মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর, ২০২৬
১২ই কার্তিক, ১৪৩৩

ডেইলি বরিশাল

দক্ষিণাঞ্চলের শীর্ষস্থানীয় ও বস্তুনিষ্ঠ দৈনিক পত্রিকা

জাতীয়

জুতো পালিশ থেকে ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট, যেভাবে লুলার উত্থান

জুতো পালিশ থেকে ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট, যেভাবে লুলার উত্থান...

ম
মুনতাসির মাহমুদ· বার্তা সম্পাদক
প্রকাশ: ২৭ অক্টোবর ২০২৬, ১২:২৫ পিএমসর্বশেষ: ২৭ অক্টোবর ২০২৬, ১২:২৫ পিএম
জুতো পালিশ থেকে ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট, যেভাবে লুলার উত্থান

ছোটবেলায় পরিবারের অভাব মেটাতে জুতো পালিশ করেছেন, রাস্তায় বিক্রি করেছেন চীনাবাদাম। জীবনের আরেক পর্যায়ে কারখানায় কাজ করতে গিয়ে হারিয়েছেন বাঁ হাতের কনিষ্ঠ আঙুল। শ্রমিকের অধিকার আদায়ের আন্দোলনে নেমে জেলেও গেছেন। একসময় দুর্নীতির মামলায় কারাবন্দি হয়েছিলেন। সেই মানুষটিই বারবার ফিরে এসেছেন রাজনীতির ময়দানে।

এবার চতুর্থবারের মতো ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছেন লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভা। তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচনে ডানপন্থি ফ্লাভিও বলসোনারোকে হারিয়ে আবারও দেশটির ক্ষমতায় ফিরেছেন ৮০ বছর বয়সী এই বামপন্থি নেতা।

তার বিজয়ের মাধ্যমে ব্রাজিলে ফিরলো বাম-ধারা। যেন ‘রক্ষা’ পেল লাতিন আমেরিকার ‘শেষ বাম-দুর্গ’।

বিবিসির তথ্য বলছে, এ নিয়ে চতুর্থবারের মতো নির্বাচনে জয় পেলেন লুলা। ২০০৩ সালের জানুয়ারি থেকে ২০১০ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত টানা দুই মেয়াদে প্রেসিডেন্ট ছিলেন তিনি। ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে তৃতীয়বারের মতো ক্ষমতায় ফেরেন।

তবে এবারের জয় সহজে আসেনি। গত ৪ অক্টোবর অনুষ্ঠিত প্রথম দফার ভোটে লুলার চেয়ে এগিয়ে ছিলেন বলসোনারো। ডানপন্থি এই প্রার্থীর ওপর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘আশীর্বাদ’ ছিল। তবে মাত্র ৩ সপ্তাহের ব্যবধানে সেই ফল উল্টে জয়ী হওয়া ছিল লুলার জন্য বড় রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ।

ব্রিটিশ দৈনিক দ্য গার্ডিয়ান ও মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএনের প্রতিবেদন অনুসারে, প্রথম দফার পর হতাশায় পড়া সমর্থকদের আবারও উজ্জীবিত করে নির্বাচনী কৌশল বদলে ফেলেন তিনি। শেষ পর্যন্ত প্রতিদ্বন্দ্বীর তুলনায় ৪৪ লাখেরও বেশি ভোট বেশি পেয়ে বা ৫১ দশমিক ৭৯ শতাংশ ভোট পেয়ে বিজয় নিশ্চিত করেন লুলা।

সিএনএনের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৮৫ সালে ব্রাজিলে সামরিক শাসনের অবসানের পর প্রথম দফায় পিছিয়ে থাকা কোনো প্রার্থী চূড়ান্ত ভোটে জয়ী হননি। লুলার এই জয় সেই ধারায় ব্যতিক্রম তৈরি করেছে। প্রথম ও দ্বিতীয় দফার মধ্যবর্তী সময়ে প্রায় এক কোটি অতিরিক্ত ভোট নিজের পক্ষে টানতে সক্ষম হন লুলা।

এই প্রত্যাবর্তনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে ব্রাজিলের দ্বিতীয় বৃহত্তম রাজ্য মিনাস জেরাইস। প্রথম দফায় সেখানে ৫ লাখ ৯০ হাজার ভোটে পিছিয়ে থাকলেও দ্বিতীয় দফায় কৌশলগত প্রচারণার মাধ্যমে ৯৯ হাজার ভোটের ব্যবধানে জয় পান বর্ষীয়ান এই নেতা।

