বাংলাদেশে মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর ছবি টাঙানোকে কেন্দ্র করে যে আলোচনা ও বিতর্ক চলছে, তা আপাতদৃষ্টিতে একটি ছবি নিয়ে বিতর্ক হলেও এর গভীরে রয়েছে প্রায় এক শতাব্দীর উপমহাদেশীয় রাজনৈতিক ইতিহাস। তাই জিন্নাহর ছবি নিয়ে আলোচনা করতে গেলে প্রশ্নটি শুধু এই নয়—ছবিটি কোথায় টাঙানো হলো, কেন টাঙানো হলো কিংবা কে টাঙালেন।
প্রশ্নটি আরো বড়। জিন্নাহ আসলে কে ছিলেন? তিনি কি শুধু পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা? নাকি ব্রিটিশ ভারতের মুসলমানদের রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব ও সাংবিধানিক অধিকারের অন্যতম প্রধান নেতা? ইকবাল তার রাজনৈতিক চিন্তাকে কতটা প্রভাবিত করেছিলেন? ব্রিটিশ শাসকদের ভূমিকা কোথায়? কংগ্রেসের নেতৃত্বের ভূমিকা কী ছিল? আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—‘বাংলা কেন অবিভক্ত থাকল না?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে গেলে আবেগের চেয়ে দলিল, স্লোগানের চেয়ে ইতিহাস এবং ব্যক্তিপূজার চেয়ে রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বেশি প্রয়োজন। কারণ ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বিপদ তখনই তৈরি হয়, যখন কোনো দীর্ঘ রাজনৈতিক প্রক্রিয়াকে একজন মানুষের জীবনীতে নামিয়ে আনা হয়।
জিন্নাহকে বুঝতে হলে তার রাজনৈতিক যাত্রার শুরুটা বুঝতে হবে। মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ ছিলেন ব্রিটিশ ভারতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মুসলিম রাজনীতিক এবং পরবর্তী সময়ে মুসলিম লীগের প্রধান নেতা। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে তার নেতৃত্ব ছিল কেন্দ্রীয়—এ বিষয়ে ঐতিহাসিক বিতর্কের খুব বেশি অবকাশ নেই।
কিন্তু তার রাজনৈতিক জীবন শুরু হয়েছিল পাকিস্তানের দাবি দিয়ে নয়। জিন্নাহ প্রথম জীবনে ছিলেন সাংবিধানিক রাজনীতির প্রবক্তা। তিনি বিশ্বাস করতেন, রাজনৈতিক অধিকার, প্রতিনিধিত্ব ও সাংবিধানিক সমঝোতার মাধ্যমেই ভারতীয়দের জন্য স্বশাসনের পথ তৈরি করা সম্ভব।
১৯১৬ সালের লখনৌ চুক্তি তার রাজনৈতিক জীবনের এই পর্যায়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত। কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের মধ্যে ওই সমঝোতায় হিন্দু-মুসলিম রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের প্রশ্নে একটি আপসের কাঠামো তৈরি হয়েছিল। জিন্নাহ এই সমঝোতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মধ্যস্থতাকারী ছিলেন।
অর্থাৎ, যে মানুষটি পরবর্তী সময়ে পাকিস্তান আন্দোলনের প্রধান রাজনৈতিক নেতা হয়ে উঠবেন, তার রাজনৈতিক জীবনের শুরু ছিল একটি যৌথ ভারতীয় সাংবিধানিক কাঠামোর মধ্যেই মুসলমানদের রাজনৈতিক অধিকার নিশ্চিত করার চেষ্টা দিয়ে। এই বিবর্তনটি না বুঝলে জিন্নাহকে বোঝা যায় না।
জিন্নাহর রাজনৈতিক ভূমিকা শুধু পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার কয়েক বছরের ইতিহাসে সীমাবদ্ধ ছিল না। তার রাজনৈতিক জীবনের দীর্ঘ সময় তিনি ব্রিটিশ ভারতের মুসলমানদের রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব, সাংবিধানিক নিরাপত্তা, প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসন, প্রশাসনে অংশগ্রহণ এবং ধর্মীয়-সাংস্কৃতিক অধিকার নিয়ে কাজ করেছেন। এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দলিলগুলোর একটি হলো ১৯২৯ সালের ‘জিন্নাহর চৌদ্দ দফা’।
