রাজধানীর সেগুনবাগিচায় শিল্পকলা একাডেমির উল্টোদিকের দেয়ালে সাংবাদিক ও সংগীতশিল্পী সঞ্জীব চৌধুরীর প্রতিকৃতি আঁকার পর তা মুছে ফেলেছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি)।
আইয়ুব বাচ্চু, আজম খানসহ আরও কয়েকজন শিল্পীর প্রতিকৃতি না থাকা নিয়ে প্রশ্ন ওঠার পর এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে সাংবাদিকদের জানিয়েছেন ডিএসসিসির প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা এয়ার কমডোর মো. মাহাবুবুর রহমান তালুকদার।
তবে দেয়ালে কোন শিল্পীদের প্রতিকৃতি থাকবে, কীভাবে তাদের নির্বাচন করা হয়েছে, এসব প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর পাওয়া যায়নি সংস্থাটির কর্মকর্তাদের বক্তব্যে।
সেগুনবাগিচায় শিল্পকলা একাডেমির গেটের বিপরীতে গণপূর্ত অধিদপ্তরের সীমানাপ্রাচীর-সংলগ্ন ফুটপাতটি হকারদের দখল থেকে মুক্ত করার পর সেখানে সৌন্দর্যবর্ধনের উদ্যোগ নেয় ডিএসসিসি। গত ৫ অক্টোবর ফুটপাতটির সৌন্দর্যবর্ধন কাজের উদ্বোধন করেন সংস্থাটির প্রশাসক মো. আবদুস সালাম।
এর অংশ হিসেবে দেয়ালে বাংলাদেশের শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে অবদান রাখা ব্যক্তিদের প্রতিকৃতি আঁকা হয়। তাদের মধ্যে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম, সাধক ফকির লালন শাহ, শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন, চলচ্চিত্রকার সত্যজিৎ রায়সহ ১০ গুণী ব্যক্তির প্রতিকৃতি রয়েছে।
একই দেয়ালে সঞ্জীব চৌধুরীর প্রতিকৃতি আঁকা হলেও পরে তা মুছে ফেলা হয়। গত মঙ্গলবার সেখানে নতুন করে আঁকা হয় নারী জাগরণের অগ্রদূত রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন, কবি জীবনানন্দ দাশ ও জসীমউদ্দীনের প্রতিকৃতি।
এর মধ্যে গত ১০ অক্টোবর দেয়ালে আঁকা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গ্রাফিতিতে কালি দেওয়ার ঘটনায় চারজনকে আটক করে পুলিশ। পরদিন তাদের বিরুদ্ধে শাহবাগ থানায় অপরাধমূলক ষড়যন্ত্র, বিভিন্ন শ্রেণির মধ্যে শত্রুতা উসকে দেওয়া এবং ধর্মীয় বিদ্বেষ ছড়ানোর অভিযোগে মামলা হয়। আদালত তাদের বিভিন্ন মেয়াদে রিমান্ডেও পাঠান।
রবীন্দ্রনাথের গ্রাফিতিতে কালি দেওয়ার পর একই দেয়ালে সঞ্জীব চৌধুরীর প্রতিকৃতিও মুছে ফেলার বিষয়টি সামনে আসে।
সঞ্জীব চৌধুরীর ছবি মুছে ফেলার বিষয়ে জানতে চাইলে ডিএসসিসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. খয়বর রহমান সাংবাদিকদের বলেন, আমি বিষয়টা সম্পর্কে অবগত নই। এ ব্যাপারে ডিএসসিসির প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা এয়ার কমডোর মো. মাহাবুবুর রহমান তালুকদার ভালো বলতে পারবেন।
জানতে চাইলে মাহাবুবুর রহমান সাংবাদিকদের বলেন, প্রতিকৃতি নির্বাচনের জন্য কোনো কমিটি গঠন করা হয়নি। ফুটপাত দখলমুক্ত করার পর জায়গাটির সৌন্দর্য বাড়াতে দেয়ালে প্রতিকৃতি আঁকার উদ্যোগ নেওয়া হয়।
তিনি আরও বলেন, আইয়ুব বাচ্চু, আজম খানসহ অন্য শিল্পীদের প্রতিকৃতি না থাকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল। এরপর পুরোনো ও তুলনামূলক বেশি অবদান রাখা শিল্পীদের এক জায়গায় এবং নতুন প্রজন্মের শিল্পীদের অন্য জায়গায় রাখার পরিকল্পনা হয়েছে।
