তুরাগ নদ থেকে বিমানবাহিনীর সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট তাহসিফ সাউরির মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় তার ‘বন্ধু’ শাহরিয়ার রেজা দীপকে নিয়ে নদীর পাড় সংলগ্ন এলাকা পরিদর্শন করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)।
আজ শুক্রবার সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত টঙ্গীর ওই এলাকা পরিদর্শন শেষে পিবিআইয়ের অতিরিক্ত উপমহাপরিদর্শক এনায়েতুর রহমান মান্না ব্রিফিং করেন।
পিবিআই জানায়, তাহসিফ সাউরির মৃত্যুর ঘটনাটি জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় নৌ-পুলিশের পাশাপাশি পিবিআই ছায়া তদন্ত করছে এবং নৌ পুলিশকে সহযোগিতা করছে।
এর আগে, জিজ্ঞাসাবাদের জন্য গতকাল রাতে তাহসিফের 'জুনিয়র বন্ধু' আহমেদ শাহরিয়ার রেজা দীপকে হেফাজতে নেয় পিবিআই।
পিবিআই জানায়, জায়গাটি নদীর ৫০ মিটারের মধ্যে এবং তুরাগের এই অংশ কামারপাড়া ও টঙ্গী ব্রিজের অনেকটা মাঝামাঝি।
ব্রিফিংয়ে কর্মকর্তারা বলেন, 'আমরা জানতে পেরেছি তাহসিফ যেদিন রাতে (২৭ অক্টোবর) নিখোঁজ হয়, সেদিন তার সঙ্গে একজন বন্ধু ছিলেন। তার নাম দীপ। তিনি আমাদের বিভিন্ন বিষয়ে তথ্য দিয়েছেন।'
'তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী আমরা একটি মোটরসাইকেল পেয়েছি কালো রঙের জিক্সার। এটা ওই (তাহসিফের) মোটরসাইকেল কি না, কাগজপত্রসহ বিভিন্ন বিষয় যাচাই করে দেখছি।'
ইউনিফর্মধারীদের ধাওয়া খেয়ে তাহসিফ নদীতে ঝাঁপ দিয়েছিল—দীপের এমন বক্তব্যের বিষয়ে মন্তব্য জানতে চাইলে পিবিআই কর্মকর্তা এনায়েতুর রহমান মান্না বলেন, 'তার সব তথ্য আমরা বিশ্বাস করছি না। বিষয়গুলো যাচাই করে দেখছি। আর এই এলাকায় তারা এসেছিল বলেছে, কোথায় কোথায় গিয়েছিল বলেছে। আমরা সবই যাচাই করছি।'
'তিনি বলেছেন যে এখানে দুজন পুলিশ অফিসার ছিল। তাদের দেখে তারা দৌড় দিয়েছে। আমরা যাচাই করে দেখব কারা ছিল। আদৌ পুলিশের ইউনিফর্মের পরা কেউ ছিল কি না বা কারো দায়িত্ব ছিল কি না—সে বিষয়গুলো যাচাই করে দেখব। তারপর জানাতে পারব,' বলেন তিনি।
তবে ওই এলাকাটি 'মাদকের স্পট' বলে দাবি করেন এই কর্মকর্তা।
দীপ ও তাহসিফ সেখানে মাদক সংক্রান্ত কোনো কারণে গিয়েছিল কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে পিবিআই কর্মকর্তারা বলেন, 'এটা পোস্টমর্টেম রিপোর্টে বোঝা যাবে। তাদের শরীরে কোনো ইনটক্সিকেশন আছে কি না, বিষাক্ত কিছু আছে কি না, অ্যালকোহল আছে কি না। এগুলো এখনই মন্তব্য করা যাবে না।'
