দূর থেকে দেখে মনে হয়, অন্ধকারের বুকে জ্বলে উঠেছে আলোর এক বিশাল জনপদ। যত দূর চোখ যায়, শুধু আলো আর আলো। সারি সারি প্রদীপের শিখা, মোমবাতি আর বর্ণিল আলোকসজ্জায় অমাবস্যার ঘোর কাটিয়ে আলোকিত হয়ে উঠেছে পুরো এলাকা।
উড়ন্ত পাখির চোখে তাকালে মনে হয় অন্ধকারের বুকে কেউ যেন ছড়িয়ে দিয়েছে লাখো আলোর বিন্দু। এ আলো উৎসবের, এ আলো ভালোবাসার। প্রয়াত স্বজনদের স্মরণে বরিশালের ঐতিহাসিক মহাশ্মশানে এমনই আলোর আয়োজন শ্মশান দীপালি।
শনিবার সন্ধ্যায় বরিশালের কাউনিয়া এলাকার উপমহাদেশের বৃহত্তম মহাশ্মশানে অনুষ্ঠিত হয়েছে ৯৯তম শ্মশান দীপালি উৎসব। সন্ধ্যা নামার সঙ্গে সঙ্গে সমাধিতে সমাধিতে জ্বলে উঠেছে প্রদীপ ও মোমবাতি। ফুল, রঙিন বাতি আর নানা আয়োজনে সাজানো হয়েছে প্রয়াত স্বজনদের সমাধি। কেউ প্রিয়জনের সমাধিতে ফুল দিচ্ছেন, কেউ নিবেদন করছেন তাদের পছন্দের খাবার। আবার কেউ পূর্বপুরুষের স্মরণে করছেন তর্পণ। ধর্মীয় প্রার্থনা ও পূজার মধ্য দিয়ে পুরো মহাশ্মশান পরিণত হয়েছে এক আবেগঘন মিলনমেলায়।
বরিশাল জেলা পূজা উদ্যাপন কমিটির সভাপতি মানিক মুখার্জি কুডু বলেন, শ্মশান দীপালি কালীপূজোর আগে পালন করি আমরা। বরিশালের শ্মশান দীপালি এক ইতিহাসের অংশ হয়ে গেছে।
১৯৯ বছরের ইতিহাস বহন করছে বরিশাল মহাশ্মশান। ১৮২৭ সালের দিকে নগরীর নতুন বাজার এলাকায় এর প্রাথমিক যাত্রা শুরু হয়। পরে সেখানে জায়গা সংকুলান না হওয়ায় কাউনিয়া এলাকায় গড়ে ওঠে বর্তমান মহাশ্মশান। প্রায় ৫ একর ৯৬ শতাংশ জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত এই মহাশ্মশানে রয়েছে ৭০ হাজারের বেশি সমাধি। এর মধ্যে প্রায় ৮০০টি মঠের স্বজন বর্তমানে দেশে নেই। এসব সমাধির দেখভাল করে মহাশ্মশান রক্ষা কমিটি।
১৯২৭ সাল থেকে এখানে ধারাবাহিকভাবে পালিত হয়ে আসছে শ্মশান দীপালি। সেই হিসাবে এবার উৎসবের ৯৯ বছর। প্রতিবছর এই আয়োজন ঘিরে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে হাজারো মানুষ ছুটে আসেন। বিদেশে বসবাস করা অনেকেই ফিরে আসেন পূর্বপুরুষের স্মৃতির টানে।
মহাশ্মশান রক্ষা কমিটির সভাপতি অসীম কুমার দাস মুরলী বলেন, আগামী বছর শ্মশানের ২০০ বছর ও শ্মশান দিপালীর ১০০ বছর পালন করব আমরা। এদিন দেশের বাইরে থেকেও মানুষ আসেন তাদের প্রিয়জনের স্মরণে। এই সময়টা একটি মিলনমেলায় পরিণত হয়।
শুধু ধর্মীয় ঐতিহ্য নয়, বরিশালের ইতিহাসেরও গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী এই মহাশ্মশান। এখানে শায়িত রয়েছেন ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের বিপ্লবী, সমাজসংস্কারক, নারী নেত্রী ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বরা। তাদের মধ্যে রয়েছেন মনোরমা বসু মাসীমা, বিপ্লবী দেবেন্দ্রনাথ ঘোষ, হিরণলাল ভট্টাচার্য ও শৈলেশ্বর চক্রবর্তী। কবি জীবনানন্দ দাশের পিতামহ সর্বানন্দ দাশ ও পিতা সত্যানন্দ দাশের সমাধিও রয়েছে এখানে।
সময়ের সঙ্গে বরিশালের এই আয়োজন ছড়িয়ে পড়েছে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে। ধর্মীয় আচার ছাড়িয়ে শ্মশান দীপালি এখন ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সম্প্রীতির এক অনন্য আয়োজন।
অমাবস্যার রাত শেষে এক সময় নিভে যাবে প্রদীপের শিখা। কিন্তু আলো জ্বালিয়ে যাদের স্মরণ করা হলো, তাদের স্মৃতি থেকে যাবে প্রজন্মের পর প্রজন্ম। বরিশাল মহাশ্মশানের এই দীপালি তাই কেবল আলোকসজ্জা নয়, মৃত্যুর ওপারেও প্রিয়জনের প্রতি ভালোবাসা আর শ্রদ্ধা বাঁচিয়ে রাখার এক অনন্য ঐতিহ্য।






