দূর থেকে দেখলে মনে হবে সাধারণ দুই কন্যাশিশু; কিন্তু কাছে গেলেই চোখ আটকে যায় পা থেকে পেট পর্যন্ত একসঙ্গে জোড়া লাগানো ৮ মাস বয়সি যমজ বোন ঐহি আক্তার ও মাহি আক্তারের দিকে।
জন্মের পর থেকেই তাদের প্রতিটি নিঃশ্বাস, প্রতিটি নড়াচড়া যেন একে অপরের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িয়ে আছে। একজন কাঁদলে অন্যজনও কেঁদে ওঠে, একজন নড়লে অন্যজনও ব্যথায় কুঁকড়ে যায়।
চাঁদপুরের ফরিদগঞ্জ পৌর এলাকার ৪ নম্বর ওয়ার্ডের আওতাধীন পূর্ববড়ালী গ্রামের বাসিন্দা দিনমজুর মাসুদ ও সুমি দম্পতির ঘরে চলতি বছরের ৫ ফেব্রুয়ারি চাঁদপুর শহরের একটি প্রাইভেট হাসপাতালে জন্ম হয় এই বিরল যমজ শিশুর। পরবর্তীতে তাদের ঢাকা মেডিকেল কলেজে চিকিৎসা প্রদান করা হলেও অর্থাভাবে অস্ত্রোপচার করা সম্ভব হয়নি।
পরিবারের সদস্যরা জানান, চিকিৎসকরা আশা দিয়েছেন অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে শিশু দুটিকে আলাদা করা সম্ভব হতে পারে। তবে তার আগে প্রয়োজন একাধিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের নিবিড় পর্যবেক্ষণ এবং নিয়মিত চিকিৎসা। জন্মের তিন মাস পর আবার ঢাকায় নিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হলেও চরম আর্থিক সংকটের কারণে এখনো সেখানে যেতে পারেনি পরিবারটি।
শিশুদের বাবা মাসুদ বলেন, আমি কৃষিজমিতে দিনমজুরের কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করি। মাসে মাত্র ১০ থেকে ১২ হাজার টাকা আয়ে কোনোমতে সংসার চালাতে হয়। এরই মধ্যে শিশুদের দুধ, ওষুধ ও চিকিৎসার ব্যয় মেটাতে গিয়ে ঋণের বোঝাও বেড়েছে।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে মাসুদ বলেন, চিকিৎসকরা আশা দিয়েছেন, আমার মেয়েদের আলাদা করা সম্ভব; কিন্তু সেই চিকিৎসার খরচ বহন করার সামর্থ্য আমার নেই। আমার মেয়েদের চিকিৎসার জন্য প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দৃষ্টি কামনা করছি।
মা সুমি বলেন, ওদের আলাদাভাবে কোলে নেওয়া যায় না। একজন একটু নড়লেই অন্যজন কষ্ট পায়। চিকিৎসার জন্য নিয়মিত ঢাকায় যেতে হবে, কিন্তু যাতায়াত ও পরীক্ষার খরচ জোগানোর সামর্থ্য আমাদের নেই। এখন তাদের দুধ কেনার টাকাই জোগাড় করতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। সরকার তো অনেক মানুষকে অনেক কিছুই দেয়, আমার সন্তানদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করে দেওয়ার জন্য প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি কামনা করছি।
শিশুদের প্রতিবেশী আলী হোসেন মিজি বলেন, এই দুই শিশুকে বাঁচাতে হলে সরকার, সমাজের বিত্তবান মানুষ এবং মানবিক সংগঠনগুলোর এগিয়ে আসা জরুরি। সবার সহযোগিতা পেলে হয়তো ওরা স্বাভাবিক জীবন ফিরে পাবে।
উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা মাহমুদুল হাসান বলেন, শিশু দুটির পরিবার একেবারে দরিদ্র। আমাদের পক্ষ থেকে তাদের দুধ কেনার জন্য সামান্য অনুদান প্রদান ও সুবর্ণ নাগরিক কার্ড করে দেওয়া হয়েছে। তবে তাদের চিকিৎসা প্রয়োজন।
উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা আসাদুজ্জামান জুয়েল বলেন, জোড়া লাগা যমজ শিশু জন্ম নেওয়া অত্যন্ত বিরল একটি জন্মগত অবস্থা। চিকিৎসকদের পরামর্শ অনুযায়ী দ্রুত পরবর্তী চিকিৎসা শুরু করা জরুরি। যথাসময়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও বিশেষজ্ঞদের তত্ত্বাবধানে থাকলে শিশু দুটির চিকিৎসার সম্ভাবনা আরও উজ্জ্বল হবে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মেহেদী হাসান মানিক বলেন, আমি এ উপজেলায় সদ্য যোগদান করেছি। তাদের খোঁজখবর নিয়ে সহায়তার উদ্যোগ নেওয়া হবে। পাশাপাশি প্রয়োজনীয় সরকারি সহায়তা নিশ্চিত করার বিষয়েও কাজ করব।
দারিদ্র্যের সঙ্গে প্রতিনিয়ত লড়াই করা এই পরিবারের এখন একটাই স্বপ্ন—ঐহি আক্তার ও মাহি আক্তার একদিন আলাদা দুটি স্বাভাবিক জীবন পাবে। সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নে সরকারি সহায়তার পাশাপাশি সমাজের বিত্তবান ও মানবিক মানুষের সহযোগিতাই হতে পারে তাদের নতুন জীবনের সবচেয়ে বড় আশার আলো।