ভোটারদের কেন্দ্রে আনা ও ভোটদানের হার বাড়ানোর কৌশলও কাজে দেয়। প্রথম দফায় ২১ দশমিক শূন্য ৮ শতাংশ ভোটার ভোট দেওয়া থেকে বিরত থাকলেও দ্বিতীয় দফায় এ হার কমে ১৯ দশমিক ২ শতাংশে নেমে আসে। এতে লুলার সমর্থকদের আরও বেশি সংখ্যায় ভোটকেন্দ্রে আনা সম্ভব হয়।

বিজয়ের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর প্রধান শহর সাও পাওলোর পলিস্তা অ্যাভিনিউ ও রিও ডি জেনেইরোর কোপাকাবানা সৈকতে উল্লাসে মেতে ওঠেন লাখো সমর্থক।

দারিদ্র্য থেকে শ্রমিকজীবনলুলার জীবনের শুরুটা ছিল চরম দারিদ্র্যের মধ্যে। ব্রাজিলের সরকারি জীবনবৃত্তান্ত ও দ্য গার্ডিয়ানের জীবনভিত্তিক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ১৯৪৫ সালের ২৭ অক্টোবর ব্রাজিলের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় পারনামবুকো রাজ্যের গরানহুনস শহরের এক দরিদ্র কৃষক পরিবারে জন্ম তার। বাবা আরিসতিদেস ইনাসিও দা সিলভা ও মা ইউরিদিস ফেরেইরা দে মেলোর ৮ সন্তানের মধ্যে তিনি ছিলেন সপ্তম।

খরা ও খাদ্যসংকটের মধ্যে সন্তানদের বাঁচাতে ১৯৫২ সালের ডিসেম্বরে লুলার মা ৮ সন্তানকে নিয়ে সাও পাওলোর উদ্দেশে রওনা হন। কাঠের তৈরি খোলা ‘পাও দে আরারা’ ট্রাকে ১৩ দিনের দীর্ঘ ও কষ্টকর যাত্রা শেষে তারা সেখানে পৌঁছান।

প্রথমে তারা উপকূলীয় শহর গুয়ারুজায় থাকেন। পরে ১৯৫৬ সালে সাও পাওলোর ইপিরানগা এলাকায় একটি সস্তা বারের পেছনের ঘরে আশ্রয় নেন। ঘরটি ছিল অত্যন্ত ঘিঞ্জি ও নোংরা। রাতে মাতালদের উৎপাতও সহ্য করতে হতো। সামান্য বৃষ্টি হলেই নর্দমা থেকে ঘরে ঢুকে পড়ত ইঁদুর ও ব্যাঙ।

পরিবারের অভাব দূর করতে ছোটবেলা থেকেই কাজ শুরু করেন লুলা। বিশ্বকোষ ব্রিটানিকার তথ্য বলছে—লুলা জুতো পালিশ করতেন, রাস্তায় চীনাবাদাম বিক্রি করতেন এবং বাড়ি বাড়ি চিঠি বিলি করতেন। ১৪ বছর বয়সে স্থানীয় এক স্ক্রু কারখানায় নিয়মিত শ্রমিক হিসেবে কাজ পান। পরে ৩ বছর মেয়াদি কারিগরি শিক্ষা নিয়ে মেকানিক্যাল টার্নার ও ধাতুশ্রমিকের ডিপ্লোমা অর্জন করেন।

সরকারি নথিতে বলা হয়েছে, ব্রাজিলের ইতিহাসে কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রি না থাকা প্রথম প্রেসিডেন্ট লুলা। অথচ তার শাসনামলে দেশটিতে মোট ১৪টি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়, যা ইতিহাসে সর্বোচ্চ। বিশ্বের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় থেকেও তিনি বহু সম্মানসূচক ডক্টরেট ডিগ্রি পান।

কারখানায় কাজ করতে গিয়েই শ্রমিকদের অধিকার নিয়ে সচেতন হয়ে ওঠেন লুলা। সংবাদমাধ্যম ভক্সের তথ্যচিত্র ও গার্ডিয়ানের স্মৃতিচারণামূলক প্রতিবেদন ‘হি হ্যাড ম্যাগনেটিজম’-এ তার শ্রমিক নেতা হয়ে ওঠার কাহিনি তুলে ধরা হয়েছে।

