ভাষা আন্দোলনের অগ্রসৈনিক ও মুক্তিযুদ্ধের শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের নাতনি অ্যারোমা দত্ত কুমিল্লায় তাদের পৈতৃক সম্পত্তির পরিচয়সংবলিত সাইনবোর্ড অপসারণের ঘটনায় কোনো আইনগত ব্যবস্থা নেবেন না বলে জানিয়েছেন।
অ্যারোমা দত্ত সাংবাদিকদের বলেন, ‘গত পাঁচ দশকেও রাষ্ট্র তার দাদাকে যথাযথ সম্মান দিতে পারেনি। এমনকি ঢাকায় তার নামে কোনো সড়ক বা গলির নামও রাখা হয়নি।
‘৫০ বছর পর যারা এখন ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের বাড়ি সংরক্ষণের দাবি তুলছেন, তাদের এই দাবির পেছনে অসৎ উদ্দেশ্য রয়েছে,’ বলেন তিনি।
তিনি আরও বলেন, ‘আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, কিছু ভূমিদস্যু আমাদের ও আমাদের ব্যক্তিগত সম্পত্তির বিরুদ্ধে এসব মানুষকে (এনসিপি কর্মীদের) উসকে দিয়েছে।
অ্যারোমা দত্ত বলেন, ‘মানুষ যদি এভাবে হয়রানির শিকার হয়, তাহলে ভবিষ্যতে কে সম্পত্তিতে বিনিয়োগ করতে বা উন্নয়ন করতে এগিয়ে আসবে? তারা আমাদের জমি দখল করতে চায়। তবে রাষ্ট্র চাইলে দেশের যেকোনো স্থানে ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বের স্মৃতি সংরক্ষণের উদ্যোগ নিতে পারে।
এর আগে, শুক্রবার সন্ধ্যায় জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) কুমিল্লার নেতাকর্মীরা নগরীর ঝাউতলা এলাকায় ধর্মসাগরপাড়ে তাদের পরিবারের ঐতিহাসিক বাড়িতে অ্যারোমা দত্তের লাগানো একটি সাইনবোর্ড খুলে ফেলেন।
তাদের দাবি, বাড়িটি সংরক্ষণ করে সেখানে স্মৃতি জাদুঘর প্রতিষ্ঠা করতে হবে। তাদের যুক্তি, এত ঐতিহাসিক গুরুত্বসম্পন্ন একটি সম্পত্তি ব্যক্তিগত সম্পত্তি হিসেবে বিক্রি করা উচিত নয়।
এ প্রসঙ্গে এনসিপির কুমিল্লা মহানগর শাখার সদস্য সচিব মাসুমুল বারী কাওসার সাংবাদিকদের বলেন, ‘ঐতিহাসিক বাড়িটি রক্ষার স্বার্থেই সাইনবোর্ডটি অপসারণ করা হয়েছে।
‘ব্যক্তিগত সম্পত্তি হিসেবে বাড়িটি বিক্রির যেকোনো চেষ্টা আমরা প্রতিহত করব,’ বলেন তিনি।
অ্যারোমার মালিকানার দাবি নিয়ে প্রশ্ন তুলে এনসিপির এই নেতা বলেন, ‘আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে দু’বার সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য থাকলেও স্থানীয় বাসিন্দারা তাকে কখনো বাড়িটিতে আসতে কিংবা দাদার স্মরণে কোনো অনুষ্ঠান আয়োজন করতে দেখেননি।
জমির নামজারি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে কীভাবে সম্পত্তিটি তার নামে রেকর্ড হয়েছে, তা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন মাসুমুল বারী কাওসার।
তিনি বলেন, ‘বাড়িটি দেশের ইতিহাসের, বিশেষ করে ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে সম্পৃক্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা। তাই এনসিপি মনে করে, এটি সংরক্ষণ করা উচিত।
টি নিয়ে তারা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে লিখিত আবেদন জমা দিয়েছেন বলেও জানান কাওসার।
ভাষা আন্দোলনের অন্যতম অগ্রসৈনিক ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত ১৯৪৮ সালে পাকিস্তানের গণপরিষদে উর্দুর পাশাপাশি বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবি জানিয়েছিলেন। ১৯৪০-এর দশকের শেষ দিকে তিনি কুমিল্লায় বাড়িটি নির্মাণ করেন এবং সেখানে বসবাস শুরু করেন।
১৯৭১ সালের ২৯ মার্চ রাতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত ও তার ছেলে দিলীপ কুমার দত্তকে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে যায়। পরে তৎকালীন ময়নামতি সেনানিবাসে (বর্তমানে কুমিল্লা সেনানিবাস) তাদের নির্যাতন করে হত্যা করা হয়। তাদের মরদেহ আর কখনো পাওয়া যায়নি।
অ্যারোমা দত্ত সাংবাদিকদের বলেন, ‘কুমিল্লার সবাই জানেন, সম্পত্তিটি আমাদের পরিবারের। এটি আমাদের পৈতৃক সম্পত্তি। এটি কীভাবে ব্যবহার করা হবে, এমনকি বিক্রি করা হবে কি না, সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার সম্পূর্ণ অধিকার পরিবারের।
তিনি জানান, দাদার স্মৃতি সংরক্ষণের পরিকল্পনা তারও আছে।
‘তবে আমার পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য আগে আমাকে সুযোগ ও প্রয়োজনীয় সম্পদ দিতে হবে,’ বলেন তিনি।
কোতোয়ালি মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) তৌহিদুল আনোয়ার সাংবাদিকদের বলেন, এ ঘটনায় কেউ থানায় অভিযোগ করেনি।
তিনি জানান, অ্যারোমা দত্তের সঙ্গে তার কথা হয়েছে। তিনি আইনজীবীর সঙ্গে পরামর্শ করে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেবেন বলে জানিয়েছেন।
এদিকে ঝাউতলার বাসিন্দারা জানান, ধর্মসাগরপাড়ের সড়কসংলগ্ন ১৫ শতক জমিটির বর্তমান বাজারমূল্য আনুমানিক ১০ থেকে ১৫ কোটি টাকা। সামনের সড়কটি কতটুকু প্রশস্ত করা হবে, তার ওপর জমির মূল্য নির্ভর করছে।
ঐতিহাসিক গুরুত্বসম্পন্ন এই সম্পত্তিটি নিয়ে বেশ কয়েকটি আবাসন প্রতিষ্ঠান ও প্রভাবশালী মহলের আগ্রহ আছে বলে জানা স্থানীয়রা জানান।