১৯২৮ সালের নেহরু রিপোর্টের পর মুসলমানদের সাংবিধানিক দাবিগুলো নিয়ে যে বিরোধ তৈরি হয়েছিল, তারই প্রেক্ষাপটে জিন্নাহ ১৯২৯ সালে তার চৌদ্দ দফা সামনে আনেন। এই দাবিগুলোর মধ্যে ছিলÑফেডারেল রাষ্ট্রব্যবস্থা, প্রদেশগুলোর হাতে অবশিষ্ট ক্ষমতা, কেন্দ্রীয় আইনসভায় মুসলমানদের অন্তত এক-তৃতীয়াংশ প্রতিনিধিত্ব, পাঞ্জাব ও বাংলার মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ অবস্থান অক্ষুণ্ণ রাখা, রাষ্ট্রীয় চাকরি ও স্থানীয় প্রশাসনে মুসলমানদের যথাযথ অংশগ্রহণ, মুসলিম শিক্ষা, সংস্কৃতি, ভাষা, ধর্ম ও ব্যক্তিগত আইনের সুরক্ষা এবং ধর্মীয় স্বাধীনতার নিশ্চয়তা।
অর্থাৎ, পাকিস্তানের দাবির আগে জিন্নাহর মুসলিম রাজনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যায় ছিল—একটি বৃহত্তর ভারতীয় সাংবিধানিক কাঠামোর মধ্যেই মুসলমানদের রাজনৈতিক নিরাপত্তা ও অধিকার নিশ্চিত করার চেষ্টা।
এই জায়গাটিই জিন্নাহকে শুধু ‘দেশভাগের নেতা’ হিসেবে দেখার সরল ব্যাখ্যাকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়। কারণ তার রাজনৈতিক অবস্থান একদিনে বদলায়নি। বরং বহু বছরের সাংবিধানিক দর-কষাকষি, কংগ্রেস-লীগের মতপার্থক্য, প্রতিনিধিত্বের সংকট এবং সংখ্যাগরিষ্ঠ-সংখ্যালঘু রাজনীতির অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে তা পরিবর্তিত হয়েছে। মুসলিম লীগের জন্ম জিন্নাহর হাতে নয়, তবে দলটিকে পুরো ভারতের একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক দল হিসেবে গড়ে তুলতে তার ভূমিকাই ছিল প্রধান।
মুসলিম লীগকে ব্রিটিশ ভারতের মুসলমানদের একটি সর্বভারতীয় রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্মে রূপান্তরিত করা এবং পরবর্তী সময়ে পাকিস্তানের দাবির প্রধান বাহক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার ক্ষেত্রে জিন্নাহর ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ১৯৩৭ সালের পর তিনি উপলব্ধি করেন, শুধু অভিজাত ও সাংবিধানিক রাজনীতির দল হিসেবে মুসলিম লীগকে রেখে বৃহত্তর মুসলিম জনসমাজের রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব দাবি করা সম্ভব নয়। এখান থেকেই শুরু হয় সংগঠনকে নতুনভাবে সাজানোর চেষ্টা।
১৯৩৭ সালের প্রাদেশিক নির্বাচন ছিল জিন্নাহ ও মুসলিম লীগের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তব পরীক্ষা। এই নির্বাচনের ফল দেখিয়ে দেয়, মুসলিম লীগ তখনো ভারতীয় মুসলমানদের সর্বত্র একক রাজনৈতিক প্রতিনিধি নয়।
বিশেষ করে পাঞ্জাব ও বাংলার মতো মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রদেশে আঞ্চলিক মুসলিম রাজনৈতিক শক্তিগুলোর যথেষ্ট প্রভাব ছিল।
এখানেই জিন্নাহর রাজনৈতিক দক্ষতার আরেকটি দিক সামনে আসে। ব্যর্থতা তাকে থামায়নি; বরং তিনি মুসলিম লীগকে নতুনভাবে সংগঠিত করার দিকে মনোযোগ দেন। তিনি প্রাদেশিক মুসলিম নেতৃত্বের সঙ্গে সম্পর্ক বাড়ান, মুসলিম লীগের সংগঠন বিস্তৃত করেন এবং মুসলমানদের বিভিন্ন আঞ্চলিক রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষাকে একটি সর্বভারতীয় রাজনৈতিক দাবির সঙ্গে যুক্ত করার চেষ্টা করেন।
১৯৩৭ থেকে ১৯৪৬—এই ৯ বছরেই মুসলিম লীগের রাজনৈতিক অবস্থানে নাটকীয় পরিবর্তন আসে। গবেষণায় দেখা যায়, ১৯৩৭ সালের পর পাঞ্জাব, বাংলা ও অন্যান্য মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চলের বহু নেতা ধীরে ধীরে জিন্নাহর নেতৃত্বাধীন মুসলিম লীগের সঙ্গে যুক্ত হন। ১৯৪৬ সালের নির্বাচনের মধ্যে মুসলিম লীগ ব্রিটিশ ভারতের মুসলমানদের প্রধান রাজনৈতিক প্রতিনিধি হিসেবে প্রতিষ্ঠা পায়। এই পরিবর্তনই জিন্নাহর সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক সাফল্যগুলোর একটি।
১৯৪০: লাহোর প্রস্তাব—পাকিস্তানের জন্ম কি সেদিনই?
