ধর্ম নিয়ে অবমাননাকর মন্তব্যের অভিযোগ এনে সাতক্ষীরার দেবহাটায় ওয়াহিদুজ্জামান শামীমকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় ভূমিকা রেখেছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুক। অভিযোগ ছড়িয়ে দেওয়া থেকে শুরু করে শামীমকে শনাক্ত করা, লোকজন জড়ো করা, সহিংসতায় উসকানি দেওয়া এবং মৃত্যুর পর হত্যাকাণ্ডের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরতেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমটি ব্যবহার করা হয়েছে।
১৩ থেকে ১৫ অক্টোবরের মধ্যে প্রকাশিত ৩৩টি ফেসবুক পোস্ট বিশ্লেষণ করে এসব তথ্য পেয়েছেসংবাদমাধ্যম।
বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ধর্ম অবমাননার অভিযোগ কীভাবে শাস্তির দাবিতে রূপ নেয় এবং পরে শামীমের মৃত্যুকে ঘিরে উল্লাস, হত্যাকাণ্ডের পক্ষে যুক্তি, হুমকি ও হামলাকারীদের কর্মকাণ্ডের প্রশংসা ছড়িয়ে পড়ে।
তবে শামীমই এ ধরনের সহিংসতার একমাত্র শিকার নন। ২০২৫ সালের অক্টোবরেও একই উপজেলায় ধর্ম অবমাননার অভিযোগে এক তরুণকে পিটুনি দেওয়া হয়েছিল।
শামীমের পরিবারের ভাষ্য, গত ১২ অক্টোবর স্ত্রীর সঙ্গে তার কথোপকথনের একটি অডিও রেকর্ডিং ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ে। এই দম্পতির মধ্যে ঝগড়ার সময় কেউ কথোপকথনটি রেকর্ড করেছিলেন। ওই অডিওতে ধর্ম অবমাননাকর মন্তব্য রয়েছে, এমন অভিযোগ ছড়িয়ে পড়ার পর এলাকায় উত্তেজনা দেখা দেয়।
দেবহাটা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এইচ এম শাহীন জানান, ১৩ অক্টোবর বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে বাড়ির কাছের কুলিয়া বাজারে প্রথমে শামীমকে মারধর করেন কয়েকজন। পরে হামলাকারীরা তাকে স্থানীয় এক চিকিৎসকের চেম্বারে নিয়ে যান। সেখানে তাকে আবারও মারধর করা হয়।
সন্ধ্যা ৬টার দিকে পুলিশ শামীমকে উদ্ধার করে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যায়।
এক অনুসন্ধানে দেখা গেছে, রাত সাড়ে ৮টার দিকে স্থানীয় ধর্মীয় বক্তা ফজলুল হক আমিনীর নেতৃত্বে একটি মিছিল দেবহাটায় পৌঁছায়। মিছিল থেকে শামীমের 'ফাঁসির' দাবি জানানো হয়। রাত ৯টার দিকে আমিনী জনতার উদ্দেশে বক্তব্য দেন। এরপর ২০০ জনের বেশি মানুষকে নিয়ে তিনি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে যান।
সেখানে হামলাকারীরা শামীমকে টেনেহিঁচড়ে বের করে এনে আবারও মারধর করেন। চিকিৎসক, নার্স ও পুলিশ তাদের থামানোর চেষ্টা করলেও পারেননি।
রাত ১০টা ৪০ মিনিটের দিকে পুলিশ শামীমকে উদ্ধার করে সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যায়। তবে হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই তার মৃত্যু হয় বলে জানান চিকিৎসক মনোজ কুমার মণ্ডল।
পরিবারের ভাষ্য, শামীমের মানসিক সমস্যা ছিল। একটি মাদ্রাসা থেকে কামিল ডিগ্রি অর্জনের পর তিনি জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নেন। তার আট বছর বয়সী ও সাত মাস বয়সী দুটি সন্তান রয়েছে।সংবাদমাধ্যমের বিশ্লেষণ করা ফেসবুক পোস্টগুলো থেকে শামীমের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের সত্যতা স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা যায়নি।
শামীমের মৃত্যুর কয়েক ঘণ্টা আগেই ফেসবুকে প্রচার শুরু করেন আমিনী। ১৩ অক্টোবর বিকেল ৩টা ৩১ মিনিটে তিনি ফেসবুকে লাইভে এসে শামীমের বিরুদ্ধে ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তোলেন এবং শাস্তির দাবি জানান। তিনি শামীমের নাম উল্লেখ করে দেবহাটার পুটিমারি বাজারে তার অবস্থানের তথ্যও জানান।
১৯ মিনিট ১৯ সেকেন্ডের ওই লাইভ সম্প্রচারের পর বিকেল ৫টা ৩১ মিনিটে তিনি আরেকটি লাইভ করেন। প্রথম ভিডিওতে ২৮৬ ও দ্বিতীয়টিতে ১ হাজার ৬০০ প্রতিক্রিয়া পড়ে। কিন্তু দ্বিতীয় লাইভটি ৩ হাজার ৬০০ বার শেয়ার করা হয়।
