ইট-পাথরের নগরী ঢাকা। চারদিকে সুউচ্চ ভবন, ব্যস্ত সড়ক, যানবাহনের শব্দ আর মানুষের ছুটে চলা। কংক্রিটের এই নগর জীবনে দিনদিন কমে যাচ্ছে সবুজ, হারিয়ে যাচ্ছে পাখিদের নিরাপদ আশ্রয়। এমন বাস্তবতায় ঢাকা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের ছাদে গড়ে উঠেছে ‘আকাশ নীড়’ নামে ব্যতিক্রমী সবুজ ছাদবাগান।
পাখিদের প্রতি ভালোবাসা এবং নগরীর পরিবেশ রক্ষার ভাবনা থেকেই জেলা প্রশাসক ফরিদা খানমের উদ্যোগে তৈরি করা হয়েছে এই বাগান। শুধু গাছ লাগানো নয়, পাখিদের জন্য তৈরি করা হয়েছে নিরাপদ আশ্রয়, খাবার ও বিচরণের পরিবেশ। যেন কংক্রিটের নগরীর বুকের ওপর গড়ে উঠেছে পাখিদের ছোট্ট এক রাজ্য। ছাদবাগানে প্রবেশ করতেই চোখে পড়ে একটি সাইনবোর্ডÑ‘পাখির রাজ্যে স্বাগতম’। পুরো আয়োজনটির নাম দেওয়া হয়েছে আকাশ নীড়। নামের সঙ্গে মিশে আছে এর উদ্দেশ্য। আকাশের কাছাকাছি এই সবুজ নীড়ে পাখিরা এসে বসবে, ডাকবে, বাসা বাঁধবেÑএমনই প্রত্যাশা ঢাকা জেলা প্রশাসকের।
ছাদবাগানে ইতোমধ্যে প্রায় ৪৫০ প্রজাতির গাছ লাগানো হয়েছে। ফুল, ফল ও নানা ধরনের শোভাবর্ধনকারী গাছ দিয়ে সাজানো হয়েছে পুরো ছাদ। গাছের সারি, সবুজ পাতার আচ্ছাদন ও নানা রঙের ফুলে বদলে গেছে একসময়ের খালি কংক্রিটের ছাদ। তবে আকাশ নীড়-এর সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক হলো পাখিদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা। গাছের সঙ্গে বেঁধে দেওয়া হয়েছে পাখিদের থাকার উপযোগী হাঁড়ি। বাবুই পাখির বাসার আদলে তৈরি করা হয়েছে বিশেষ বাসা। এসব বাসা দেখে সহজেই বোঝা যায়, বাগানটি শুধু মানুষের চোখের সৌন্দর্যের জন্য নয়; বরং পাখিদের কথা মাথায় রেখেই সাজানো হয়েছে।
পাখিদের জন্য নিরাপদ আশ্রয় তৈরি করতে ছাদের বিভিন্ন অংশে খাঁচা ও প্রয়োজনীয় অবকাঠামো তৈরি করা হয়েছে। এসব কাঠামোয় রঙ করায় পুরো ছাদের সৌন্দর্য আরো বেড়ে গেছে।
জানা গেছে, আকাশ নীড় তৈরির কাজে ৫০-৬০ জন শ্রমিক বিভিন্ন সময়ে কাজ করেছেন। গাছ লাগানো, ছাদ সাজানো, গ্রিলের কাঠামো তৈরি, রঙ করা এবং অন্যান্য অবকাঠামোগত কাজ মিলিয়ে বেশ বড় পরিসরে কাজটি বাস্তবায়ন করা হয়েছে।
এরই মধ্যে ছাদবাগানে পাখিদের আনাগোনাও শুরু হয়েছে। ঘুঘু, কবুতর ও লাভ বার্ডসহ কিছু পাখি কিনে আনা হয়েছে। পাশাপাশি বাগানে রাখা হয়েছে খরগোশ। ফলে ছাদবাগানটি ধীরে ধীরে পশু-পাখির ছোট্ট আশ্রয়স্থলে পরিণত হচ্ছে। এখানেই শেষ নয়, সময়ের সঙ্গে বাগানে আরো পাখির আগমন ঘটবে। একই সঙ্গে তৈরি করা হবে পাখিদের জন্য উপযোগী পরিবেশ। ফুল ও ফলের গাছগুলো বড় হলে পাখিদের খাবার ও আশ্রয়ের সুযোগও বাড়বে বলে জানান সংশ্লিষ্টরা। আকাশ নীড় বাস্তবায়ন ও এর নিয়মিত পরিচর্যার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে ‘গ্রিন সেভারস’ নামে একটি প্রতিষ্ঠানকে। তাদের দায়িত্বের মধ্যে রয়েছেÑগাছের পরিচর্যা, পানি দেওয়া, বাগান পরিষ্কার রাখা এবং সার্বিক পরিবেশ রক্ষণাবেক্ষণ।
ছাদবাগান সম্পর্কে জেলা প্রশাসক ফরিদা খানম বলেন, ঢাকা শহর ক্রমেই কংক্রিটের নগরীতে পরিণত হচ্ছে। একসময় যে শহরে অসংখ্য গাছপালা, পুকুর, জলাশয় ও খোলা জায়গা ছিল; নগরায়ণের ফলে সেসব জায়গা দিনদিন কমে যাচ্ছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে আমাদের জীববৈচিত্র্যের ওপর। বিশেষ করে পাখিরা হারাচ্ছে তাদের নিরাপদ আশ্রয়, খাদ্য ও বাসা বাঁধার জায়গা।
এই বাস্তবতা থেকেই ঢাকা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের ছাদে আকাশ নীড় নামে পাখিবান্ধব ছাদবাগান গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর মূল উদ্দেশ্য শুধু সৌন্দর্যবর্ধন নয়; বরং নগর জীবনে পাখি ও অন্যান্য প্রাণীর জন্য একটি নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করা এবং মানুষকে প্রকৃতির সঙ্গে আরো নিবিড়ভাবে সম্পৃক্ত করা।
এই ছাদবাগানে পাখির জন্য বাসা, খাবার ও পানির ব্যবস্থা করা হয়েছে। আমরা চাই, ব্যস্ত নগরজীবনের মধ্যেও পাখিরা যেন নিরাপদে আশ্রয় নিতে পারে এবং মানুষ যেন প্রতিদিনের কর্মব্যস্ততার মাঝে প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগ করার সুযোগ পায়। ‘আকাশ নীড়’ নামকরণের ব্যাপারে জেলা প্রশাসক বলেন, আকাশ সবার জন্য। পাখিরাও এই শহরের অংশ। তাদের বেঁচে থাকার অধিকার রয়েছে। এই ছোট উদ্যোগের মাধ্যমে আমরা একটি সামাজিক বার্তা দিতে চাইÑশুধু সরকারি অফিসের ছাদ নয়, শহরের প্রতিটি ভবনের ছাদ ও বারান্দা যদি সবুজ করা যায়, তাহলে ঢাকা শহর আরো বাসযোগ্য ও প্রাণবন্ত হয়ে উঠবে।
তিনি বলেন, পাখি প্রকৃতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তারা পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করে, অনেক গাছের বীজ ছড়িয়ে দেয় এবং আমাদের পরিবেশকে প্রাণবন্ত রাখে। তাই পাখি সংরক্ষণ মানে শুধু পাখিকে রক্ষা করা নয়; বরং আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি সুন্দর ও ভারসাম্যপূর্ণ পরিবেশ নিশ্চিত করা।