১৯৬০-এর দশকে সাও পাওলোর শিল্পাঞ্চল সাও বার্নার্দো দো কাম্পোর ভিলারেস মেটালওয়ার্কস কারখানায় কাজ করার সময় এক দুর্ঘটনায় বাঁ হাতের কনিষ্ঠ আঙুল হারান তিনি। সময়মতো চিকিৎসা না পাওয়া এবং মালিকপক্ষের অবহেলা শ্রমিকদের অধিকার নিয়ে তার ভাবনাকে আরও গভীর করে।

১৯৬৯ সালে হেপাটাইটিসে আক্রান্ত হয়ে প্রয়োজনীয় চিকিৎসার অভাবে প্রথম স্ত্রী মারা যাওয়ার পর ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলনে আরও সক্রিয় হন লুলা। বড় ভাই জোসে ফেরেইরা দা সিলভার অনুপ্রেরণায় স্থানীয় ধাতব শ্রমিক ইউনিয়নে যোগ দেন তিনি।

সরকারি নথি থেকে জানা যায়, ১৯৭৫ সালে ৯২ শতাংশ ভোট পেয়ে সাও বার্নার্দো দো কাম্পো ও দিয়াদেমা মেটালওয়ার্কার্স ইউনিয়নের সভাপতি নির্বাচিত হন লুলা। ওই সংগঠনটি প্রায় এক লাখ শিল্পশ্রমিকের প্রতিনিধিত্ব করত।

১৯৭৯ ও ১৯৮০ সালে সামরিক শাসনের নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে সাও বার্নার্দোর ভিলা ইউক্লিদেস স্টেডিয়ামে প্রায় ১ লাখ ৭০ হাজার শ্রমিককে নিয়ে ঐতিহাসিক ধর্মঘটে নেতৃত্ব দেন তিনি।

গার্ডিয়ানের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সে সময় মার্কিন সংবাদপত্র দ্য নিউইয়র্ক টাইমস তাকে ‘লাতিন আমেরিকার সবচেয়ে ক্ষমতাধর শ্রমিক নেতা’ হিসেবে অভিহিত করে। পোল্যান্ডের মুক্তিকামী নেতা লেখ ওয়ালেসার সঙ্গেও তার তুলনা করা হয়।

শ্রমিক আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়ার কারণে সামরিক সরকারের রোষানলেও পড়েন লুলা। জাতীয় নিরাপত্তা আইন লঙ্ঘনের অভিযোগে ১৯৮০ সালে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। টানা ৩১ দিন কারাগারে থাকতে হয়।

রাজনীতিতে উত্থান, পরাজয় ও ঘুরে দাঁড়ানোকারাগার ও শ্রমিক আন্দোলনের অভিজ্ঞতা লুলাকে রাজনীতির আরও কাছাকাছি নিয়ে আসে। বিবিসির তথ্য অনুযায়ী, ১৯৮০ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি অন্যান্য প্রগতিশীল শ্রমিক নেতা, বুদ্ধিজীবী, শিক্ষক ও সামাজিক আন্দোলনের প্রতিনিধিদের সঙ্গে নিয়ে বামপন্থি ওয়ার্কার্স পার্টি (পিটি) প্রতিষ্ঠা করেন তিনি। তখনো ব্রাজিলে সামরিক শাসন চলছিল।

তবে রাজনীতিতে শুরু থেকেই সাফল্য পাননি লুলা। ১৯৮২ সালে সাও পাওলোর গভর্নর নির্বাচনে হেরে রাজনীতি ছেড়ে দেওয়ার কথাও ভেবেছিলেন তিনি।

দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সে সময় কিউবার বিপ্লবী নেতা ফিদেল কাস্ত্রো তাকে হাভানায় ডেকে নিয়ে পরামর্শ দেন। কাস্ত্রো তাকে বোঝান, লাতিন আমেরিকার শ্রমিক ও মেহনতি মানুষের স্বার্থে রাজনীতি ছেড়ে দেওয়ার অধিকার তার নেই।

সেই পরামর্শের পর নতুন উদ্যমে রাজনীতিতে ফেরেন লুলা। ১৯৮৩ সালে সেন্ট্রাল ইউনিকা ডস ট্রাবালহাডোরেস (সিইউটি) গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। পরের বছর সরাসরি প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের দাবিতে ‘দিরেতাস জ্যা’ আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন। ১৯৮৬ সালে সংবিধান প্রণয়নের জন্য নির্বাচনে রেকর্ডসংখ্যক ভোট পেয়ে ফেডারেল ডেপুটি নির্বাচিত হন তিনি।