দুই দিনে আমিনী ১২টি পোস্ট দেন। এসব পোস্টে উসকানি, হত্যাকাণ্ডের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরা এবং ভবিষ্যতে একই ধরনের অভিযোগে অভিযুক্তদেরও একই পরিণতির হুমকি দেওয়া হয়।
রাত ৯টা ১৫ মিনিটে শামীমকে 'মুরতাদ' আখ্যা দেন আমিনী। তিনি বলেন, ‘কোনো ক্ষমা নেই।’ ওই পোস্টেও শামীমের অবস্থান উল্লেখ করেন তিনি। পরে রাতে আরেকটি পোস্টে শামীমের মর্যাদাহানি করেন এবং তার জীবনকে ‘কই মাছের’ সঙ্গে তুলনা করেন। এর মাধ্যমে তিনি হয়তো আগের মারধরের পরও শামীমের বেঁচে যাওয়ার দিকে ইঙ্গিত করেন।
মধ্যরাত নাগাদ আমিনীর পোস্টের বিষয়বস্তু শামীমের বিরুদ্ধে অভিযোগ থেকে তার মৃত্যুর দিকে চলে যায়।
শামীমের মৃত্যুর খবর জানিয়ে আমিনী কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। প্রতিবেদন তৈরির সময় ওই পোস্টে ৮৭৯টি প্রতিক্রিয়া, ৪৪১টি মন্তব্য ও ২২৮টি শেয়ার ছিল। অন্য বেশ কিছু পোস্টেও একই ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। সেসব পোস্টে শামীমের মৃত্যুতে উছ্বাস প্রকাশ করা হয় এবং লোকজনকে তার জানাজায় অংশ না নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়।
আমিনীর শেষ পাঁচটি পোস্টে হত্যাকাণ্ডের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরার চেষ্টা দেখা যায়। এসব পোস্টের মধ্যে শামীমের পারিবারিক বিরোধের সময় ধারণ করা অডিও রেকর্ডিংও ছিল।সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে আমিনী বলেন, হামলার দুই দিন আগে প্রতিবেশীরা তাকে একটি অডিও ক্লিপ পাঠিয়েছিলেন। ওই ক্লিপে শামীম ধর্ম অবমাননাকর মন্তব্য করেছেন বলে অভিযোগ করেন তিনি।
দ্বিতীয় দফার হামলার সময় ঘটনাস্থলে উপস্থিত থাকার কথাও স্বীকার করেন আমিনী।
আমিনীর পোস্টের বাইরেও ফেসবুকে এ ঘটনার প্রতিক্রিয়া ছড়িয়ে পড়ে। বেশ কয়েকজন ব্যবহারকারী হত্যাকাণ্ডের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরেন। কেউ কেউ এটিকে অন্যদের জন্য সতর্কবার্তা হিসেবেও দেখান।
আরেকটি ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থেকে খবরটি শেয়ার করার আহ্বান জানানো হয়, যেখানে বলা হয় মহানবীর (সা.) ‘শত্রুরা’ যেন জানতে পারে যে তাদেরও একই পরিণতি হতে পারে। প্রতিবেদন তৈরির সময় ওই পোস্টে ৬১১টি প্রতিক্রিয়া, ১১৫টি মন্তব্য ও ২৫টি শেয়ার ছিল।
শামীমের মৃত্যুর পর আমিনীর পোস্টে মন্তব্য করা ৪৭৬ জনের মধ্যে প্রায় তিন-চতুর্থাংশই হত্যাকাণ্ডকে সমর্থন করেন বা এতে উছ্বাস প্রকাশ করেন।
অন্য কয়েকটি পোস্টে শামীমের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে ওঠা প্রশ্নকে খাটো করার চেষ্টা করা হয়। ১৫ অক্টোবরের একটি পোস্টে প্রশ্ন তোলা হয়, শামীমকে মানসিকভাবে অসুস্থ বলা হচ্ছে কেন। পোস্টটিতে আরও প্রশ্ন করা হয়, মানসিক অসুস্থতা থাকলে তিনি কীভাবে এমন মন্তব্য করতে পারেন?
আরেকটি পোস্টে শামীমের মানসিক অবস্থা নিয়ে প্রশ্ন তোলা ব্যক্তিদের উপহাস করা হয়। সেখানে বলা হয়, ধর্মীয় বিষয় নিয়ে আলোচনা করতে পারা তার মানসিক অসুস্থতার দাবিকে খণ্ডন করে। অন্য কয়েকটি অ্যাকাউন্টে জনতার কর্মকাণ্ডকে উসকানির বৈধ প্রতিক্রিয়া হিসেবে তুলে ধরে হামলাকারীদের প্রশংসা করা হয়।
আমিনীর প্রথম ফেসবুক লাইভ সম্প্রচার থেকে শামীমের মৃত্যু পর্যন্ত প্রায় ১০ ঘণ্টার মধ্যে কোনো গাফিলতি হয়নি বলে দাবি করেছে পুলিশ।
দেবহাটা থানার ওসি এইচ এম শাহীন বলেন, ‘পুলিশের কোনো গাফিলতি ছিল না। প্রথম দফার হামলার পর আমরা তাকে উদ্ধার করি এবং সতর্ক অবস্থানে ছিলাম।
পুলিশ জানিয়েছে, শামীমের বড় ভাই আবদুল জলিল সানার করা মামলায় দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তারা হলেন মোস্তফা হোসেন খান ও আসাদুল ইসলাম মোল্লা।
মামলার প্রধান অভিযুক্ত আমিনী এখনো পলাতক। তাকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।