২৩ মার্চ ১৯৪০ লাহোরে মুসলিম লীগের অধিবেশনে যে প্রস্তাব গৃহীত হয়, তা ইতিহাসে ‘লাহোর প্রস্তাব’ নামে পরিচিত। পরবর্তী সময়ে এটি জনপ্রিয়ভাবে ‘পাকিস্তান প্রস্তাব’ নামে পরিচিত হয়। কিন্তু ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য এখানে প্রায়ই হারিয়ে যায়—লাহোর প্রস্তাবে ‘Pakistan’ (পাকিস্তান) শব্দটি ছিল না।
প্রস্তাবে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ উত্তর-পশ্চিম ও পূর্বাঞ্চলীয় অঞ্চলগুলোকে পৃথক রাজনৈতিক একক হিসেবে সংগঠিত করার কথা বলা হয়েছিল। পরবর্তী রাজনৈতিক বিকাশে এই ধারণা আরো নির্দিষ্ট হয়ে পাকিস্তানের দাবিতে রূপ নেয়।
১৯৪৬ সালের মধ্যে অবশ্য রাজনৈতিক ভাষা আরো স্পষ্ট হয়। পাকিস্তান তখন আর শুধু অস্পষ্ট সাংবিধানিক পুনর্বিন্যাসের ধারণা ছিল না; মুসলিম লীগের রাজনৈতিক দাবির কেন্দ্রে স্বাধীন রাষ্ট্রের প্রশ্ন চলে আসে। ১৯৪৬ সালের ক্যাবিনেট মিশনও স্বীকার করেছিল যে মুসলিম লীগ পূর্ণ সার্বভৌম পাকিস্তানের দাবিতে অটল ছিল। অর্থাৎ, ১৯৪০ থেকে ১৯৪৭—এই সাত বছরকে একসঙ্গে না দেখলে পাকিস্তান দাবির বিবর্তন বোঝা যায় না।
জিন্নাহর ঐতিহাসিক অবদানকে কয়েকটি স্তরে দেখা যায়। প্রথমত, তিনি মুসলমানদের রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের প্রশ্নকে সর্বভারতীয় সাংবিধানিক রাজনীতির কেন্দ্রে নিয়ে আসেন।
দ্বিতীয়ত, ১৯২৯ সালের চৌদ্দ দফার মতো দলিলের মাধ্যমে মুসলিম রাজনৈতিক দাবিকে একটি সুসংগঠিত সাংবিধানিক রূপ দেন। তৃতীয়ত, মুসলিম লীগকে ধীরে ধীরে সর্বভারতীয় রাজনৈতিক সংগঠনে পরিণত করেন। চতুর্থত, মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রদেশগুলোর আঞ্চলিক রাজনীতিকে সর্বভারতীয় মুসলিম রাজনৈতিক দাবির সঙ্গে যুক্ত করেন। পঞ্চমত, ১৯৪০ সালের পর পাকিস্তানের দাবিকে ব্রিটিশ সরকার ও কংগ্রেস—উভয়ের সঙ্গে সাংবিধানিক দর-কষাকষির কেন্দ্রীয় প্রশ্নে পরিণত করেন। ষষ্ঠত, ১৯৪৬ সালের নির্বাচনের পর মুসলিম লীগের রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব এমন পর্যায়ে পৌঁছে যে ব্রিটিশ সরকারও তাকে মুসলিম স্বার্থের প্রধান প্রতিনিধি হিসেবে বিবেচনা করে।
এ কারণেই জিন্নাহকে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার ‘প্রধান রাজনৈতিক স্থপতি’ বলা ঐতিহাসিকভাবে যথেষ্ট যুক্তিযুক্ত। তবে এটিও সমানভাবে সত্য—পাকিস্তান কোনো একজন মানুষের একক সৃষ্টি ছিল না।
এটি ছিল মুসলিম লীগের সংগঠন, অসংখ্য মুসলিম নেতাকর্মীর রাজনৈতিক প্রচেষ্টা, প্রাদেশিক রাজনীতি, আল্লামা ইকবালের বুদ্ধিবৃত্তিক প্রভাব, ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক কাঠামো, কংগ্রেস-লীগের সাংবিধানিক সংঘাত এবং ভারতীয় মুসলমানদের একটি বড় অংশের রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষার সম্মিলিত ফল।
বাংলার ইতিহাস ভারত ও পাকিস্তানের বৃহত্তর দ্বন্দ্বের ভেতরেও ছিল স্বতন্ত্র।