১৯৮৯ সালে ২৯ বছর পর ব্রাজিলে অনুষ্ঠিত প্রথম সরাসরি প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে অংশ নিয়ে চূড়ান্ত পর্বে অল্প ব্যবধানে হেরে যান লুলা। ১৯৯৪ ও ১৯৯৮ সালের নির্বাচনেও ফার্নান্দো হেনরিক কার্দোসোর কাছে পরাজিত হন।

টানা তিনবার পরাজয়ের পর লুলা বুঝতে পারেন, শুধু কট্টর বামপন্থি ভাবমূর্তি নিয়ে ব্রাজিলে ক্ষমতায় যাওয়া কঠিন। এজন্য মধ্যপন্থি ও ব্যবসায়ী মহলের সমর্থনও প্রয়োজন। সেই উপলব্ধি থেকেই ২০০২ সালের নির্বাচনে লিবারেল পার্টির প্রভাবশালী ব্যবসায়ী জোসে অলেনকারকে ভাইস প্রেসিডেন্ট পদে নিজের প্রার্থী হিসেবে বেছে নেন তিনি। এতে ব্রাজিলের রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ তৈরি হয়।

অবশেষে ২০০২ সালের ২৭ অক্টোবর, ৫৭ বছর বয়সে প্রায় ৫ কোটি ৩০ লাখ ভোট বা ৬১ দশমিক ৫ শতাংশ ভোট পেয়ে ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন লুলা।

সরকারি নথি ও বিবিসির প্রতিবেদন অনুযায়ী—ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত ব্রাজিল গড়া, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা আনা ও সামাজিক বৈষম্য কমানোর প্রতিশ্রুতি নিয়ে ক্ষমতায় আসেন তিনি।

সামাজিক কল্যাণে জোর, অর্থনীতিতে পরিবর্তনক্ষমতায় এসে অসচ্ছল পরিবারগুলোর জীবনমান উন্নয়নে ‘বোলসা ফ্যামিলিয়া’ নামে একটি সামাজিক কল্যাণ কর্মসূচি চালু করেন লুলা।

ভক্সের রাজনৈতিক বিশ্লেষণ ও তার জীবনবৃত্তান্ত থেকে আরও জানা যায়, আন্তর্জাতিক বাজারে কাঁচামাল ও কৃষিপণ্য রপ্তানি থেকে পাওয়া অর্থ কাজে লাগিয়ে এ কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হয়।

এর আওতায় দরিদ্র পরিবারগুলোকে সরাসরি নগদ অর্থ দেওয়া হতো। তবে এ সহায়তা পাওয়ার শর্ত ছিল, সন্তানদের নিয়মিত স্কুলে পাঠাতে হবে এবং স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিয়ে সময়মতো টিকা দিতে হবে।

সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদন অনুযায়ী, ‘বোলসা ফ্যামিলিয়া’ সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির ফলে ব্রাজিলের প্রায় ৩ থেকে ৪ কোটি মানুষ চরম দারিদ্র্য থেকে বেরিয়ে মধ্যবিত্ত শ্রেণিতে উন্নীত হন।

এর ফলে ব্রাজিলের অর্থনীতিতে আসে পরিবর্তন। ২০০৮ সালে আটলান্টিক মহাসাগরের গভীরে প্রে-সল্ট স্তরে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান পেট্রোব্রাসের বড় তেলক্ষেত্র আবিষ্কার ব্রাজিলের অর্থনীতিকে নতুন সম্ভাবনা এনে দেয়। আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক মন্দার প্রভাবও সামলে নেন লুলা। সে সময়ের পরিস্থিতিকে তিনি ব্রাজিলের জন্য সামান্য উন্নতি হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন।

২০০৬ সালে ৫ কোটি ৮০ লাখেরও বেশি ভোট পেয়ে দ্বিতীয় মেয়াদে নির্বাচিত হন লুলা। ২০০৯ সালে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা বিশ্বনেতাদের সামনে তার সঙ্গে করমর্দন করে বলেছিলেন, ‘তিনিই পৃথিবীর সবচেয়ে জনপ্রিয় রাজনীতিবিদ!