ঘটনার রাতে দুজন একটি রেস্টুরেন্টে খেয়েছেন—দীপের এমন বক্তব্য প্রসঙ্গে এক কর্মকর্তা বলেন, 'তিনি অনেক বিষয়ে কথা বলেছেন। সবকিছু ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কি না, তাও আমরা যাচাই করছি। অনেক তথ্য মিথ্যাও হতে পারে, সঠিকও হতে পারে। আমরা সবকিছু যাচাই করে তদন্ত সাপেক্ষে জানাব।'
'এই মোটরসাইকেল সেই মোটরসাইকেল কি না, কাগজে মেলে কি না। জায়গাগুলোর দূরত্ব কতটুকু, সময়গুলো সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না, নানা বিষয় আছে। প্রযুক্তির সহায়তা নিয়ে এগুলো আমরা পরিষ্কার করব,' বলেন তিনি।
'দীপ বলেছেন পুলিশের মতো দুজন লোককে তারা দেখেছেন। দেখে তারা দৌড় দিয়েছেন। এই দুজন কারা, সেটা আমরা না বুঝে বলতে পারব না। একেকজন একক দিকে দৌড় দিয়েছে। কে কোনদিকে জানে না দীপ,' বলেন তিনি।
পিবিআই কর্মকর্তা মান্না বলেন, 'নদীর পাড়ে এই এলাকায় গিয়েছি আমরা। এটা খোলা মাঠের মতো, তিনদিকে ঘেরা নদী। তার কথার সঙ্গে সব তথ্য সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না এটা আমাদের যাচাই করতে হবে।'
দুর্ঘটনা নাকি হত্যা, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, 'এখন পর্যন্ত আমরা এমন কোনো সিদ্ধান্তে পৌছাতে পারিনি। দুটোর যে কোনোটাই হতে পারে। এটা পোস্টমর্টেম রিপোর্টের সঙ্গে রিলেটেড।'
এই কর্মকর্তা আরও বলেন, 'দীপ কখন বাসায় গেছে সেটা এখনো নিশ্চিত হতে পারিনি। এজন্য প্রযুক্তির সহায়তা নিচ্ছি। সম্ভবত রাত আড়াইটার পর বাসায় গেছে। দেড়টা বা ২টার পর দুজন বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়,' বলেন তিনি।
'দীপ বলেছে রাত গভীরে দেখেছে ইউনিফর্ম পরা দুজন লোক আসতেছে। তারা দুজন দুদিকে চলে গেছে। এই তথ্য আমরা ভেরিফাই করতে পারিনি। এটার জন্য প্রযুক্তির সাহায্য নিতে হবে,' যোগ করেন তিনি।
২৮ অক্টোবর বিকেলে টঙ্গীতে তুরাগ নদের রাজাবাড়ী ঘাট এলাকা থেকে তাহসিফের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এর আগের দিন থেকে তিনি নিখোঁজ ছিলেন।
নিখোঁজ হওয়ার কিছুক্ষণ আগে ধারণ করা সিসিটিভি ফুটেজে তাহসিফ সাউরিকে এক যুবকের সঙ্গে দেখা যায়। তার সঙ্গে মোটরসাইকেলে বেরিয়ে যেতে দেখা যায় তাহসিফকে।
ওই যুবক তাহসিফের ‘জুনিয়র বন্ধু’ দীপ বলে পরিবারের সদস্যরা শনাক্ত করেন।
পিবিআইয়ের অতিরিক্ত উপমহাপরিদর্শক এনায়েতুর রহমান মান্না সাংবাদিকদের জানান, পিবিআই উত্তর বিভাগের একটি দল বৃহস্পতিবার রাতে রাজধানীর মোহাম্মদপুর এলাকার বাবর রোডের বি ব্লকের একটি বাড়ির তৃতীয় তলা থেকে দীপকে হেফাজতে নেয়।
গত ২৭ অক্টোবর সন্ধ্যায় বাসা থেকে নিচে নেমেছিলেন তাহসিফ। এরপর আর তিনি ফিরে আসেননি।
তাহসিফের বাবা এনায়েতুল করিম জানান, তাহসিফের মা বারবার ফোন করেও আর যোগাযোগ করতে পারেননি।