বাংলা ছিল মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রদেশ, কিন্তু কলকাতা ছিল অর্থনীতি, বন্দর, শিল্প, বাণিজ্য ও প্রশাসনের প্রধান কেন্দ্র। পূর্ববাংলার কৃষি ও পাটনির্ভর অর্থনীতি কলকাতাকেন্দ্রিক বাণিজ্যিক ব্যবস্থার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত ছিল। তাই ১৯৪৭ সালে বাংলা ভাগ হলে অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের আশঙ্কাও ছিল। এই বাস্তবতা থেকেই উঠে আসে ‘অবিভক্ত বাংলার ধারণা’।
১৯৪৭ সালের শেষপর্যায়ে অবিভক্ত বাংলার একটি স্বাধীন রাজনৈতিক কাঠামোর প্রস্তাব সামনে আসে। বাংলার তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী এবং আবুল হাশিম এ উদ্যোগে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেন। শরৎচন্দ্র বসুও এর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। জিন্নাহও অন্তত একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে অবিভক্ত বাংলার সম্ভাবনাকে সমর্থন করেছিলেন।
২৬ এপ্রিল ১৯৪৭ লর্ড মাউন্টব্যাটেনের সঙ্গে সাক্ষাতে জিন্নাহকে অবিভক্ত বাংলা পাকিস্তানের বাইরে স্বাধীন থাকলেও তা নিয়ে ইতিবাচক অবস্থান প্রকাশ করতে দেখা যায়।
Cambridge-এর সাম্প্রতিক গবেষণায়ও উল্লেখ আছে যে জিন্নাহ বাংলা বিভাজন ঠেকাতে United Bengal ধারণাকে সমর্থন করেছিলেন।
তবে এটিকে এমনভাবে বলা যাবে না যে জিন্নাহ শেষ পর্যন্ত স্বাধীন অবিভক্ত বাংলার জন্য সর্বশক্তি নিয়োগ করেছিলেন এবং অন্যরা একতরফাভাবে তা নষ্ট করে দেয়।
কারণ, United Bengal পরিকল্পনার ভেতরেও ছিল গভীর রাজনৈতিক অবিশ্বাস, হিন্দু-মুসলিম নেতৃত্বের পারস্পরিক সন্দেহ, ক্ষমতার ভবিষ্যৎ কাঠামো নিয়ে দ্বন্দ্ব এবং সময়ের তীব্র সংকট।
কেন অবিভক্ত বাংলা টেকেনি, এ প্রশ্নের উত্তর একাধিক স্তরে খুঁজতে হবে।
প্রথমত, ১৯৪৬ সালের সাম্প্রদায়িক সহিংসতা বাংলার সামাজিক আস্থাকে ভয়াবহভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছিল।
দ্বিতীয়ত, কলকাতা ও পশ্চিম বাংলার হিন্দু রাজনৈতিক নেতৃত্বের বড় একটি অংশ মনে করছিল, অবিভক্ত বাংলা পাকিস্তানের অধীনে গেলে তাদের রাজনৈতিক ও সামাজিক নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়বে।
তৃতীয়ত, কংগ্রেসের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব স্বাধীন অবিভক্ত বাংলার পরিকল্পনাকে গ্রহণ করেনি। চতুর্থত, মুসলিম লীগের ভেতরেও অবিভক্ত বাংলা নিয়ে পূর্ণ ঐকমত্য ছিল না। পঞ্চমত, ব্রিটিশ সরকার দ্রুত ক্ষমতা হস্তান্তরের পথে এগিয়ে যাচ্ছিল; ফলে দীর্ঘ আলোচনার জন্য সময় দ্রুত সংকুচিত হচ্ছিল। ফলে অবিভক্ত বাংলার ধারণা রাজনৈতিকভাবে সম্ভাবনাময় হলেও বাস্তবে তা একটি কার্যকর সর্বসম্মত সমাধানে পরিণত হতে পারেনি।
১৯৪৭ সালের ৩ জুন ব্রিটিশ সরকার ক্ষমতা হস্তান্তরের পরিকল্পনা ঘোষণা করে।
বাংলা ও পাঞ্জাবের ক্ষেত্রে পরিকল্পনাটি ছিল বিশেষ। আইনসভা মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ ও অমুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চলের প্রতিনিধিদের পৃথক অংশে বসে প্রদেশ ভাগ হবে কি নাÑসে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে।
