শুক্রবার, ১৬ অক্টোবর, ২০২৬
১লা কার্তিক, ১৪৩৩

ডেইলি বরিশাল

দক্ষিণাঞ্চলের শীর্ষস্থানীয় ও বস্তুনিষ্ঠ দৈনিক পত্রিকা

জাতীয়

‘তারা বলেছিল ছোট দুর্ঘটনা, গিয়ে দেখি ধুলার মধ্যে ছেলের মরদেহ’

‘তারা বলেছিল ছোট দুর্ঘটনা, গিয়ে দেখি ধুলার মধ্যে ছেলের মরদেহ’...

ম
মুনতাসির মাহমুদ· বার্তা সম্পাদক
প্রকাশ: ১৬ অক্টোবর ২০২৬, ১০:২২ পিএমসর্বশেষ: ১৬ অক্টোবর ২০২৬, ১০:২২ পিএম
‘তারা বলেছিল ছোট দুর্ঘটনা, গিয়ে দেখি ধুলার মধ্যে ছেলের মরদেহ’

প্রতিদিনের মতো স্কুল ছুটির পর স্কুলবাসের অপেক্ষায় ছিল ৮ বছর বয়সী সাহরিয়ার শায়ন। এ সময় অন্য একটি স্কুলবাসের চাপায় ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়।

নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জের জলসিড়ি আবাসন প্রকল্পে অবস্থিত আদমজী ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজের সামনে গত মঙ্গলবার এ ঘটনা ঘটে। পরদিন সকালে পাবনার গ্রামের বাড়িতে শায়নকে দাফন করা হয়।

নিহত দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী শায়ন পাবনার আটঘরিয়া উপজেলার রামচন্দ্রপুর গ্রামের মো. সাজু আহম্মেদের ছেলে। রাজধানীর একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন সাজু। দুই সন্তানের মধ্যে শায়ন ছিল বড়। পরিবারটি ঢাকার খিলক্ষেতে বসবাস করে।

শায়নের পরিবার, স্কুল কর্তৃপক্ষ ও পুলিশের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দুর্ঘটনার সময় বাসটিতে চালকের সঙ্গে হেলপার ছিলেন না। হেলপার ছিলেন ক্যাম্পাসের গেটের বাইরে। দুর্ঘটনাস্থলে আরও কয়েকটি স্কুলবাস পার্ক করা ছিল। শিক্ষার্থীদের নিয়ে ঘাতক বাসটি মোড় ঘোরানোর সময় শায়নকে চাপা দেয়।

শায়নের বাবার অভিযোগ, বাসে হেলপার না থাকা এবং স্কুলবাস পরিচালনায় অব্যবস্থাপনার কারণে তার ছেলের মৃত্যু হয়েছে।সংবাদমাধ্যমকে সাজু বলেন, ‘সেদিন বিকেল পৌনে ৪টার দিকে স্কুল থেকে ফোন করে জানানো হয়, আমার ছেলে ‘‘মাইনর” দুর্ঘটনার শিকার হয়েছে। ধানমন্ডির কর্মস্থল থেকে মোটরসাইকেলে করে সঙ্গে সঙ্গে স্কুলে ছুটে যাই।

‘স্কুলে যখন পৌঁছাই, তখন বিকেল সাড়ে ৪টা। গিয়ে দেখি, দুর্ঘটনাটি ‘মাইনর’ নয়, ‘ফ্যাটাল ইনজুরি’। বাসের পেছনের চাকার পাশে ধুলার মধ্যে আমার ছেলের মরদেহ পড়েছিল’, বলেন তিনি।

সাজু আরও বলেন, ‘সেখানে সারি করে কয়েকটি বাস রাখা ছিল। প্রতিটি বাসের রুট আলাদা। আমার ছেলের বাসে তখনো সব শিক্ষার্থী ওঠেনি। তাই সে স্কুলব্যাগ বাসের ভেতরে রেখে বাইরে দাঁড়িয়ে ছিল।

