শনিবার, ২৪ অক্টোবর, ২০২৬
৯ই কার্তিক, ১৪৩৩

ডেইলি বরিশাল

দক্ষিণাঞ্চলের শীর্ষস্থানীয় ও বস্তুনিষ্ঠ দৈনিক পত্রিকা

লাইফস্টাইল ও জীবনধারা

আদালত বসেছিল সম্পত্তি বা টাকার জন্য নয়, দুই ভাইয়ের মায়ের জন্য বুকভরা ভালোবাসার: সউদীর এক অমর আইনি লড়াইয়ের সত্য গল্প

আদালত বসেছিল সম্পত্তি বা টাকার জন্য নয়, দুই ভাইয়ের মায়ের জন্য বুকভরা ভালোবাসার: সউদীর এক অমর আইনি লড়াইয়ের সত্য গল্প...

ম
মুনতাসির মাহমুদ· বার্তা সম্পাদক
প্রকাশ: ২৪ অক্টোবর ২০২৬, ৮:৪৮ এএমসর্বশেষ: ২৪ অক্টোবর ২০২৬, ৮:৪৮ এএম
আদালত বসেছিল সম্পত্তি বা টাকার জন্য নয়, দুই ভাইয়ের মায়ের জন্য বুকভরা ভালোবাসার: সউদীর এক অমর আইনি লড়াইয়ের সত্য গল্প

পৃথিবীর আদালতে প্রতিদিন কত শত মামলা ওঠে-সম্পত্তির ভাগবাটোয়ারা, টাকার লোভ, কিংবা অধিকার কেড়ে নেওয়ার দ্বন্দ্ব। বিচারকের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে মানুষে মানুষে চলে মুখ দেখাদেখি বন্ধ করার লড়াই। কিন্তু এমন একটি আদালতকক্ষ কি কেউ কখনো কল্পনা করতে পেরেছেন, যেখানে দুই ভাই কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে, চোখের জলে ভিজে বিচারকের কাছে প্রার্থনা করছেন- দয়া করে আমাদের মাকে আমাদের কাছে দিন, মায়ের সেবা করার সৌভাগ্যটুকু থেকে আমাদের বঞ্চিত করবেন না!

আজকের এই নিষ্ঠুর বাস্তবতায় যখন বৃদ্ধাশ্রমের ভারী দরজায় বাবা-মায়ের নিঃসঙ্গ দীর্ঘশ্বাস ঝরে, যখন সন্তান নিজের একটু স্বাচ্ছন্দ্যের জন্য মা-বাবাকে বোঝা মনে করে ফেলে- ঠিক তখন সউদী আরবের এই ঘটনাটি পুরো পৃথিবীকে স্তব্ধ করে দিয়েছে। মনে করিয়ে দিয়েছে ভালোবাসার প্রকৃত সংজ্ঞা।

সউদী আরবের এই মর্মস্পর্শী ভালোবাসার গল্পটি মূলত এক শতায়ু (প্রায় ১০০ বছর বা তদূর্ধ্ব বয়সী) বয়স্কা মাকে কেন্দ্র করে। দুই ভাই- বড় ভাই হিজাম আল-গামদি এবং তার ছোট ভাই- দুজনেই মরিয়া হয়ে উঠেছিলেন মায়ের দেখভাল করার দায়িত্ব নিতে। বড় ভাই হিজাম বছরের পর বছর ধরে নিজের সমস্ত জীবন মায়ের সেবায় উৎসর্গ করেছিলেন। বিয়ে পর্যন্ত করেননি, চাকরিও খোঁজেননি, মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকাটাই ছিল তার জীবনের একমাত্র শান্তি ও ধ্যানজ্ঞান।

অন্যদিকে ছোট ভাইও চুপ করে বসে ছিলেন না। তার যুক্তি ছিল- বড় ভাই বয়সের ভারে ক্লান্ত ও অসুস্থ হয়ে পড়েছেন, এখন তাঁর নিজেরই বিশ্রামের প্রয়োজন। তাই মায়ের দেখাশোনার দায়িত্ব যেন তাকে দেওয়া হয়।

যখন কোনোভাবেই দুই ভাইয়ের এই মধুর দ্বন্দ্বের মীমাংসা হচ্ছিল না, তখন বিষয়টি গড়ায় আদালত পর্যন্ত। বিচারকের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে দুই ভাইয়ের চোখে ছিল শুধু আকুতি- সম্পত্তি বা টাকার জন্য নয়, মা নামের পরম স্বর্গের অধিকার পাওয়ার আকুতি।

বিচারক যখন দেখলেন দুই ভাইয়ের কাউকে বোঝানো যাচ্ছে না, তখন তিনি খোদ সেই শতবর্ষী মাকে এজলাসে হাজির করার নির্দেশ দিলেন। বিচারক সস্নেহে বৃদ্ধা মায়ের কাছে জানতে চাইলেন, তিনি কার সাথে থাকতে চান-বড় ছেলের কাছে, নাকি ছোট ছেলের কাছে?

