বুধবার, ৪ নভেম্বর, ২০২৬
১৯শে কার্তিক, ১৪৩৩

ডেইলি বরিশাল

দক্ষিণাঞ্চলের শীর্ষস্থানীয় ও বস্তুনিষ্ঠ দৈনিক পত্রিকা

সারাদেশ

‘তিনি তো মরে গিয়ে রক্ষা পেলেন, আমরা তো সেটাও পারছি না’

‘তিনি তো মরে গিয়ে রক্ষা পেলেন, আমরা তো সেটাও পারছি না’...

র
রাহুল হাসান· প্রতিবেদক
প্রকাশ: ৩ নভেম্বর ২০২৬, ১০:৫৩ পিএমসর্বশেষ: ৩ নভেম্বর ২০২৬, ১০:৫৩ পিএম
‘তিনি তো মরে গিয়ে রক্ষা পেলেন, আমরা তো সেটাও পারছি না’

‘তিনি তো মরে গিয়ে রক্ষা পেলেন, আমরা তো সেটাও পারছি না। শুধু মানিক সাহেবই না, বছর তিনেক আগে আমাদের কলেজেরই আরেক সহকর্মী প্রভাষক মুক্তার হোসেন বেতন না হওয়ার হতাশায় কলেজ থেকে বাড়ি ফেরার পথে স্ট্রোক করে মারা যান। একজন মানুষ নিয়মিত ডিউটি করেও বিনা বেতনে দিন পার করা যে কতটা দুঃসহ, সেটা বলে বোঝানো যাবে না। দশকের পর দশক ধরে সেবা দিয়ে বেতন হচ্ছে-হবে এ অপেক্ষায় দিন গোনা যে কতটা কষ্টের তা কেবল আমরা ভুক্তভোগীরাই জানি।

কিছুটা আবেগ আর অভিমানভরা কণ্ঠে কথাগুলো বলছিলেন নাটোরের বড়াইগ্রামের কালিকাপুর-বনপাড়া কৃষি ও কারিগরি কলেজের অর্থনীতি বিষয়ের নন-এমপিও প্রভাষক সোহেল রানা।

অর্থাভাবে আর ঋণের চাপে সহকর্মী প্রভাষক শৈলেন্দ্র কুমার চৌধুরী মানিকের আত্মহত্যার কথা স্মরণ করে তিনি কথাগুলো বলেন।

প্রভাষক মানিকও একই কলেজে পদার্থবিজ্ঞানের প্রভাষক ছিলেন। জীবিকার ব্যয় মেটাতে গিয়ে ঋণের দায়ে বাড়ি-ভিটা বিক্রি করেও তিনি রেহাই পাননি। অবশেষে চরম মানসিক হতাশায় সোমবার সন্ধ্যায় ভাড়া বাসায় তিনি বিষাক্ত ট্যাবলেট সেবনে আত্মহত্যা করেন।

নন-এমপিও শিক্ষক-কর্মচারী ফেডারেশনের বড়াইগ্রাম উপজেলা সমন্বয়ক ও আহম্মেদপুর ডিগ্রি কলেজের প্রভাষক রসুল আলম বলেন, এ উপজেলায় চারটি উচ্চ মাধ্যমিক কলেজ, চারটি কলেজের ডিগ্রি শাখা, তিনটি দাখিল মাদ্রাসা এবং একটি নিম্ন মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়ের মাধ্যমিক শাখা দীর্ঘদিনেও এমপিওভুক্ত হয়নি। এতে কমপক্ষে আড়াইশ শিক্ষক-কর্মচারী বছরের পর বছর ধরে বিনা বেতনে শ্রম দিয়ে যাচ্ছেন। এছাড়া দীর্ঘদিনেও বেতন-ভাতা না পাওয়ায় এ উপজেলায় আরও একটি মহিলা কলেজসহ পাঁচটি দাখিল মাদ্রাসা একেবারে বন্ধ হয়ে গেছে। এতে বেকার হয়ে পড়েছেন আরও শতাধিক মানুষ।

আহম্মেদপুর আযম আলী ডিগ্রি কলেজের ইতিহাস বিভাগের প্রভাষক আবুল কালাম বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ ডিগ্রি নিয়ে এসে এলাকায় শিক্ষার আলো ছড়ানোর পাশাপাশি একটু সুন্দর ও সচ্ছল জীবনযাপনের প্রত্যাশায় কলেজে ঢুকেছিলাম। আমাদের সঙ্গে লেখাপড়া করা অনেকেই ভালো চাকরি করছেন, কিন্তু আমাদের জীবন যেন থমকে গেছে কোনো এক অন্ধকার বৃত্তে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন কলেজ শিক্ষক বলেন, ঈদ-পার্বণে সবার ছেলেমেয়েরা যখন দামি পোশাক পরে, তখন আমরা তাদের সাধারণ কাপড়চোপড় দিতেই হিমশিম খাই। আর নিজেদের কোনো শখ পূরণের কথা তো এখন আর ভাবিই না; কিন্তু সরকার যদি আমাদের দিকে একটু মুখ তুলে তাকাত, তাহলে আমাদের এভাবে ধুঁকে ধুঁকে মরতে হতো না।

নন-এমপিও শিক্ষক আব্দুল বাতেন বলেন, একজন দিনমজুরও দিন শেষে ৬-৭শ টাকা হাতে পায়। আমরা না পারছি দিনমজুরি করতে, না পারছি অন্য কোনো পেশায় যেতে। উপার্জন না থাকলেও তো আমাদের পরিবার আছে, স্ত্রী-সন্তান আছে। আমরা তো নিজেদের কপাল পুড়িয়েছি, সেই সঙ্গে স্ত্রী-সন্তানদের স্বপ্নগুলোও শেষ করে দিয়েছি।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা লায়লা জান্নাতুল ফেরদৌস বলেন, আজ একজন কলেজ শিক্ষক আত্মহত্যা করেছেন, বিষয়টি সত্যিই দুঃখজনক। হাজার হাজার নন-এমপিও শিক্ষক-কর্মচারীদের পরিবারের আর্থিক দৈন্য দূর করতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়সহ ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ যথাযথ উদ্যোগ নেবে বলে প্রত্যাশা রাখি।

📢এই সংবাদটি শেয়ার করুন

📢 আপনিও হোন পাঠক সাংবাদিক!

আপনার এলাকার যেকোনো খবর, সমস্যা বা ভিডিও সরাসরি আমাদের নিউজ পোর্টালে জমা দিন

সংবাদ পাঠান ↗
র

রাহুল হাসান

প্রতিবেদক

জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক, ডেইলি বরিশাল। সাংবাদিকতায় ১৫ বছরের অভিজ্ঞতা।

সম্পর্কিত আরও সংবাদ