সেদিন বাংলার আইনসভায় একাধিক ধাপে ভোট হয়। প্রথম যৌথ অধিবেশনে অবিভক্ত বাংলা থাকলে নতুন পাকিস্তানি গণপরিষদে যোগ দেবে কি না—এই প্রশ্নে ভোট হয়। ফল ছিল ‘১২৬ বনাম ৯০’—অর্থাৎ, যৌথভাবে বসা আইনসভার সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্য অবিভক্ত বাংলা হলে পাকিস্তানের গণপরিষদে যাওয়ার পক্ষে ছিলেন। এরপর পৃথক অধিবেশনে পশ্চিম বাংলার প্রতিনিধিরা ‘৫৮-২১’ ভোটে বাংলা ভাগের পক্ষে মত দেন। পূর্ববাংলার প্রতিনিধিরা ‘১০৬-৩৫’ ভোটে বাংলা ভাগের বিরোধিতা করেন এবং পরে ‘১০৭-৩৪’ ভোটে পাকিস্তানের গণপরিষদে যোগ দেওয়ার পক্ষে মত দেন।
এই সংখ্যাগুলো ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ সত্য সামনে আনে—বাংলার পুরো আইনসভা একসঙ্গে বসে সরাসরি ‘বাংলা ভাগ’ করার পক্ষে ভোট দেয়নি।
বিভাজনের প্রশ্নটি নির্ধারিত হয়েছিল পৃথক আঞ্চলিক ভোটের কাঠামোর মধ্য দিয়ে।
এটি ছিল ৩ জুনের ক্ষমতা হস্তান্তর পরিকল্পনার নির্ধারিত সাংবিধানিক পদ্ধতির অংশ।
অতএব, ২০ জুনের ঘটনাকে ‘জিন্নাহর নির্দেশে বাংলা ভাগ’—এই এক বাক্যে ব্যাখ্যা করলে ইতিহাসের প্রক্রিয়াটি অদৃশ্য হয়ে যায়।
এই প্রশ্নের উত্তর যদি একজনের নাম দিয়ে দিতে হয়, তাহলে ইতিহাসকে ছোট করা হবে। জিন্নাহ পাকিস্তান আন্দোলনের প্রধান রাজনৈতিক নেতা ছিলেন—এটি সত্য।
তিনি ব্রিটিশ ভারতের মুসলমানদের রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব ও সাংবিধানিক নিরাপত্তার প্রশ্নকে সর্বভারতীয় রাজনীতির কেন্দ্রে নিয়ে এসেছিলেন—এটিও সত্য।
কিন্তু বাংলার ক্ষেত্রে ১৯৪৭ সালে তার অবস্থান সরল ছিল না। তিনি অবিভক্ত বাংলার সম্ভাবনাকে সমর্থন করেছিলেন—এটিও দলিলসমর্থিত।
অন্যদিকে, কংগ্রেসের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব স্বাধীন অবিভক্ত বাংলাকে গ্রহণ করেনি। বাংলার হিন্দু রাজনৈতিক নেতৃত্বের বড় একটি অংশ বাংলা ভাগের পক্ষে যায়। মুসলিম লীগের ভেতরেও মতভেদ ছিল। সাম্প্রদায়িক সহিংসতা রাজনৈতিক আস্থাকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছিল। ব্রিটিশ সরকার দ্রুত ক্ষমতা হস্তান্তরের সিদ্ধান্ত নেয়। ৩ জুনের পরিকল্পনা প্রাদেশিক বিভাজনের সাংবিধানিক পথ তৈরি করে। ২০ জুন বাংলার আইনসভায় নির্ধারিত পদ্ধতিতে ভোট হয়। এরপর বাউন্ডারি কমিশন সীমান্ত নির্ধারণ করে।
সুতরাং, ইতিহাসের ভাষায় বলা অধিকতর সঠিক—বাংলা ভাগ ছিল বহু রাজনৈতিক শক্তির সংঘাত, সাম্প্রদায়িক অবিশ্বাস, নিরাপত্তাহীনতা, ক্ষমতার হিসাব, প্রাদেশিক স্বার্থ এবং ব্রিটিশ ক্ষমতা হস্তান্তর প্রক্রিয়ার সম্মিলিত ফল।
পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর ইতিহাসের আরেকটি অধ্যায় শুরু হলো। পূর্ববাংলা ছিল পাকিস্তানের জনসংখ্যার দিক থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কিন্তু রাষ্ট্রের প্রশাসনিক, সামরিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতার ভারসাম্য ছিল অন্যরকম।
