রবিবার, ১১ অক্টোবর, ২০২৬
২৫শে আশ্বিন, ১৪৩৩

ডেইলি বরিশাল

দক্ষিণাঞ্চলের শীর্ষস্থানীয় ও বস্তুনিষ্ঠ দৈনিক পত্রিকা

ধর্ম ও জীবন

কক্সবাজারে কেন গিয়েছিল তাজমিন, রাজুর সঙ্গে কী সম্পর্ক?

কক্সবাজারে কেন গিয়েছিল তাজমিন, রাজুর সঙ্গে কী সম্পর্ক?...

ন
নাজমুল ইসলাম· বিশ্লেষক
প্রকাশ: ১১ অক্টোবর ২০২৬, ৬:৩২ পিএমসর্বশেষ: ১১ অক্টোবর ২০২৬, ৬:৩২ পিএম
কক্সবাজারে কেন গিয়েছিল তাজমিন, রাজুর সঙ্গে কী সম্পর্ক?

কুমিল্লার ফসলি জমি থেকে লাশ উদ্ধারের আগে পর্যটননগরী কক্সবাজারে এসেছিল ১৫ বছর বয়সী কিশোরী তাজমিন। শহরটিতে এক রাত অবস্থান করে বাড়ি ফেরার পথেই ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডের শিকার হয় সে। কিন্তু কেন কক্সবাজার এসেছিল তাজমিন? সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরিচিত রিয়াজ উদ্দিন ওরফে রাজুর সঙ্গে তার সম্পর্ক কী ছিল? আর বাড়ি ফেরার পথে কীভাবে ঘটল এই নৃশংস ঘটনা? এসব প্রশ্ন এখন ঘুরপাক খাচ্ছে।

গত বৃহস্পতিবার সকালে কুমিল্লার লালমাই উপজেলার পেরুল উত্তর ইউনিয়নের জগতপুর উত্তরপাড়ার মানুমুড়া জঙ্গলসংলগ্ন জমি থেকে তাজমিনের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। পরে তদন্তে উঠে আসে, কক্সবাজারে এক রাত অবস্থান শেষে বাড়ি ফেরার পথে পদুয়ারবাজার থেকে সিএনজিচালিত অটোরিকশায় ওঠার পর চালক মো. সুমন মিয়ার (৩৫) ধর্ষণ ও হত্যার শিকার হয় কিশোরীটি। এ ঘটনায় গ্রেপ্তার সুমন আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, গত ৪ অক্টোবর এক বান্ধবীকে হাতঘড়ি দেওয়াকে কেন্দ্র করে মায়ের সঙ্গে তাজমিনের কথা-কাটাকাটি হয়। এরপর রাগ করে বাড়ি থেকে বেরিয়ে প্রথমে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় এক বান্ধবীর কাছে যায় সে। সেখান থেকে মুঠোফোনে রাজুর সঙ্গে যোগাযোগ করলে রাজু তাকে কক্সবাজারে আসার জন্য বিকাশের মাধ্যমে ৫০০ টাকা পাঠান। পরে কিশোরীটি কক্সবাজারে পৌঁছায়।

রাজুর সঙ্গে তাজমিনের পরিচয় হয়েছিল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামে বার্তা আদান-প্রদান এবং রিলস বিনিময়ের মধ্য দিয়ে তাদের ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয়। তবে তাদের পরিচয়ের সময়কাল নিয়ে ভিন্ন তথ্য পাওয়া গেছে। রাজুর এক সহকর্মীর দাবি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ১৭ দিন আগে তাদের পরিচয় হয়েছিল। অন্য একটি সূত্রের দাবি, পরিচয়ের সময়কাল প্রায় পাঁচ মাস।

রাজু প্রায় তিন বছর ধরে কক্সবাজার শহরের একটি আবাসিক হোটেলে কাজ করছেন। তাজমিনের সঙ্গে যোগাযোগের পর তার জন্য বাসের টিকিটের ব্যবস্থা করেন তিনি।

