সোমবার বিকেল। ঘরের এক কোণে পড়ে থাকা ফুটবলটির দিকে মন খারাপ নিয়ে তাকিয়ে ছিল ১০ বছর বয়সী খালিদ আবদুল্লাহ (ছদ্মনাম)। তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী খালিদ ঘণ্টাখানেক আগেই স্কুল থেকে রাজধানীর শেওড়াপাড়ার বাসায় ফিরেছে।
কয়েক মাস আগে বাবার কিনে দেওয়া ফুটবলটি হাতে নিয়ে বারান্দায় যায় সে। নিচে তাকিয়ে দেখে, রাস্তায় গাড়ি, বাস ও রিকশার ভিড়। আশপাশে কোনো খেলার মাঠ নেই। ফুটবল নিয়ে ছুটে বেড়ানো কোনো শিশুও চোখে পড়ে না, যাদের সঙ্গে খেলতে পারবে সে।
ছেলের মন খারাপ দেখে মা তার হাতে একটি মুঠোফোন তুলে দেন, যাতে সে ভিডিও গেম খেলতে পারে।
খালিদের মতো ঢাকার অনেক শিশুরই একই অবস্থা। নগরীর বিভিন্ন এলাকা ক্রমেই ঘনবসতিপূর্ণ হয়ে উঠছে, হারিয়ে যাচ্ছে খেলার মাঠ। এর সঙ্গে স্কুল, কোচিং ও পড়াশোনার চাপে শিশুদের খেলাধুলার সুযোগও কমে আসছে।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, খেলাধুলা ও বিনোদনের জায়গার সংকট শুধু শিশুদের অবসর কাটানোর সুযোগই কমাচ্ছে না, তাদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের পাশাপাশি সামাজিক দক্ষতা বিকাশেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
২০২৪ সালে ইন্টারন্যাশনাল জার্নাল অব বিহেভিয়ারাল নিউট্রিশন অ্যান্ড ফিজিক্যাল অ্যাকটিভিটি সাময়িকীতে প্রকাশিত একটি পর্যালোচনামূলক গবেষণায় বলা হয়েছে, খেলার মাঠ শিশুদের শারীরিক সক্রিয়তা, মানসিক সুস্থতা, সামাজিক মেলামেশা ও চিন্তাশক্তির বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
গবেষকদের মতে, খেলার মাঠকে নগরজীবনের অপরিহার্য অবকাঠামো হিসেবে বিবেচনা করা উচিত। কারণ, এসব জায়গায় খেলাধুলার মাধ্যমে শিশুদের আত্মবিশ্বাস, সৃজনশীলতা, দলগতভাবে কাজ করার সক্ষমতা ও যোগাযোগের দক্ষতা গড়ে ওঠে।
তবে ঢাকার পরিস্থিতি বলছে, শিশুদের বিকাশে প্রয়োজনীয় এসব সুযোগ নিশ্চিত করার বিষয়টি যথেষ্ট গুরুত্ব পাচ্ছে না।
রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) সাম্প্রতিক বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা (ড্যাপ) অনুযায়ী, ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের ১২৯টি ওয়ার্ডের মধ্যে অন্তত ৪১টিতে কোনো পার্ক বা খেলার মাঠ নেই। এর মধ্যে ১০টি ঢাকা উত্তর সিটি (ডিএনসিসি) এবং ৩১টি ঢাকা দক্ষিণ সিটির (ডিএসসিসি) আওতাভুক্ত।
ড্যাপ ও সিটি করপোরেশনের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ডিএনসিসি এলাকায় প্রায় ৬০ লাখ বাসিন্দার জন্য ৯৫০টির বেশি পার্ক ও খেলার মাঠ প্রয়োজন। অন্যদিকে ডিএসসিসি এলাকায় ৪৩ লাখের বেশি বাসিন্দার জন্য প্রয়োজন প্রায় ৭০০টি পার্ক ও খেলার মাঠ।
গত ১৫ জুলাই জাতীয় সংসদে এক সংসদ সদস্যের প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জানান, ডিএনসিসির আওতায় মোট ১৮৯টি পার্ক, খেলার মাঠ ও উন্মুক্ত স্থান রয়েছে। এর মধ্যে ৩৮টি বর্তমানে দখলমুক্ত এবং পরিকল্পিত ব্যবস্থাপনার আওতায় রয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী আরও জানান, ইতোমধ্যে ২০টি পার্ক, চারটি খেলার মাঠ, দুটি শিশুপার্ক ও দুটি ঈদগাহ মাঠের উন্নয়নকাজ শেষ হয়েছে।
তিনি বলেন, ডিএসসিসি ও অন্যান্য সংস্থার আওতাধীন ২৫৬টি পার্ক ও খেলার মাঠ থেকে অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদ করা হয়েছে। এসব স্থাপনার উন্নয়ন ও রক্ষণাবেক্ষণের কাজ চলছে।
খেলাধুলা ও বিনোদনের পর্যাপ্ত জায়গা না থাকায় সন্তানদের বেড়ে ওঠা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন অভিভাবকেরা।