ধর্মীয় পরিচয় ছিল অভিন্ন। কিন্তু ভাষা, সংস্কৃতি, অর্থনীতি, প্রশাসনিক প্রতিনিধিত্ব, প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসন এবং ক্ষমতার কাঠামো নিয়ে পার্থক্য ছিল গভীর। এ ক্ষেত্রে ১৯৪৮ সালের ভাষার প্রশ্ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
১৯৪৮ সালে ঢাকায় এসে জিন্নাহ পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রভাষা হিসেবে উর্দুর পক্ষে অবস্থান নেন। এটি ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ সত্য। কিন্তু তার বক্তব্যকে এমনভাবে উপস্থাপন করাও ঠিক নয় যে তিনি প্রাদেশিক পর্যায়ে জনগণের নিজস্ব ভাষার ব্যবহারের অধিকার পুরোপুরি অস্বীকার করেছিলেন।
কিন্তু রাজনৈতিক বাস্তবতা ছিল আরো গভীর। পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের মাতৃভাষা ছিল বাংলা। ফলে কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রভাষা হিসেবে শুধু উর্দুর অবস্থান পূর্ববাংলায় স্বাভাবিকভাবেই গভীর রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। এখানেই ভাষা একটি সাংস্কৃতিক প্রশ্ন থেকে রাজনৈতিক অধিকার ও রাষ্ট্রীয় প্রতিনিধিত্বের প্রশ্নে পরিণত হয়।
এখানে সময়ের সীমারেখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জিন্নাহ ১৯৪৮ সালের ১১ সেপ্টেম্বর মৃত্যুবরণ করেন। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন এবং ২১ ফেব্রুয়ারির গুলিবর্ষণের সময় তিনি জীবিত ছিলেন না। তাই ১৯৫২ সালের রাষ্ট্রীয় গুলিবর্ষণের প্রত্যক্ষ দায় তার ওপর আরোপ করা ইতিহাসসম্মত নয়।
কিন্তু তার ১৯৪৮ সালের রাষ্ট্রভাষাসংক্রান্ত অবস্থান পূর্ববাংলার ভাষা-রাজনীতির প্রাথমিক সংঘাতের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল—এ কথাও অস্বীকার করা যায় না।
অর্থাৎ, ঐতিহাসিক প্রভাব এবং প্রত্যক্ষ দায় এক জিনিস নয়। ইতিহাসের ন্যায়বিচার করতে হলে এই পার্থক্যটি বজায় রাখতে হয়।
এখন আমরা আবার ফিরে আসতে পারি সেই ছবিটির কাছে। একটি ছবি কি শুধু একটি ছবি? হয়তো না। কারণ, একটি ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বের ছবি টাঙানো মানে অনেক সময় সেই ব্যক্তিকে ঘিরে থাকা ইতিহাসকেও জনপরিসরে উপস্থিত করা। কেউ জিন্নাহকে পাকিস্তান আন্দোলনের নেতা হিসেবে দেখবেন। কেউ তাকে ব্রিটিশ ভারতের মুসলমানদের রাজনৈতিক অধিকারের অন্যতম প্রধান প্রবক্তা হিসেবে দেখবেন। কেউ তার দ্বিজাতি তত্ত্বের সমালোচনা করবেন। কেউ তার ১৯৪৮ সালের ভাষানীতির সমালোচনা করবেন। আবার কেউ তার সাংবিধানিক রাজনীতি, রাজনৈতিক দৃঢ়তা ও পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার নেতৃত্বকে গুরুত্ব দেবেন। এই ভিন্ন ভিন্ন মূল্যায়ন রাজনৈতিক সমাজে থাকতেই পারে। কিন্তু ঐতিহাসিক তথ্য বদলে দেওয়া যায় না।