কক্সবাজার শহরের কলাতলীতে কুটুমবাড়ি-সংলগ্ন সড়কের শেষ মাথায় অবস্থিত তিনতলা একটি হোটেলের নথি ও সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা করে অনুসন্ধানকারীরা জানতে পারেন, গত ৬ অক্টোবর সন্ধ্যা ৭টা ২৫ মিনিটে রিয়াজ উদ্দিন ওরফে রাজুর সঙ্গে হোটেলটিতে ওঠে তাজমিন। সেখানে ৩০২ নম্বর কক্ষ ভাড়া নেওয়ার সময় নিজেদের স্বামী-স্ত্রী হিসেবে পরিচয় দেয় তারা। হোটেলের রেজিস্টারে কিশোরীর নাম লেখা হয় ‘তানজু আক্তার’ এবং বয়স উল্লেখ করা হয় ১৮ বছর। রাজুর পরিচয় দেওয়া হয় বান্দরবানের লামা এলাকার মনির আহমদের ছেলে হিসেবে।

হোটেলের এক কর্মী জানান, রেজিস্টার খাতায় রাজুর দুটি মোবাইল নম্বর ও একটি জাতীয় পরিচয়পত্রের (এনআইডি) নম্বর লেখা রয়েছে। এর মধ্যে একটি নম্বর পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য দেওয়া হয়েছিল। এক রাত অবস্থানের পর ৭ অক্টোবর বেলা ১১টার দিকে তারা হোটেল ছেড়ে চলে যান।

হোটেলের ফ্রন্ট ডেস্ক ব্যবস্থাপক মো. আবছার জানান, রাজুর জাতীয় পরিচয়পত্র নেওয়া হলেও তাজমিনের কোনো পরিচয়পত্র সংগ্রহ করা হয়নি।

অন্যদিকে, কক্সবাজার শহরের কলাতলীর একটি টিকিট কাউন্টারের পরিচালক আসহাব আব্দুল্লাহ সাংবাদিকদের জানান, মঙ্গলবার রাতে তাঁর পরিচিত ২০ বছর বয়সী এক তরুণ এক কিশোরীকে সঙ্গে নিয়ে টিকিট কাটতে এসেছিলেন। তরুণটি কিশোরীকে নিজের বান্ধবী বলে পরিচয় দিয়েছিলেন।

কক্সবাজারের ‘কক্সেস প্যানোরামিক ট্রাভেল অ্যান্ড ট্যুর’-এর কাউন্টার প্রতিনিধি মোহাম্মদ আবদুল্লাহ জানান, ৬ অক্টোবর রাত আটটার পর তাজমিন ও রাজু কাউন্টারে গিয়ে পরদিনের জন্য ‘আইকনিক এক্সপ্রেস’-এর বাসের টিকিট সংগ্রহ করেন। ৭ অক্টোবর দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে তাজমিনকে বাসে তুলে দেওয়া হয়।

রাজুর ভাষ্য অনুযায়ী, তাজমিনের পরিবারের সদস্যরা বারবার ফোন করায় তাকে বাড়ি ফিরে যেতে বলেন তিনি। বাসভাড়ার টাকা না থাকায় ধার করে টিকিট কাটেন এবং ৫০০ টাকা দিয়ে তাকে বাসে তুলে দেন। তবে অন্য একটি অনুসন্ধানী সূত্রে টিকিটের মূল্য ৯০০ টাকা বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

রাজুর দাবি, কুমিল্লায় পৌঁছানোর পর তাজমিন তাকে জানায়, বাড়ির ফটক বন্ধ রয়েছে। পরে রেলস্টেশনে এক ব্যক্তির সঙ্গে দেখা হওয়ার কথা জানিয়ে ওই ব্যক্তির বাসায় থাকার সিদ্ধান্তের কথাও বলে সে। এ নিয়ে দুজনের মধ্যে কথা-কাটাকাটি হয় বলে দাবি রাজুর।

রাজুর এক সহকর্মীর ভাষ্যমতে, কুমিল্লায় ফিরে অটোরিকশায় ওঠার পরও তাজমিনের সঙ্গে রাজুর ফোনে কথা হচ্ছিল। এমনকি অটোরিকশার চালককে নিয়েও তাদের মধ্যে কথা হয়। তবে রাত দেড়টার দিকে তাজমিনের ফোনের ‘লাইভ লোকেশন’ বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর তার সঙ্গে আর যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।