মায়ের চোখে তখন জল গড়িয়ে পড়ছে। তিনি বিচারককে উদ্দেশ করে কাঁপাপা কাঁপা কণ্ঠে যে কথাটি বললেন, তা শুনে উপস্থিত আইনজীবী, বিচারক এবং কাঠগড়ার মানুষগুলোর সবার বুক ফেটে কান্না এল। মা বললেন, বাবা বিচারক! আমার এক ছেলে আমার ডান চোখ, অন্য ছেলে আমার বাম চোখ। বলো, মানুষ কি কখনো নিজের দুই চোখের মধ্যে একটিকে বাদ দিতে পারে? আমি কাকে ছেড়ে কার কাছে যাব? দুজনেই আমার চোখের মণি!

মায়ের এই উত্তর পুরো আদালতকক্ষকে স্তব্ধ করে দেয়। কোনো সম্পত্তি বা স্বার্থের দ্বন্দ্ব নয়, এই লড়াই ছিল শুধুই অপরিসীম ভালোবাসা আর মায়ের সেবা পাওয়ার প্রতিযোগিতা।

শেষ পর্যন্ত বিচারক বাস্তবতার খাতিরে রায় দেন ছোট ভাইয়ের পক্ষে। কারণ ছোট ভাই তুলনামূলক তরুণ এবং তার নিজের পরিবার থাকায় মায়ের সেবায় আরও বেশি শারীরিক শক্তি ও সাহায্য নিশ্চিত করা সম্ভব ছিল। বড় ভাই হিজাম যখন এই রায় শুনলেন, তার চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ল-তবে তা কোনো ক্ষোভ বা হতাশার নয়, বরং মায়ের সেবার সৌভাগ্য হাতছাড়া হয়ে যাওয়ার সীমাহীন বেদনা থেকে। রায় ঘোষণার পর দুই ভাই কোনো বিবাদ নয়, বরং একে অপরকে বুকে জড়িয়ে ধরে অঝোরে কেঁদে ফেলেন।

আজকের এই আধুনিক সমাজে যেখানে একটু একটু করে শেকড় হালকা হয়ে যাচ্ছে, যেখানে সন্তান ব্যস্ত হয়ে পড়ে নিজের ক্যারিয়ার ও দুনিয়াবি সুখে-সেখানে এই সউদী ভাইদের ঘটনা আমাদের বিবেককে প্রবলভাবে নাড়া দিয়ে যায়।

যে সমাজে হাজারো মা-বাবা অবহেলায় চোখের জল ফেলেন, সেই একই দুনিয়াতে এমন সন্তানও রয়েছে যারা মায়ের একটু ছোঁয়া পাওয়ার জন্য, মায়ের পা দুটি টিপে দেওয়ার জন্য আদালতের কাঠগড়ায় বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে যায়।

তাই বলা যেতে পারে মহান সৃষ্টিকর্তার দরবারে, পৃথিবীতে প্রতিটি মা-বাবার কপালে যেন এমন সন্তানই জোটে। আর যে সন্তানরা আজ মা-বাবাকে দূরে ঠেলে দিয়েছে, এই গল্পটি যেন তাদের হৃদয়ের গভীরে গিয়ে আঘাত করে-কারণ মা-বাবা চলে গেলে দুনিয়ার সব আদালত খুঁজেও তাদের আর ফিরিয়ে আনা যায় না।

উল্লিখিত ঘটনাটি ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে সংঘটিত হয় সউদী আরবে, তবে এই ধরনের আরেকটি ঘটনা সেখানে ২০১২ সালেও ঘটেছিল।

শেষ পর্ব: ছোট তেলাপোকা দমনে কোন ওষুধ সবচেয়ে কার্যকর?

📢এই সংবাদটি শেয়ার করুন

📢 আপনিও হোন পাঠক সাংবাদিক!

আপনার এলাকার যেকোনো খবর, সমস্যা বা ভিডিও সরাসরি আমাদের নিউজ পোর্টালে জমা দিন

সংবাদ পাঠান ↗
ম

মুনতাসির মাহমুদ

বার্তা সম্পাদক

নিউজরুম এডিটর, ডেইলি বরিশাল ডটকম। বার্তা বিভাগে অভিজ্ঞতা ৭ বছর।

সম্পর্কিত আরও সংবাদ