জিন্নাহকে দেবতা বানানোর প্রয়োজন নেই। আবার তাকে খলনায়ক বানিয়েও ইতিহাস পূর্ণতা পায় না। তাহলে? তিনি ছিলেন ব্রিটিশ ভারতের মুসলমানদের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক নেতা। তিনি মুসলমানদের রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব, সাংবিধানিক নিরাপত্তা, প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসন এবং মুসলিম ধর্মীয়-সাংস্কৃতিক অধিকারের প্রশ্নকে দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিকভাবে সামনে এনেছেন। জিন্নাহ পাকিস্তান আন্দোলনের ‘প্রধান রাজনৈতিক স্থপতি’—এটি তার ঐতিহাসিক অবস্থান।
কিন্তু তার ইতিহাস এখানেই শেষ নয়। বাংলাকে কোনো পক্ষের ফুটনোট হিসেবে দেখলে ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশটাই বাদ পড়ে যায়। বাংলার নিজস্ব ইতিহাস ছিল।
এখানে ছিল মুসলিম কৃষকসমাজের রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা। ছিল জমিদারি ও অর্থনৈতিক বৈষম্যের প্রশ্ন। ছিল কলকাতাকেন্দ্রিক বাণিজ্যিক অর্থনীতি। ছিল পূর্ববাংলার পাটনির্ভর কৃষি অর্থনীতি। ছিল ভাষা ও সংস্কৃতির স্বাতন্ত্র্য। ছিল হিন্দু-মুসলিম সহাবস্থান। ছিল সাম্প্রদায়িক রাজনীতির উত্থান। ছিল সোহরাওয়ার্দী, আবুল হাশিম, শরৎচন্দ্র বসু, কিরণশঙ্কর রায়সহ বহু আঞ্চলিক নেতার নিজস্ব রাজনৈতিক হিসাব। ছিল অবিভক্ত বাংলার স্বপ্ন। আবার ছিল বাংলা ভাগের ভয় ও নিরাপত্তাহীনতা। এসব প্রবাহের সংঘাতেই ১৯৪৭ সালে বাংলা বিভক্ত হয়। আর সেই বিভাজনের ভেতর থেকেই জন্ম নেয় ১৯৭১।
১৯৪৭-কে শেষ অধ্যায় ভাবলে ভুল হবে। ১৯৪৭ ছিল একটি নতুন অধ্যায়ের শুরু।
পূর্ববাংলা পাকিস্তানের অংশ হলো। তারপর ভাষার প্রশ্ন উঠল। ভাষা থেকে সংস্কৃতির প্রশ্ন। সংস্কৃতি থেকে রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের প্রশ্ন। রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব থেকে প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসনের প্রশ্ন। স্বায়ত্তশাসন থেকে অর্থনৈতিক ন্যায্যতার প্রশ্ন। আর শেষ পর্যন্ত সেই ধারাবাহিকতা স্বাধীনতার দাবিতে এসে পৌঁছাল। অবশেষে ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্ম হলো। অর্থাৎ, ১৯৪৭ এবং ১৯৭১—দুটি আলাদা ঘটনা হলেও তারা সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন নয়। একটির ভেতরে অন্যটির অনেকগুলো কারণ ও রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার বীজ নিহিত ছিল।
আজ জিন্নাহর একটি ছবি হয়তো আমাদের মনে করিয়ে দিচ্ছে—আমরা ইতিহাসকে কীভাবে দেখি? আমরা কি শুধু আমাদের পছন্দের অংশটুকু স্মরণ করব? জিন্নাহর রাজনৈতিক অবদান বলব, কিন্তু তার ভাষানীতি বলব না? তার মুসলিম রাজনৈতিক অধিকার রক্ষার ভূমিকা বলব, কিন্তু তার রাজনৈতিক তত্ত্বের সমালোচনা করব না?
কংগ্রেসের ভুল বলব, কিন্তু মুসলিম লীগের রাজনৈতিক কৌশলের সমালোচনা করব না? অথবা উল্টোভাবে, জিন্নাহর সমালোচনা করতে গিয়ে তার রাজনৈতিক অবদানই অস্বীকার করব?