দুই মেয়াদে দায়িত্ব পালনের পর ২০১০ সালে প্রায় ৯০ শতাংশ জনসমর্থন নিয়ে ক্ষমতা ছাড়েন লুলা। তার স্থলাভিষিক্ত হন রাজনৈতিক সহযোগী দিলমা রুসেফ।

ক্ষমতা ছাড়ার পর লুলার জীবনে নেমে আসে কঠিন সময়। দ্য নিউইয়র্কার ম্যাগাজিন ও বিবিসির প্রতিবেদন বলছে—২০১১ সালে তার ক্যানসার ধরা পড়ে। চিকিৎসার পর ২০১২ সালে সুস্থ হয়ে ওঠেন তিনি।

এরপর ২০১৪ সালে ব্রাজিলে শুরু হয় ‘অপারেশন লাভা জ্যাটো’ বা ‘কার ওয়াশ’ নামে বড় দুর্নীতিবিরোধী তদন্ত। এই তদন্তের ধারাবাহিকতায় ২০১৬ সালে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট দিলমা রুসেফকে অভিশংসনের মাধ্যমে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়।

লুলার বিরুদ্ধেও মামলা হয়। গুয়ারুজা শহরের একটি ট্রিপ্লেক্স অ্যাপার্টমেন্ট ও খামারবাড়ি ঘুষ হিসেবে গ্রহণ এবং পেট্রোব্রাসের দুর্নীতিতে জড়িত থাকার অভিযোগ আনা হয় তার বিরুদ্ধে। ২০১৭ সালে বিচারক সার্জিও মোরো তাকে প্রায় ১০ থেকে ১২ বছরের কারাদণ্ড দেন।

২০১৮ সালের ৭ এপ্রিল হাজারো সমর্থকের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে পুলিশের কাছে আত্মসমর্পণ করেন লুলা। কুরিতিবা শহরের ফেডারেল পুলিশ সদরদপ্তরের কারাকক্ষে তাকে ৫৮০ দিন বন্দি রাখা হয়। এই সময় নিজের ভাই ও ৭ বছর বয়সী নাতি অর্থারকে হারান তিনি।

কারাগারের বাইরে তার সমর্থকেরা পুরো সময়জুড়ে ‘ফ্রি লুলা ভিজিলা’ নামে পাহারা কর্মসূচি চালিয়ে যান। বন্দি থাকা অবস্থায় সমাজবিজ্ঞানী রোসাঞ্জেলা দা সিলভার সঙ্গে ৫৮০টি চিঠি আদান-প্রদান করেন লুলা। সেই যোগাযোগ একসময় প্রেমে রূপ নেয়। ২০২২ সালে বিয়ে করেন তারা।

অবশেষে ২০২১ সালে ব্রাজিলের সুপ্রিম কোর্ট রায়ে জানায়, লুলার মামলায় রাজনৈতিক পক্ষপাত দেখিয়েছিলেন বিচারক সার্জিও মোরো এবং মামলাটি বিচারের আইনগত এখতিয়ার তার আদালতের ছিল না। এর ফলে লুলার সাজা বাতিল হয় এবং তিনি রাজনৈতিক অধিকার ফিরে পান।

তৃতীয়বার ক্ষমতায় ফেরাসাজা বাতিলের পর আবারও রাজনীতিতে সক্রিয় হন লুলা।

সরকারি নথি, দ্য নিউইয়র্কার ও সিএনএনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২২ সালের নির্বাচনে অতি-ডানপন্থি প্রেসিডেন্ট জইর বলসোনারোকে পরাজিত করে তৃতীয়বারের মতো ব্রাজিলের ক্ষমতায় ফেরেন তিনি।

২০২৩ সালের ১ জানুয়ারি শপথ অনুষ্ঠানে ঘটে ব্যতিক্রমী এক ঘটনা। প্রথা অনুযায়ী বিদায়ী প্রেসিডেন্টের কাছ থেকে দায়িত্ব গ্রহণের বদলে সুবিধাবঞ্চিত মানুষের প্রতিনিধি হিসেবে বর্জ্য সংগ্রাহক অ্যালিন সউসার হাত থেকে প্রেসিডেন্সিয়াল স্যাশ গ্রহণ করেন লুলা।

ক্ষমতা গ্রহণের মাত্র এক সপ্তাহ পর, ২০২৩ সালের ৮ জানুয়ারি বলসোনারোর উগ্র সমর্থকেরা ব্রাসিলিয়ার সুপ্রিম কোর্ট, জাতীয় কংগ্রেস ও প্রেসিডেন্সিয়াল প্যালেসে হামলা চালায়। লুলা কঠোরভাবে পরিস্থিতি মোকাবিলা করেন।