শেওড়াপাড়ার দুই সন্তানের মা রেহানা বেগম বলেন, ‘আমার সন্তানদের বাইরে গিয়ে খেলাধুলার কোনো সুযোগ নেই। তাদের জীবন এখন শুধু স্কুল, কোচিং আর মুঠোফোনের পর্দায় সীমাবদ্ধ।
তিনি জানান, তার দুই সন্তানই মুঠোফোন ও কম্পিউটারের পর্দায় অতিরিক্ত সময় কাটায়। অন্য শিশুদের সঙ্গে মেলামেশার সুযোগ পায় খুব কম।
রেহানা বলেন, ‘কংক্রিটের এই খাঁচায় বন্দি রেখে আমরা শিশুদের অসুস্থ করে তুলছি। আমি একেবারে অসহায় বোধ করি।
তার বড় সন্তানের দৃষ্টিশক্তি ও পেশি দুর্বল বলে জানান তিনি।
শিশুদের বাইরে খেলাধুলার সুযোগ কমে যাওয়ার প্রভাব সম্পর্কে জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের হেলাল উদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘নিরাপদ খেলার মাঠ বা উন্মুক্ত জায়গা না থাকায় অনেক শিশুর অবসর কাটানোর একমাত্র উপায় হয়ে উঠছে ডিজিটাল ডিভাইস।
তিনি বলেন, দীর্ঘদিন অতিরিক্ত সময় মুঠোফোন বা অন্য ডিজিটাল ডিভাইস ব্যবহারের ফলে শিশুদের ঘুমে ব্যাঘাত ঘটতে পারে, মেজাজ খিটখিটে হতে পারে। পাশাপাশি তাদের সামাজিক দক্ষতা ও আবেগের বিকাশও ধীরে ধীরে বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
শুধু মানসিক স্বাস্থ্য নয়, বাইরে খেলাধুলার সুযোগ কমে যাওয়ার প্রভাব পড়ছে শিশুদের শারীরিক স্বাস্থ্যের ওপরও।
বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের নবজাতক ও শিশুরোগ বিভাগের অধ্যাপক মাহবুবুল হক বলেন, বাইরে খুব কম সময় কাটানোর কারণে তাঁর কাছে চিকিৎসা নিতে আসা অনেক শিশুর মধ্যে ভিটামিন ডির ঘাটতি, স্থূলতা ও শারীরিক সক্ষমতার অভাব দেখা যায়।
তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রক্ষা করতে হলে আমাদের শিশুদের সুরক্ষা দিতে হবে। প্রতিদিন অন্তত এক ঘণ্টা তাদের বাইরে খেলাধুলা করতে দিতে হবে, অন্য শিশুদের সঙ্গে মেলামেশার সুযোগ দিতে হবে এবং মুঠোফোন ব্যবহারের সময় কমাতে হবে।
এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে রাজউকের প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ মো. আশরাফুল ইসলাম বলেন, ড্যাপে ভবিষ্যতে বিনোদনের জায়গা তৈরির জন্য সরকারি মালিকানাধীন ৫৫টি জমি চিহ্নিত করা হয়েছে। এরই মধ্যে দুটি নতুন পার্কের কাজ শুরু হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর মোট জায়গার ৬০ শতাংশ উন্মুক্ত রাখার নিয়ম রয়েছে। কিন্তু অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এখনো খেলার মাঠ ছাড়াই পরিচালিত হচ্ছে।
আশরাফুল ইসলাম স্বীকার করেন, অনেক পার্ক বাণিজ্যিক কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে। বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড (বিএনবিসি) অনুযায়ী পার্কের সর্বোচ্চ ৫ শতাংশ জায়গা কংক্রিটে আচ্ছাদিত রাখার সীমা থাকলেও অনেক পার্কে ২০ থেকে ৪০ শতাংশ জায়গা কংক্রিটে ঢেকে ফেলা হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মানদণ্ড অনুযায়ী, প্রত্যেক মানুষের জন্য অন্তত ৯ বর্গমিটার উন্মুক্ত জায়গা থাকা প্রয়োজন। অথচ ঢাকায় মাথাপিছু উন্মুক্ত জায়গা রয়েছে মাত্র শূন্য দশমিক ৬ বর্গমিটার।
আশরাফুল ইসলাম বলেন, বিদ্যমান পার্কগুলো রক্ষা করতে হবে, বাণিজ্যিক স্থাপনা সরাতে হবে, নতুন খেলার মাঠ তৈরি করতে হবে এবং আইন প্রয়োগ আরও জোরদার করতে হবে।
সরকারের সাম্প্রতিক উদ্যোগগুলোকে স্বাগত জানিয়ে বিশেষজ্ঞরা দখল হয়ে যাওয়া সব খেলার মাঠ পুনরুদ্ধারের আহ্বান জানিয়েছেন।
পাশাপাশি তারা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের খেলার মাঠ স্থানীয় শিশুদের ব্যবহারের সুযোগ দেওয়ার প্রস্তাব করেছেন। এ জন্য স্কুল ছুটির পর আশপাশের এলাকার শিশুদেরও এসব মাঠে খেলাধুলার সুযোগ দিতে ‘মাঠ ভাগাভাগি’ ব্যবস্থা চালুর পরামর্শ দিয়েছেন তারা।



