সোমবার, ২ নভেম্বর, ২০২৬
১৭ই কার্তিক, ১৪৩৩

ডেইলি বরিশাল

দক্ষিণাঞ্চলের শীর্ষস্থানীয় ও বস্তুনিষ্ঠ দৈনিক পত্রিকা

জাতীয়

পা দিয়ে লিখে এইচএসসি পাস করলেন কলি, হতে চান বিসিএস ক্যাডার

পা দিয়ে লিখে এইচএসসি পাস করলেন কলি, হতে চান বিসিএস ক্যাডার...

ম
মুনতাসির মাহমুদ· বার্তা সম্পাদক
প্রকাশ: ২ নভেম্বর ২০২৬, ৩:৩৪ পিএমসর্বশেষ: ২ নভেম্বর ২০২৬, ৩:৩৪ পিএম
পা দিয়ে লিখে এইচএসসি পাস করলেন কলি, হতে চান বিসিএস ক্যাডার

জন্ম থেকেই দুটি হাত অচল। কিন্তু সেই সীমাবদ্ধতা কখনোই কলি রানীর স্বপ্নের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি। ছোটবেলা থেকেই পা-ই তার ‘হাত’, শক্তি, এগিয়ে চলার একমাত্র ভরসা। দুই পা দিয়েই লিখছেন, ছবি আঁকছেন, চালাচ্ছেন কম্পিউটার-মোবাইলও।

পা দিয়ে লিখেই এবারের এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে পাস করেছেন রংপুরের কাউনিয়া উপজেলার তিস্তাপাড়ের গদাই গ্রামের কলি রানী। কাউনিয়া মহিলা কলেজের এই শিক্ষার্থী মানবিক বিভাগ থেকে পেয়েছেন জিপিএ-৩.৫০।

জীবনের প্রতিটি ধাপে প্রতিবন্ধকতাকে হার মানিয়ে এগিয়ে চলা কলির বিশ্বাস, মানুষের সীমাবদ্ধতা শরীরে নয়, মনোবলে।

এখন তার স্বপ্ন, বিসিএস ক্যাডার হয়ে প্রশাসনে যোগ দেওয়া এবং মানুষের সেবা করা।

তবে, কলির এই পথচলা সহজ ছিল না। তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ার সময় হারান বাবাকে। কৃষক মনোরঞ্জন রায়ের মৃত্যুর পর ছয় ভাই-বোনের সংসারে নেমে আসে অনিশ্চয়তা। সংসারের সবচেয়ে ছোট সন্তান কলিকে নিয়ে মা রুপালী রানীর সংগ্রাম তখন আরও কঠিন হয়ে ওঠে। একদিকে শারীরিক প্রতিবন্ধকতা, অন্যদিকে আর্থিক সংকট—দুইয়ের সঙ্গে লড়াই করেই বড় হয়েছেন কলি।

পরিবারের সামান্য কৃষিজমিই তাদের একমাত্র সম্বল। তিস্তার ভয়াবহ ভাঙনে সেই জমিরও বড় একটি অংশ নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। তবু থামের কলির স্বপ্ন দেখা।

ভাওয়াইয়া ও দেশাত্মবোধক গান গেয়ে উপজেলা ও জেলা পর্যায়ের বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় ডজনখানেক পুরস্কারও জিতেছেন কলি। পা দিয়ে ছবি এঁকেও পেয়েছেন একাধিক সম্মাননা।

অদম্য সাহস ও আত্মবিশ্বাসের কারণে স্থানীয়দের কাছে কলি পরিচিত ‘হার না মানা তরুণী’ হিসেবে।

মা রুপালী রানী বলেন, জন্ম থেকেই মেয়ের দুটি হাত অচল। তাই ছোটবেলা থেকেই তাকে পা দিয়ে সব কাজ শেখানো হয়েছে। অবিশ্বাস্য অধ্যবসায়ের মাধ্যমে কলি নিজের দুই পা-কে হাতের বিকল্প হিসেবে গড়ে তুলেছে।

