চলতি বছরের উচ্চমাধ্যমিক সার্টিফিকেট (এইচএসসি) পরীক্ষায় গত ২২ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পাসের হার দেখেছে দেশের সাধারণ শিক্ষা বোর্ডগুলো।
বাংলাদেশ শিক্ষাতথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর (ব্যানবেইস) তথ্য অনুযায়ী, সর্বশেষ ২০০৪ সালে সাধারণ শিক্ষা বোর্ডগুলোতে পাসের হার ছিল ৪৭ দশমিক ৭৩ শতাংশ। পরের বছর তা বেড়ে দাঁড়ায় ৫৯ দশমিক ১৬ শতাংশে। আর এ বছর পাসের হার ৫১ দশমিক ৬২ শতাংশ।
২০২৬ সালে মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষা বোর্ডসহ মোট ১১টি শিক্ষা বোর্ডে পাসের হার কমে দাঁড়িয়েছে ৫২ দশমিক ১২ শতাংশে। গত বছর এ হার ছিল ৫৮ দশমিক ৮৩ শতাংশ।
এবার নয়টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের অধীনে পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিলেন ১০ লাখ ৪৮ হাজার ৫৩০ জন। তাদের মধ্যে অকৃতকার্য হয়েছেন ৫ লাখ ৭ হাজার ২৮১ জন।
ব্যানবেইসের ১৯৯০ সাল থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, সাধারণ শিক্ষা বোর্ডগুলোতে এবারই সবচেয়ে বেশি শিক্ষার্থী অকৃতকার্য হয়েছেন।
অন্যদিকে মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষা বোর্ডসহ ১১টি শিক্ষা বোর্ডে এবার মোট অকৃতকার্য হয়েছেন ৫ লাখ ৯৪ হাজার ১১৩ জন। গত বছর এ সংখ্যা ছিল ৫ লাখ ৮ হাজার ৭০১।
এবার জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যাও গত আট বছরের মধ্যে সবচেয়ে কম। ১১টি শিক্ষা বোর্ডে এ বছর সর্বোচ্চ ফল পেয়েছেন ৪০ হাজার ৮৪ জন।
বাংলাদেশ শিক্ষাতথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর (ব্যানবেইস) তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮ সালে ২৯ হাজার ২৬২ জন এবং ২০১৯ সালে ৪৭ হাজার ২৮৬ জন শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ পেয়েছিলেন। সে হিসাবে ২০১৮ সালের পর এবারই সবচেয়ে কম শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ পেয়েছেন।
এই ফল সন্তোষজনক নয় বলে মন্তব্য করেছেন শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন। শিক্ষার্থীদের শেখার ঘাটতি পূরণে সরকার প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে বলে জানিয়েছেন তিনি।
কেন কমল পাসের হার ও জিপিএ-৫?
