও ব্যবসার প্রসারে এশীয় বাজারগুলো আরও বড় ভূমিকা রাখতে পারে। সেই প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে মালয়েশিয়া, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া এবং অন্যান্য দেশের সঙ্গে চুক্তিগুলো গুরুত্বপূর্ণ হবে।
তিনি আরও বলেন, দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় দেশগুলোর জোট আসিয়ানে ঢুকতে বাংলাদেশের জন্য একটি ‘গেটওয়ে’ বা প্রবেশদ্বার হতে পারে মালয়েশিয়া।
এই অঞ্চলের প্রবৃদ্ধির বিশাল সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও আসিয়ান দেশগুলোতে বাংলাদেশের রপ্তানি এখনো বেশ কম বলে উল্লেখ করেন তিনি।
তিনিও মালয়েশিয়ার সঙ্গে এফটিএ আলোচনায় জনশক্তি রপ্তানির বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করার পরামর্শ দেন।