তৃতীয় মেয়াদে বলসোনারোর আমলে ক্ষতিগ্রস্ত সামাজিক কল্যাণ কর্মসূচিগুলো পুনরুজ্জীবিত করার উদ্যোগ নেন লুলা। আমাজন জঙ্গলে অবৈধভাবে বৃক্ষনিধন কমানোর পাশাপাশি ২০২৪ সালে জি২০ শীর্ষ সম্মেলন আয়োজন করেন। ২০২৫ সালের কপ৩০ জলবায়ু সম্মেলনের আয়োজক হিসেবেও বিশ্বমঞ্চে ব্রাজিলের অবস্থান তুলে ধরেন তিনি।

৮০ বছর বয়সেও চতুর্থবারের মতো প্রেসিডেন্ট পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সিদ্ধান্ত নেন লুলা।

দ্য নিউইয়র্কার, সিএনএন ও তার রাজনৈতিক জীবনবৃত্তান্তে নির্বাচনী প্রচারণার নানা দিক উঠে এসেছে। বয়স ও শারীরিক সক্ষমতা নিয়ে বিরোধীদের কটাক্ষের জবাবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিয়মিত জগিং ও স্কোয়াট করার ভিডিও প্রকাশ করেন তিনি।

গত ৪ অক্টোবরের প্রথম দফার ভোটে ডানপন্থি প্রতিদ্বন্দ্বী ফ্লাভিও বলসোনারোর চেয়ে পিছিয়ে ছিলেন লুলা। তিনি পেয়েছিলেন ৪৫ শতাংশ ভোট, বলসোনারো পেয়েছিলেন ৪৭ শতাংশ।

কিন্তু পরবর্তী ২০ দিনে প্রচারণার কৌশল বদলে ফেলেন লুলা। ডিজিটাল প্রচারণা জোরদার করেন, মোবাইল ফোনে সেলফি ভিডিও দেন এবং ছোট উদ্যোক্তাদের কর-ছাড় ও অপরাধ দমনে কঠোর নীতির পক্ষে অবস্থান নিয়ে ভোটারদের আস্থা ফেরানোর চেষ্টা করেন।

গত ২৫ অক্টোবরের চূড়ান্ত ভোটে জয় পান তিনি। পরাজিত প্রার্থী বলসোনারো নির্বাচনের আইনগত বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে ফল বাতিলের দাবি জানান। তবে ব্রাজিলের সুপ্রিম কোর্ট ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় লুলার বিজয়কে স্বীকৃতি দেয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

চতুর্থ মেয়াদে লুলার সামনে অবশ্য বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে।

সিএনএনের বিশ্লেষণ বলছে—ব্রাজিলের নিম্নকক্ষের ৫১৩টি আসনের মধ্যে ৩০৩টি এবং সিনেটের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ আসন বিরোধীদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। ফলে সরকারের পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সংসদে বিরোধীদের সঙ্গে সমঝোতা করা কঠিন হতে পারে।

এর পাশাপাশি দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, ঋণের উচ্চ সুদ ও লাতিন আমেরিকাজুড়ে ডানপন্থি রাজনীতির উত্থানের মধ্যে দেশের সার্বভৌমত্ব ও সামাজিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখাও তার জন্য বড় পরীক্ষা হবে।

পারনামবুকোর এক দরিদ্র পরিবারের শিশু হিসেবে জুতো পালিশের কাজ দিয়ে যে জীবন শুরু হয়েছিল, সেই লুলার পথচলায় এসেছে কারখানার শ্রমিকের জীবন, শ্রমিক আন্দোলনের নেতৃত্ব, একাধিক নির্বাচনী পরাজয়, কারাবাস ও আবারও ক্ষমতায় ফেরার অভিজ্ঞতা।

জীবনের নানা উত্থান-পতন পেরিয়ে ব্রাজিলের রাজনীতির কেন্দ্রে নিজের অবস্থান ধরে রেখেছেন লুলা। তার এই দীর্ঘ যাত্রা দেশটির রাজনীতিতে সংগ্রাম, অধ্যবসায় ও মেহনতি মানুষের আকাঙ্ক্ষার এক গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক হয়ে উঠেছে।

📢এই সংবাদটি শেয়ার করুন

📢 আপনিও হোন পাঠক সাংবাদিক!

আপনার এলাকার যেকোনো খবর, সমস্যা বা ভিডিও সরাসরি আমাদের নিউজ পোর্টালে জমা দিন

সংবাদ পাঠান ↗
ম

মুনতাসির মাহমুদ

বার্তা সম্পাদক

নিউজরুম এডিটর, ডেইলি বরিশাল ডটকম। বার্তা বিভাগে অভিজ্ঞতা ৭ বছর।

সম্পর্কিত আরও সংবাদ