এ দুটিই ইতিহাসের প্রতি অবিচার। ইতিহাস কোনো আদালতের রায় নয়, যেখানে একজনকে সম্পূর্ণ নির্দোষ এবং আরেকজনকে সম্পূর্ণ অপরাধী বানিয়ে ফাইল বন্ধ করে দেওয়া যায়।
ইতিহাস হলো কারণ ও পরিণতির দীর্ঘ সম্পর্ক। তাই আজ জিন্নাহর একটি ছবি আমাদের সামনে যে প্রশ্নটি ছুড়ে দেয়, সেটি শুধু—‘ছবিটি থাকবে কী থাকবে না?’—এত সরল নয়। প্রশ্নটি আরো গভীর।
আমরা কি ইতিহাসকে আমাদের পছন্দমতো স্মরণ করতে চাই, নাকি ইতিহাসের অস্বস্তিকর সত্যগুলোও পাশাপাশি রেখে তাকে বুঝতে চাই? জিন্নাহকে বুঝতে হলে তার পাকিস্তান আন্দোলনের নেতৃত্বকে স্বীকার করতে হবে।
একই সঙ্গে বুঝতে হবে, পাকিস্তানের ধারণার পেছনে ছিল ব্রিটিশ ভারতের মুসলমানদের রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব, সাংবিধানিক নিরাপত্তা ও ক্ষমতার ভারসাম্য নিয়ে দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রাম। কিন্তু প্রমাণ ছাড়া প্রতিটি ঘটনাকে ‘ষড়যন্ত্র’ বলা যাবে না।
বাংলার ইতিহাস শুধু ভারত-পাকিস্তানের ইতিহাসের একটি অধ্যায় নয়; বাংলার মানুষের নিজস্ব রাজনৈতিক, ভাষিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক অভিজ্ঞতারও ইতিহাস। ১৯৪৭ সালে বাংলা ভাগ হয়েছিল। কিন্তু ইতিহাস সেখানেই শেষ হয়নি।
বরং সেই বিভাজনের মধ্য দিয়েই এমন একটি নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার জন্ম হয়েছিল, যার ভেতর দিয়ে ভাষা আন্দোলন, স্বায়ত্তশাসনের সংগ্রাম, গণঅভ্যুত্থান, নির্বাচনি ম্যান্ডেট এবং শেষ পর্যন্ত ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের পথ তৈরি হয়।
তাই জিন্নাহকে শুধু একটি ছবিতে বন্দি করা যায় না। তাকে বুঝতে হলে ১৯১৬ সালের লখনৌ চুক্তি থেকে ১৯২৯ সালের ১৪ দফা, ১৯৩০ সালে ইকবালের প্রস্তাব, ১৯৩৭ সালের নির্বাচন, ১৯৪০ সালের লাহোর প্রস্তাব, ১৯৪৬ সালের ক্যাবিনেট মিশন, ১৯৪৭ সালের বাংলা বিভাজন এবং ১৯৪৮ সালের ভাষার প্রশ্ন—সবকিছুকে একই ঐতিহাসিক ধারায় দেখতে হবে।
যে মানুষটি ব্রিটিশ ভারতের মুসলমানদের রাজনৈতিক অধিকার ও প্রতিনিধিত্বের অন্যতম প্রধান নেতা ছিলেন, তাকে সেই ইতিহাসে তার যথাযথ জায়গায় রাখতে হবে। যে নেতা পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছেন, তার সেই অবদানও স্বীকার করতে হবে।
যে সিদ্ধান্ত পূর্ববাংলায় রাজনৈতিক ও ভাষাগত প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে, সেটিকেও তার যথাযথ প্রেক্ষাপটে রাখতে হবে।
ইতিহাসের প্রতি ন্যায়বিচার মানে কাউকে দেবতা বানানো নয়। আবার কাউকে মুছে ফেলাও নয়। ইতিহাসের প্রতি ন্যায়বিচার হলোÑযে যার জায়গায় তাকে রাখা; অবদানকে অবদান হিসেবে, ভুলকে ভুল হিসেবে, সিদ্ধান্তকে তার প্রেক্ষাপটে এবং পরিণতিকে তার বাস্তবতায় দেখা।
একটি রাষ্ট্রের জন্ম কখনো একজন মানুষের হাতে লেখা একক গল্প নয়। এটি বহু মানুষের সিদ্ধান্তের ফল। বহু রাজনৈতিক সংঘাতের ফল। বহু স্বপ্নের ফল। বহু ভুলের ফল। বহু আপসের ফল। কখনো কখনো বহু ব্যর্থ সমঝোতারও ফল।
আর সেই কারণেই জিন্নাহ এই দীর্ঘ ইতিহাসের একজন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র; কিন্তু তিনি পুরো ইতিহাস নন। ইতিহাস তার চেয়েও বড়। আর সেই বড় ইতিহাসের নাম—উপমহাদেশের মানুষ, তাদের রাজনীতি, তাদের অধিকার, তাদের ভয়, তাদের স্বপ্ন এবং তাদের রক্তে লেখা রাষ্ট্রগুলোর জন্মকথা।



