বিদেশে কাজ করে ঋণ শোধ করবেন, পরিবারের মুখে হাসি ফোটাবেন-এমন স্বপ্ন নিয়ে রাশিয়ায় পাড়ি জমিয়েছিলেন টাঙ্গাইলের গোপালপুর উপজেলার তিন যুবক। কিন্তু নির্মাণকাজের বদলে তাদের যেতে হয় রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধক্ষেত্রে।
স্বজনদের কাছে আসা খবর অনুযায়ী, ড্রোন হামলায় প্রাণ গেছে তিনজনেরই।
তারা হলেন- বীর নলহরা গ্রামের নজরুল ইসলাম, মজিদপুরের পবিত্র চন্দ্র সূত্রধর ও দক্ষিণ পাথালিয়া গ্রামের আমিনুল ইসলাম।
তাদের মৃত্যুতে শোকের পাশাপাশি ঋণের বোঝা, পাওনাদারদের চাপ ও জমি হারানোর আশঙ্কায় দিশেহারা পরিবারগুলো।
পরিবারের অভিযোগ, ৭ মে নির্মাণকাজের ভিসায় রাশিয়ায় যাওয়ার পর তাদের পাসপোর্ট ও মোবাইল ফোন কেড়ে নেওয়া হয়। পরে রাশিয়ার সেনাবাহিনীর হাতে তুলে দিয়ে যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানো হয়।
১৪ অক্টোবর স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) জানায়, জাবালে নূর, আরএস ইন্টারন্যাশনাল ও টিএস গ্রুপের মাধ্যমে যাওয়া ৩০ বাংলাদেশির প্রত্যেকের কাছ থেকে গড়ে ১০ লাখ টাকা নেওয়া হয়েছিল। ২১ দিনের সামরিক প্রশিক্ষণ শেষে তাদের যুদ্ধে পাঠানো হয়।
এসআরবির প্রাথমিক অনুসন্ধান অনুযায়ী, প্রতিপক্ষের অবস্থান শনাক্ত করতে বাংলাদেশিদের ‘টোপ’ হিসাবে ব্যবহার করা হতো। তাদের ওপর ড্রোন হামলা হলে হামলাকারীদের অবস্থান ও দূরত্ব শনাক্ত করা যেত। ওই ৩০ জনের মধ্যে ২০ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে।
জমি বন্ধক রেখে রাশিয়ায় নজরুল: নজরুল ইসলামের বাবা প্রয়াত ইসমাইল হোসেন। এর আগে সৌদি আরবেও গিয়েছিলেন তিনি। এবার রাশিয়ায় যেতে বড় ভাই উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া অবিভক্ত জমি বন্ধক রেখে ৯ লাখ টাকা জোগাড় করেন।
নজরুলের ভাতিজা মোহাম্মদ শিহাব জানান, ২৯ জুলাই চাচার সঙ্গে সর্বশেষ কথা হয়। সেদিন নজরুল বলেছিলেন, ‘আমাদের যুদ্ধে পাঠায় দিচ্ছে। আমার মাকে দেখে রাখিস, সন্তানদের দেখে রাখিস।
পরে সহযাত্রীদের কাছ থেকে তার মৃত্যুর খবর পায় পরিবার। প্রথম স্ত্রীর সঙ্গে বিচ্ছেদ হলেও তাদের ১৫ ও ১০ বছর বয়সি দুই ছেলের খোঁজখবর রাখতেন নজরুল। দ্বিতীয় স্ত্রীর ঘরে রয়েছে ১৫ মাসের মেয়ে ও ছয় মাসের ছেলে।
শিহাবের ভাষ্য, বন্ধক রাখা জমির টাকা ফেরত দিতে না পারলে জমির সমপরিমাণ অংশ নিয়ে নেওয়ার কথা বলছেন বন্ধকদাতা।
ঋণের চাপে পবিত্রর পরিবার : মজিদপুরের পরেশ চন্দ্র সূত্রধরের ছেলে পবিত্র চন্দ্র সূত্রধর পেশায় কাঠমিস্ত্রি ছিলেন। রাশিয়ায় যাওয়ার খরচ জোগাতে স্ত্রীর স্বর্ণালংকার বিক্রি করেন। পাশাপাশি বেসরকারি সংস্থা ও স্থানীয় মহাজনদের কাছ থেকে ঋণ নেন। সব মিলিয়ে প্রায় ১০ লাখ টাকা খরচ হয় বলে পরিবারের দাবি।
পবিত্রর স্ত্রী জয়া সূত্রধরের সঙ্গে সর্বশেষ যোগাযোগ হয় ২৯ মে। পরে সহযাত্রীদের কাছ থেকে তার মৃত্যুর খবর পান স্বজনেরা। তবে পবিত্র বেঁচে থাকতে পারেন, এমন আশাও ছাড়তে পারছেন না তারা।
পবিত্রর ভগিনীপতি তপন চন্দ্র সূত্রধর বলেন, ঋণদাতাদের চাপে ভাত খেতে বসেও তাগাদা শুনতে হয়। অবশিষ্ট তিন শতাংশ জমি বিক্রির কথা ভাবছে পরিবার। তাতেও ঋণ শোধ হবে কিনা, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।
পবিত্রর বাবা পরেশ চন্দ্র (৭৫) বলেন, ‘আমার ছেলে যদি মারা না যায়, তাহলে ছেলেকে ফেরত চাই। মারা গেলে লাশ চাই।’ কাজ করতে অক্ষম এই বৃদ্ধ সরকারের কাছে আর্থিক সহযোগিতা চেয়েছেন। পবিত্রর দুই মেয়ে প্রিয়ন্তী (১০) ও নীলা (৮)। তাদের পরিবারের সম্বল প্রায় পৌনে তিন কাঠা বসতভিটা।
শেষ ফোনে বাঁচানোর আকুতি : দক্ষিণ পাথালিয়া গ্রামের মরহুম কছর উদ্দিনের ছেলে আমিনুল ইসলাম আগে ব্যবসা করতেন। ব্যবসায় ক্ষতির কারণে তার ৫ থেকে ৬ লাখ টাকা ঋণ হয়েছিল বলে পরিবারের দাবি। পরে জমি বন্ধক ও ধারদেনা করে রাশিয়ায় যাওয়ার জন্য প্রায় ১০ লাখ টাকা জোগাড় করেন। স্ত্রী বিউটি বেগম ও দুই ছেলে এবং এক মেয়েকে রেখে বিদেশে যান তিনি।
আমিনুলের বড় ভাই কামরুল হাসান জানান, ২৯ মে ভোরে ভাইয়ের সঙ্গে সর্বশেষ কথা হয়। আমিনুল বলেছিলেন, ‘আমাদের যুদ্ধে পাঠাচ্ছে। এখানে ভয়াবহ অবস্থা। নিচে মাইন পাতা আর উপরে ড্রোন যাচ্ছে। যে কোনো সময় মারা যাইতে পারি। তোমরা সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ করে আমাদের বাঁচানোর চেষ্টা করো।
কামরুলের ভাষ্য, জামালপুরের আদনান নামের এক সহযাত্রী জানিয়েছেন, তাদের দলের ১৬ জনের মধ্যে ১২ জন মারা গেছেন। নিহতদের মধ্যে গোপালপুরের তিনজনও রয়েছেন। আদনানসহ চারজন আহত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন বলেও তাকে জানানো হয়।