তিনি বলেন, ‘সিসিটিভি ফুটেজে দেখা গেছে, দুর্ঘটনার সময় বাসটিতে কোনো হেলপার ছিলেন না। সেখানে একজন গ্রাউন্ড অ্যাটেনডেন্টও থাকার কথা ছিল। শিশুরা চলাফেরা করছিল, আর ওই জায়গা থেকে অনেক বাস চলাচল করে। হেলপার বা গ্রাউন্ড অ্যাটেনডেন্ট থাকলে চালক হয়তো বুঝতে পারতেন, বাসের কাছে কেউ আছে। এটাকে গাফিলতি, অবহেলা বা অব্যবস্থাপনা, যা-ই বলেন না কেন, তা তো ছিল।

দুর্ঘটনার সময় বাসটির হেলপার ক্যাম্পাস গেটের বাইরে ছিলেন বলে নিশ্চিত করেছেন আদমজী ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) ফেরদৌস হাসান।

ছেলের মরদেহ বাড়িতে নিয়ে যাওয়ার জন্য প্রতিষ্ঠানের কাছে লিখিত অঙ্গীকারনামা জমা দিতে হয়েছিল সাজুর। গত বুধবার সেটি ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ে। অঙ্গীকারনামায় ছেলের মৃত্যুর ঘটনায় আইনি ব্যবস্থা না নেওয়ার বিষয়ে সম্মতি দিতে হয়েছিল তাকে।

অঙ্গীকারনামায় বলা হয়, ‘এ ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে আমি কোনো আইনি প্রক্রিয়া বা ফৌজদারি মামলার আশ্রয় নেবো না। আমার সন্তান সাহরিয়ার শায়নের মরদেহ পাবনায় গ্রামের বাড়িতে নিয়ে দাফন করতে চাই। তার মৃত্যুর জন্য আমি ব্যক্তিগতভাবে কাউকে দায়ী করছি না।

তবে অঙ্গীকারনামার শেষাংশে লেখা ছিল, ‘স্কুল কর্তৃপক্ষ কর্তৃক সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে এ ঘটনার জন্য দায়ী ব্যক্তিকে শনাক্ত ও ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য বিনীত অনুরোধ করছি।

এ বিষয়ে সাজু বলেন, ‘আমার স্ত্রী অন্তঃসত্ত্বা। এমন সময়ে ছেলেটা মারা গেল। এরপর দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া ও মানসিক চাপ আমরা নিতে পারব না। তাই আমি ময়নাতদন্তে রাজি হইনি।

তিনি আরও বলেন, ‘দেশের বিচারব্যবস্থা ও পুলিশের তদন্তের ওপর আমার খুব বেশি আস্থা নেই। এ প্রক্রিয়ায় অনেক সময়ও লাগে। আমার সন্তান মারা গেছে। এর ওপর দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়ার চাপ সহ্য করার মতো অবস্থা আমাদের নেই।

সাজু আরও বলেন, ‘আমাকে বলা হয়েছিল, লিখিত অঙ্গীকারনামা জমা দিতে হবে। স্কুল কর্তৃপক্ষ যখন অঙ্গীকারনামা তৈরি করে, তখন সেখানে শুধু ‘‘বাস দুর্ঘটনা’’ লেখা ছিল। আমি তাদের সেটি পরিবর্তন করে ‘‘স্কুলবাস দুর্ঘটনা’’ লিখতে বলি।

শায়নের বাবা আরও বলেন, ‘অঙ্গীকারনামার শেষ লাইনটি আমি নিজেই যুক্ত করি। আমি ফৌজদারি আইনের আশ্রয় নিচ্ছি না। তবে প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে তদন্ত কমিটি গঠন করে কেউ দোষী থাকলে তাকে শনাক্ত করে শাস্তির আওতায় আনার অনুরোধ জানিয়েছি। একইসঙ্গে স্কুলবাস পরিচালনার ব্যবস্থাপনায় উন্নতি আনতে বলেছি, যাতে আর কোনো শিশুর এমন মর্মান্তিক মৃত্যু না হয়।

