বাংলাদেশ থেকে বিদেশে পা রাখা মানেই যেন একটাই প্রত্যাশা— টাকা উপার্জন করো। প্রবাসী মানেই টাকার মেশিন— এমন ধারণা এখনো দেশে থাকা অনেকের মধ্যেই প্রবল। অথচ প্রবাস জীবন মানেই কঠোর পরিশ্রম, অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ, নিজের ও পরিবারের জন্য নিরলস সংগ্রাম। চাকরি, ব্যবসা, বা অগণিত ঘাম ঝরানো ঘন্টার পর কেউ সময় পান না নিজের বাইরে অন্যের জন্য ভাবতে।
তবুও এই ব্যস্ততার পৃথিবীতে কিছু মানুষ আছেন, যারা নিঃস্বার্থভাবে মানুষের পাশে দাঁড়ান, সমাজের কল্যাণে কাজ করেন— এমনই এক ব্যতিক্রম মানুষ ইতালির রোমে বসবাসরত মোঃ মুজিবুর সিকদার। তিনি শুধু বরিশালবাসীর ই নয়, বাংলাদেশি বাংলা ভাষাভাষি মানুষদের মন জয় করে এক অনন্য ভরসার নাম।
প্রবাসে জীবিত মানুষের বন্ধু অনেক পাওয়া যায়, কিন্তু মৃত্যুর পর পাশে দাঁড়ায় এমন মানুষ পাওয়া যায় না। এই জায়গায় মুজিবুর সিকদার এক উজ্জ্বল উদাহরণ। প্রবাসে কেউ মারা গেলে, অসুস্থ হলে বা বিপদে পড়লে সবার আগে যিনি পৌঁছে যান, তিনি মুজিবুর সিকদার। দির্রোঘ ৩৬ বছরের প্রবাস জীবনে তিনি বরিশাল সহ বাংলাদেশী প্রবাসী অর্ধশতাধিক মরদেহ নিজ পরিবারের কাছে পাঠানোর ব্যবস্থা করেছেন— পাশে থেকেছেন স্থানীয় বরিশালবাসীকে নিয়ে।
ইতালিতে মুসলিমদের সালাত আদায়ে চরম সমস্যা ছিল, মসজিদ ছিল না, যেহেতু মুজিবুর সিকদার একজন খাটি মুসলিম ও ধার্মিক মানুষ, তাই ২০১২ সালে রোম শহরে মোন্তানিওয়ালা মসজিদে বাইতুল মোকাররম নামে মসজিদ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেন । বাংলাদেশি মানুষের সহযোগিতা নিয়ে মসজিদ প্রতিষ্ঠা করেন । মসজিদ কমিটির বর্তমান ভারপ্রাপ্ত সভাপতির দায়িত্ব পালন করতেছেন ।
করোনার ভয়াল সময়েও তিনি ছিলেন নির্ভীক। গৌরনদীর কটকস্থলের ইতালি প্রবাসী ব্যবসায়ী মন্টু মোল্লা ইতালির হাসপাতালে মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছিলেন— মুজিবুর সিকদার তখন হাসপাতালের নিচে গাছতলায় বসে প্রার্থনা করতেন সুসংবাদের আশায়। বার্থী ইউনিয়নের সাবেক ইউপি সদস্য ওয়াজেদ আলী বেপারীর ছেলে শাহ আলম বেপারী নিজ রুমে মৃত্যুবরণ করলে, কয়েক দিন পর খবর পেয়ে পুলিশ নিয়ে লাশ বাংলাদেশ পাঠানোর ব্যবস্থা করেন তিনি। এমন অসংখ্য মানবিক কাজের সাক্ষী তাঁর প্রবাস জীবন।
নতুন কেউ বাংলাদেশ থেকে ইতালি এলে বিমানবন্দরে গিয়ে স্বাগত জানানো, থাকার ব্যবস্থা করা, খাবার ও কাজ খুঁজে দিতে সহায়তা করা— এসব কাজ তাঁর কাছে নিত্যদিনের ব্যাপার। রাত-বিরাতে কেউ ফোন করলে তিনিও দেরি না করে হাজির হন সাহায্যে।
প্রথমদিকে তাঁর স্ত্রী কিছুটা উদ্বিগ্ন থাকলেও, পরে স্বামীর মানবসেবা দেখে তিনিও অনুপ্রাণিত হয়েছেন সমাজসেবায় অংশ নিতে।
বরিশালের গৌরনদী উপজেলার বার্থী ইউনিয়নের সুন্দরদী গ্রামের সাবেক ইউপি সদস্য মোহাম্মদ সিকদারের যোগ্য পুত্র এই মুজিবুর সিকদার। দীর্ঘ প্রবাস জীবনে হয়তো তিনি কোটি টাকার মালিক নন, কিন্তু জয় করেছেন বরিশালবাসীসহ অসংখ্য প্রবাসী বাংলাদেশির হৃদয়।
আজ রোমে বরিশাল বিভাগবাসীর একটাই স্লোগান —
“আগামীর বরিশাল বিভাগ সমিতির সভাপতি পদে মুজিবুর সিকদারের বিকল্প নেই।”
শেষকথা — সমাজের জন্য যারা নিঃস্বার্থভাবে শ্রম দেন, মানুষের বিপদে পাশে দাঁড়ান, সংগঠনের পদ-পদবী আসলেই তাদের প্রাপ্য।
ব্যক্তিজীবনে মুজিবুর সিকদার এক সন্তানের জনক। স্ত্রী ও সন্তানকে নিয়ে তিনি রোমের মনতানিওয়ালা এলাকায় বসবাস করছেন— মানুষের দোয়া, ভালোবাসা ও শ্রদ্ধায় বেষ্টিত হয়ে।
লেখা : ইতালি প্রবাসী সাংবাদিক রিয়াজ হোসাইন ,