‘আমার মেয়েকে কখনো নিজের ভাগ্য নিয়ে আফসোস করতে দেখিনি। পা দিয়ে সে লেখাপড়া করে, খাওয়া-দাওয়া করে, গোসল করে, চুল আঁচড়ায়, মোবাইল ও কম্পিউটার চালায়। শুধু নিজের পোশাক নিজে পরতে পারে না। ওই কাজটুকু আমি করে দিই।

রুপালী রানী বলেন, ‘ওর স্বপ্ন বিসিএস পাস করে মানুষের জন্য কাজ করবে। কিন্তু আমাদের সেই সামর্থ্য নেই। ওর বাবা বেঁচে থাকলে হয়তো আরও ভালোভাবে পাশে দাঁড়াতে পারতেন। কৃষিকাজের সামান্য আয় দিয়ে সংসার চালাতেই কষ্ট হয়। তারপরও মেয়ের স্বপ্ন পূরণে যতটা পারি চেষ্টা করে যাচ্ছি।

কলির বড় ভাই মন্টু রায় বলেন, ছোটবেলায় ডান পা দিয়ে ধীরে ধীরে লেখা শেখা শুরু করেছিল সে। দীর্ঘ অনুশীলনের মাধ্যমে এখন সে অন্য শিক্ষার্থীদের মতোই দ্রুত লিখতে পারে।

‘তিস্তার ভাঙনে আমাদের অনেক জমি নদীতে চলে গেছে। এখন যা আছে, তা চাষ করেই কোনোভাবে সংসার চলছে। তারপরও বোনের পড়াশোনা যেন বন্ধ না হয়, সেই চেষ্টা আমরা চালিয়ে যাব।

কলি রানী বলেন, আমার মা আমার সবচেয়ে বড় শক্তি। ভাই, পরিবারের সদস্য, শিক্ষক, সহপাঠী—সবাই আমাকে সাহস দেন। তাদের ভালোবাসাই আমাকে সামনে এগিয়ে যেতে শেখায়।

নিজের শারীরিক সীমাবদ্ধতা নিয়ে কোনোদিন আফসোস করেননি জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আমার দুই পা-ই আমার হাত, আমার শক্তি। এই পায়ের ওপর ভর করেই আমি সব বাধা অতিক্রম করতে চাই। আমি স্বপ্ন দেখি, আর সেই স্বপ্ন পূরণ না হওয়া পর্যন্ত থামব না।

কাউনিয়া মহিলা কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ রফিকুল ইসলাম বলেন, শারীরিক প্রতিবন্ধকতা কলির অগ্রযাত্রাকে থামিয়ে রাখতে পারেনি। কাউনিয়া মহিলা কলেজের মানবিক বিভাগ থেকে এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে সে জিপিএ-৩.৫০ পেয়েছে।

‘কলি শুধু লেখাপড়াতেই নয়, সংগীতচর্চা, চিত্রাঙ্কন ও কম্পিউটার শিক্ষার মাধ্যমেও নিজেকে দক্ষ করে তুলেছে। তার জীবন অন্য শিক্ষার্থীদের জন্য অনুপ্রেরণার একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত’, যোগ করেন তিনি।

📢এই সংবাদটি শেয়ার করুন

📢 আপনিও হোন পাঠক সাংবাদিক!

আপনার এলাকার যেকোনো খবর, সমস্যা বা ভিডিও সরাসরি আমাদের নিউজ পোর্টালে জমা দিন

সংবাদ পাঠান ↗
ম

মুনতাসির মাহমুদ

বার্তা সম্পাদক

নিউজরুম এডিটর, ডেইলি বরিশাল ডটকম। বার্তা বিভাগে অভিজ্ঞতা ৭ বছর।

সম্পর্কিত আরও সংবাদ