রাজুর দাবি, পরদিন সকালেও বহুবার ফোন করেও তাজমিনের সাড়া পাননি তিনি। পরে এক বান্ধবীর মাধ্যমে কিশোরীর মৃত্যুর খবর জানতে পারেন।

সিসিটিভি ফুটেজে দেখা গেছে, ৭ অক্টোবর রাত পৌনে ১২টার দিকে কুমিল্লার পদুয়ারবাজার বিশ্বরোডের হোটেল নূরজাহানের সামনে বাস থেকে নামে তাজমিন। এরপর শহরের রেসকোর্স এলাকার বাসায় যাওয়ার উদ্দেশ্যে সিএনজিচালিত অটোরিকশা ভাড়া করে সে।

পুলিশের তথ্যমতে, অটোরিকশাচালক সুমন মিয়া তাজমিনকে রেসকোর্সে না নিয়ে লালমাই উপজেলার ভোরালজগতপুর উত্তরপাড়ার একটি নির্জন স্থানে নিয়ে যান। সেখানে ধর্ষণের পর গলায় গামছা পেঁচিয়ে শ্বাসরোধ করে তাকে হত্যা করা হয়।

পরদিন, ৮ অক্টোবর সকালে ওই এলাকার একটি ধানখেতের আইল থেকে তাজমিনের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। পরে চট্টগ্রাম থেকে সুমনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তার দেখানো স্থান থেকে তাজমিনের ব্যবহৃত আইফোনও উদ্ধার করা হয়েছে।

হত্যার খবর জানার পর আত্মগোপনে রাজু?

তাজমিনের মৃত্যুর খবর জানার পর রাজু নিজেকে সম্পূর্ণ নির্দোষ দাবি করে কান্নাকাটি করেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। বর্তমানে তিনি হোটেল থেকে ছুটি নিয়ে অন্যত্র অবস্থান করছেন। তার ব্যবহৃত মোবাইল নম্বরটিও বন্ধ পাওয়া যাচ্ছে।

তবে রাজুর এসব দাবি ও অবস্থান সম্পর্কে স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তাজমিনের সঙ্গে তার সম্পর্ক এবং কক্সবাজারে অবস্থানের পুরো প্রেক্ষাপট খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

কিশোরী তাজমিনের মা কেয়া খাতুন সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, বৃহস্পতিবার বিকেলে মেয়ের সঙ্গে তাঁর শেষ কথা হয়েছিল। তবে তাজমিন নির্দিষ্ট কোনো তথ্য না দিয়ে শুধু এক বান্ধবীর বাসায় থাকার কথা বলেছিল। তিনি মেয়েকে বাড়িতে ফিরিয়ে আনতে চাইলেও তাজমিন কার কাছে আছে, তা স্পষ্ট না করায় তা সম্ভব হয়নি।

লালমাই থানার ওসি মিজানুর রহমান গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, এ ঘটনায় গ্রেপ্তার অটোরিকশাচালক সুমন আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। উদ্ধার করা মোবাইল ফোনের কলতালিকা ও অন্যান্য ডিজিটাল প্রমাণ বিশ্লেষণ করে অধিকতর তদন্ত চলছে।

তদন্ত শেষ হলে পুরো ঘটনার বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা সম্ভব হবে বলেও জানিয়েছেন এই পুলিশ কর্মকর্তা।

📢এই সংবাদটি শেয়ার করুন

📢 আপনিও হোন পাঠক সাংবাদিক!

আপনার এলাকার যেকোনো খবর, সমস্যা বা ভিডিও সরাসরি আমাদের নিউজ পোর্টালে জমা দিন

সংবাদ পাঠান ↗
ন

নাজমুল ইসলাম

বিশ্লেষক

রাজনৈতিক রিপোর্টার, বিশ্লেষক ও কলামিস্ট।

সম্পর্কিত আরও সংবাদ