এ প্রসঙ্গে তিনি নিজের অভিজ্ঞতা জানিয়ে বলেন, আমি নিজে সেখানে দাঁড়িয়ে ছিলাম। তখন একজন মোটরসাইকেল আরোহী এসে প্রশ্ন করেন, আইয়ুব বাচ্চুর কী দোষ? তার ছবি আঁকা হয়নি কেন? এরপর আমাদের অফিসেও এ নিয়ে ফোন এসেছে, অনেকে একই রকম কথা বলেছেন।
তবে প্রতিকৃতি নির্বাচনের জন্য কোনো কমিটি বা নির্দিষ্ট নীতিমালা ছিল না জানান তিনি। বলেন, ডিএসসিসির কয়েকজন কর্মকর্তা মিলে কাদের প্রতিকৃতি আঁকা হবে, এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
মাহাবুবুর রহমান বলেন, এখানে যারা পুরোনো এবং যাদের সংস্কৃতিতে মোটামুটি একটু বেশি অবদান আছে, তাদের প্রাধান্য দেওয়ার চেষ্টা করেছি।
তবে শিল্পীদের অবদান ও প্রবীণতার ভিত্তিতে তাদের আলাদা দেওয়ালে আঁকার সিদ্ধান্ত কীভাবে নেওয়া হয়েছে, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট কোনো মাপকাঠির কথাও জানাননি ডিএসসিসির এই কর্মকর্তা।
সঞ্জীব চৌধুরী ও আইয়ুব বাচ্চু সমসাময়িক শিল্পী হলে তাদের পুরোনো ও নতুন হিসেবে আলাদা করার ভিত্তি কী, জানতে চাইলে তিনি বলেন, একজনকে ওই দেয়ালে রাখলে তার সমসাময়িক অন্য শিল্পীদের কেন রাখা হয়নি, সে প্রশ্ন উঠতে পারে। তাই তাদের অন্য জায়গায় রাখার ব্যাপারে পরে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
তার ভাষ্য, পলাশী, নিউমার্কেট, আজিমপুর ও ঢাকা কলেজ এলাকায় নতুন প্রজন্মের শিল্পীদের প্রতিকৃতি আঁকা হবে। সেখানে সঞ্জীব চৌধুরীসহ অন্য শিল্পীদেরও রাখা হবে।
সঞ্জীবের প্রতিকৃতি আঁকার আগে কেন এই পরিকল্পনা নেওয়া হয়নি, জানতে চাইলে তিনি বলেন, উদ্যোগটি নেওয়ার সময় বিষয়টি নিয়ে আমরা গভীরভাবে চিন্তা করিনি।
মাহাবুবুর রহমান বলেন, আমরা তো এখানে কিছু না-ও দিতে পারতাম। শহরের জন্য ভালো লাগার মতো কিছু একটা করি, দেখি না কেমন হয়, এই চিন্তা থেকেই করা। এত কিছু গভীরভাবে চিন্তা করিনি।
সঞ্জীবের প্রতিকৃতি মুছে ফেলার সিদ্ধান্তের পেছনে রাজনৈতিক বা অন্য কোনো চাপ ছিল কি না, জানতে চাইলে মাহাবুবুর রহমান বলেন, আইয়ুব বাচ্চু বা আজম খানের প্রতিকৃতি আঁকা কিংবা সঞ্জীবের ছবি মুছে ফেলার জন্য কেউ চাপ দেয়নি। দেয়ালে জায়গার সীমাবদ্ধতা এবং শিল্পীদের আলাদা জায়গায় রাখার পরিকল্পনা করা হয়েছে।
একজন শিল্পীর প্রতিকৃতি আঁকার পর অন্যদের ছবি না থাকার প্রশ্নে সেটি মুছে ফেলাই সমাধান কি না, জানতে চাইলে মাহাবুবুর রহমান বলেন, সঞ্জীবকে অবমাননা করা আমাদের উদ্দেশ্য নয়। তাকে অন্য জায়গায় আরও সম্মানজনকভাবে উপস্থাপন করা হবে।
কিন্তু কোথায়, কখন এবং কী পরিকল্পনায় সঞ্জীবের প্রতিকৃতি আবার আঁকা হবে, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট কোনো সময়সীমা জানাননি তিনি।
ডিএসসিসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. খয়বর রহমান সাংবাদিকদের বলেন, আমার নির্দেশনা ছিল, দেয়ালে বিতর্কিত কোনো ব্যক্তির প্রতিকৃতি না এঁকে গ্রাফিতি করা যেতে পারে।
সঞ্জীব চৌধুরীকে বিতর্কিত ব্যক্তি হিসেবে বিবেচনা করেন কি না, জানতে চাইলে তিনি বলেন, তাকে বিতর্কিত বলছি না। কী কারণে এটা মুছে ফেলা হয়েছে, সে ব্যাপারে আমার জানা নেই। প্রতিকৃতি আঁকার কাজ শেষ হওয়ার পর সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা আমাকে ও প্রশাসনের কর্মকর্তাদের বিষয়টি জানান। এরপর তারা গিয়ে কাজটি উদ্বোধন করেন।
তিনি আরও বলেন, প্রতিকৃতি আঁকার সময় বা পরে সেটি মুছে ফেলার বিষয়ে আমাকে জানানো হয়নি। বিষয়টি নিয়ে আমি খোঁজ নেবো।



