ফুটবল বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলা। এই খেলার নিয়ম অনুযায়ী, একটি ম্যাচের নির্ধারিত সময় ৯০ মিনিট। দুই অর্ধে ৪৫ মিনিট করে খেলা হয়, মাঝখানে থাকে ১৫ মিনিটের বিরতি। কিন্তু কখনো কি ভেবে দেখেছেন, ফুটবল ম্যাচের সময় ৯০ মিনিট নির্ধারণ করা হলো কেন?
এর পেছনে রয়েছে দীর্ঘ ইতিহাস, কিছু ঐতিহাসিক ঘটনা এবং গবেষকদের ভিন্ন ভিন্ন ব্যাখ্যা। মজার বিষয় হলো, ফুটবলের প্রথম দিককার নিয়মকানুনে ম্যাচের নির্দিষ্ট সময়সীমার কোনো উল্লেখ ছিল না।
১৮৬৩ সালের ৫ ডিসেম্বর ইংল্যান্ড ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন (এফএ) প্রথমবারের মতো আনুষ্ঠানিকভাবে ফুটবলের নিয়ম প্রকাশ করে। সেই নিয়ম প্রণয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল সংস্থাটির প্রথম মহাসচিব এবেনেজার কব মর্লির। তবে সেখানে ম্যাচ কতক্ষণ চলবে কিংবা একটি দলে কতজন খেলোয়াড় থাকবেন, তা নির্ধারণ করা হয়নি।
সে সময় ইংল্যান্ডের শেফিল্ড ছিল ফুটবলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। ১৮৫৭ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় বিশ্বের প্রাচীনতম ফুটবল ক্লাব শেফিল্ড এফসি। পরের বছর ক্লাবটি নিজেদের কিছু নিয়ম প্রকাশ করে, যা ‘শেফিল্ড রুলস’ নামে পরিচিতি পায়। কিন্তু সেখানেও ম্যাচের সময়সীমা নির্দিষ্ট ছিল না।
ফুটবল ইতিহাসবিদ অ্যাড্রিয়ান হার্ভির গবেষণা অনুযায়ী, ১৮৫০-এর দশকের শেষ দিকে শেফিল্ডের ম্যাচগুলোতে প্রতি দলে প্রায় ২০ জন করে খেলোয়াড় অংশ নিতেন। ম্যাচ চলত প্রায় দুই ঘণ্টা। এমনকি ১৮৬২ সালেও খেলার সময় নিয়ে কোনো সর্বজনীন নিয়ম ছিল না। কোনো ম্যাচ এক ঘণ্টায় শেষ হতো, আবার কোনোটি গড়াত তিন ঘণ্টা পর্যন্ত।
প্রথম ৯০ মিনিটের ম্যাচ কবে?
ইতিহাসে ৯০ মিনিটের নির্ধারিত সময়ে অনুষ্ঠিত প্রথম ফুটবল ম্যাচের সন্ধান পাওয়া যায় ১৮৬৬ সালের ৩১ মার্চ। লন্ডনের ব্যাটারসি পার্কে শেফিল্ড এফসির বিপক্ষে মাঠে নেমেছিল লন্ডনের বিভিন্ন ক্লাবের সমন্বয়ে গঠিত একটি দল।
ইতিহাসবিদদের ধারণা, শেফিল্ড থেকে লন্ডনে যাতায়াতের জন্য ট্রেনের সময়সূচির বিষয়টি বিবেচনায় রেখেই ম্যাচটির সময় ৯০ মিনিট নির্ধারণ করা হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে এই সময়সীমা জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। এর ধারাবাহিকতায় ১৮৭১ সালে এফএ কাপের প্রথম আসরের নিয়মেও প্রতিটি ম্যাচের সময় দেড় ঘণ্টা নির্ধারণ করা হয়।
৯০ মিনিটের পেছনে কি রয়েছে সংখ্যার রহস্য?
তবে ফুটবল ম্যাচের সময় ৯০ মিনিট হওয়ার পেছনে শুধু ঐতিহাসিক ঘটনাই নয়, সংখ্যার ব্যবহার নিয়েও একটি ব্যাখ্যা দিয়েছেন ইংরেজ গবেষক পিটার সেডন। তার ‘ফুটবল টক: দ্য ল্যাঙ্গুয়েজ অ্যান্ড ফোকলোর অব দ্য ওয়ার্ল্ডস গ্রেটেস্ট গেম’ বইয়ে তিনি দেখিয়েছেন, সময়কে ৬০ মিনিটে ভাগ করার মধ্যযুগীয় ধারণার সঙ্গে ৯০ মিনিটের সম্পর্ক থাকতে পারে।
সেডনের মতে, প্রায় ৬০০ বছর আগে ৬০ সংখ্যাটিকে একটি পূর্ণাঙ্গ বা গোছানো সংখ্যা হিসেবে বিবেচনা করা হতো। সেই ধারণা থেকেই ১৫ মিনিটের ভাগ কিংবা এর গুণিতকগুলো সময় নির্ধারণে গুরুত্ব পেতে পারে। টেনিসের স্কোরিং পদ্ধতির সঙ্গেও তিনি এই সংখ্যাগত ধারণার সম্পর্ক খুঁজে পেয়েছেন।
ফুটবলে ১৫ মিনিটের গুরুত্ব কেন?
ফুটবলের ৯০ মিনিটকে ছয়টি ১৫ মিনিটের ভাগে বিভক্ত করা যায়। খেলায় এই সময়ের গুরুত্বও বেশ লক্ষণীয়। কোচরা অনেক সময় ম্যাচের শুরুর ১৫ মিনিটে রক্ষণ সামলে খেলার পরামর্শ দেন। আবার ম্যাচের শেষ ১৫ মিনিটকে বলা হয় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়গুলোর একটি।
ফরাসি কিংবদন্তি কোচ আর্সেন ওয়েঙ্গারও মনে করতেন, চ্যাম্পিয়ন্স লিগের ম্যাচে শেষ ১০ থেকে ১৫ মিনিট অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এই সময়েই অনেক ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারিত হয়।
ফুটবল ম্যাচ ৯০ মিনিট হওয়ার পেছনে কোনো একক কারণ নিশ্চিতভাবে প্রতিষ্ঠিত নয়। ঐতিহাসিক ঘটনা, তৎকালীন যাতায়াতব্যবস্থা এবং সময়কে ভাগ করার প্রচলিত ধারণা—সবকিছুর সমন্বয়েই ধীরে ধীরে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে আজকের ৯০ মিনিটের নিয়ম। আর সেই নিয়মই এখন বিশ্বজুড়ে ফুটবলের অন্যতম পরিচিত বৈশিষ্ট্য।