ময়নাতদন্ত ছাড়াই মরদেহ নেওয়ার ইচ্ছা জানিয়ে এবং মরদেহের দায়িত্ব বুঝে নেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করে পুলিশকেও একটি লিখিত বক্তব্য দেন সাজু।

স্কুলেই শায়নের মরদেহ গোসল করিয়ে কাফনের কাপড়ে মোড়ানো হয়। এরপর মরদেহ নেওয়া হয় খিলক্ষেতের বাসায়। সেখান থেকে ফ্রিজিং ভ্যানে করে দাফনের জন্য পাবনায় গ্রামের বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয়।

সাজু বলেন, ‘আমার সন্তানের মুখ দেখার মতো অবস্থায় ছিল না। আমি তার মা বা অন্য কাউকে মুখ দেখতে দিতে পারিনি। শুধু দাফন করার জন্যই তাকে বাড়িতে নিয়ে গেছি।

জানতে চাইলে অধ্যক্ষ ফেরদৌস হাসান সাংবাদিকদের বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের পরিবহনের জন্য আমরা চুক্তিভিত্তিক বাস ভাড়া করি। নিহত শিশুটি বাসে ব্যাগ রেখে বাইরে দাঁড়িয়ে ছিল। তখন চালকের হেলপার সেখানে ছিলেন না। চালক বাস ঘোরানোর সময় ধাক্কা লেগে শিশুটি চাপা পড়ে। এটি আমাদের জন্যও খুব মর্মান্তিক একটি ঘটনা।

তিনি আরও বলেন, ‘আমরা বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করছি। কী ভুল হয়েছিল এবং কেন এ ঘটনা ঘটেছে, তা খতিয়ে দেখা হবে। তদন্তের ফলাফলের ভিত্তিতে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

কী ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে, জানতে চাইলে অধ্যক্ষ ফেরদৌস হাসান বলেন, ‘চালক বা অন্য কারও অবহেলা প্রমাণিত হলে তাকে চাকরিচ্যুত করা হবে। এছাড়া আরও আইনি ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন কি না, সে বিষয়ে তদন্ত কমিটি সুপারিশ করবে।

জানতে চাইলে রূপগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এ এইচ এম সালাউদ্দিন বলেন, ‘এ ঘটনায় কোনো মামলা হয়নি। পরিবার আইনি ব্যবস্থা নিতে চায়নি এবং ময়নাতদন্ত করাতেও রাজি হয়নি।

তিনি আরও বলেন, ‘নিহতের পরিবারকেই আইনি প্রতিকার চাইতে হবে। তারা ময়নাতদন্ত করাতে চায়নি এবং জানিয়েছে, আইনি ব্যবস্থাও নেবে না। তারা পুলিশের সহায়তা চাইলে আমরা তা দেবো। যেকোনো সময় মামলা করা যেতে পারে। বিষয়টি এখানেই শেষ হয়ে যায়নি, সিদ্ধান্ত নেওয়ার বিষয়টি পরিবারের ওপর নির্ভর করছে।

📢এই সংবাদটি শেয়ার করুন

📢 আপনিও হোন পাঠক সাংবাদিক!

আপনার এলাকার যেকোনো খবর, সমস্যা বা ভিডিও সরাসরি আমাদের নিউজ পোর্টালে জমা দিন

সংবাদ পাঠান ↗
ম

মুনতাসির মাহমুদ

বার্তা সম্পাদক

নিউজরুম এডিটর, ডেইলি বরিশাল ডটকম। বার্তা বিভাগে অভিজ্ঞতা ৭ বছর।

সম্পর্কিত আরও সংবাদ