এবারের এমন ফলাফলের পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে বলে মনে করেন গণসাক্ষরতা অভিযানের (ক্যাম্পে) নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে চৌধুরী।সংবাদমাধ্যমকে তিনি বলেন, গত কয়েক বছরে শিক্ষাক্ষেত্রে একের পর এক ধাক্কা এসেছে। করোনার সময় শিক্ষার্থীদের যে শিখনঘাটতি তৈরি হয়েছিল, তা কাটিয়ে ওঠার আগেই জুলাই গণঅভ্যুত্থানকে কেন্দ্র করে শিক্ষাঙ্গনে অস্থিরতা তৈরি হয়। এর মধ্যে শিক্ষক সংকটসহ নানা সমস্যাও ছিল। সব মিলিয়ে এসবের প্রভাব এসএসসি ও এইচএসসি, দুই পরীক্ষার ফলেই দেখা যাচ্ছে।
‘ফলাফলে আর্থিক ও ভৌগোলিক বৈষম্যও স্পষ্ট। সচ্ছল পরিবারের শিক্ষার্থীরা তুলনামূলক ভালো ফল করলেও গ্রামাঞ্চল ও অসচ্ছল পরিবারের অনেক শিক্ষার্থী পিছিয়ে পড়ছে। শিক্ষার সুযোগ পাওয়ার ক্ষেত্রে পরিবারের আর্থিক অবস্থার প্রভাব রয়েছে। এ বৈষম্য কমাতে না পারলে সবার জন্য সমান শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করা কঠিন হবে।
তবে, এবারের ফল খারাপের পেছনের সুনির্দিষ্ট কারণ জানতে নমুনাভিত্তিক গবেষণা জরুরি বলে মনে করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক সিদ্দিকুর রহমান।সংবাদমাধ্যমকে তিনি বলেন, শুধু ধারণার ভিত্তিতে নির্ধারণ না করে সরকারকে শিক্ষার্থীদের ফল খারাপ হওয়ার কারণ চিহ্নিত করতে হবে। ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের সময় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় পড়াশোনায় যে বিঘ্ন ঘটেছিল, তার প্রভাব এবারের ফলে পড়তে পারে। এছাড়া অতীতে পরীক্ষার খাতা মূল্যায়নে উদারতা দেখানো হয়ে থাকতে পারে। প্রকৃত যোগ্যতা না থাকা সত্ত্বেও উদারভাবে খাতা দেখার কারণে কোনো কোনো শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ পেয়েছে কি না, তা পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
‘এসএসসিতে ভালো করার পরও অনেক শিক্ষার্থী এইচএসসি পর্যায়ে ভালো ফল করতে পারছেন না। বিশেষ করে ইংরেজিতে দুর্বলতা দীর্ঘদিনের সমস্যা। মানবিক বিভাগের শিক্ষার্থীদের ফল খারাপ হওয়ার পেছনেও আগের শিক্ষাগত দুর্বলতা থাকতে পারে। কলেজ পর্যায়ে এই শিক্ষার্থীরা যথাযথ সহায়তা পাচ্ছেন কি না, তা খতিয়ে দেখা দরকার।
ফলাফল বিপর্যয় কাটিয়ে উঠতে কিছু পরামর্শ দিয়েছেন এই দুই শিক্ষাবিদ।
অধ্যাপক সিদ্দিকুর রহমান বলেন, যেসব কলেজে ২০ শতাংশের কম শিক্ষার্থী পাস করেছেন, সেসব প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার পরিবেশ ও পাঠদানের মান বিশেষভাবে পর্যালোচনা করা দরকার। শিক্ষকেরা নিয়মিত ক্লাস নেন কি না, দুর্বল শিক্ষার্থীদের জন্য বাড়তি ক্লাসের ব্যবস্থা আছে কি না, শিক্ষকেরা তাদের যথাযথ সহযোগিতা করেন কি না, এসব বিষয় খতিয়ে দেখতে হবে। পাশাপাশি শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মতামত নিতে হবে।
একইভাবে যেসব প্রতিষ্ঠান থেকে শতভাগ শিক্ষার্থী পাস করেছেন, সেগুলোও পর্যালোচনা করা প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি। এসব প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের ভালো ফলের পেছনে কী ধরনের পাঠদান ও সহায়তার ব্যবস্থা রয়েছে, তা চিহ্নিত করে অন্য প্রতিষ্ঠানেও প্রয়োগ করা যেতে পারে।
ফলাফল উন্নয়নে তিনটি বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়ার পরামর্শ দেন রাশেদা কে চৌধুরী।
প্রথমত, শূন্য পাস করা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর দুর্বলতা চিহ্নিত করতে সরকারের বাইরে স্বাধীন গবেষণা করতে হবে। কোনো প্রতিষ্ঠানের একজন শিক্ষার্থীও পাস করতে না পারার দায় শুধু শিক্ষার্থীদের ওপর চাপানো যায় না। এসব শিক্ষার্থীর পেছনে পরিবার ও রাষ্ট্রের বিনিয়োগ রয়েছে। কোনো প্রতিষ্ঠানের একজন শিক্ষার্থীও কেন পাস করতে পারল না, তা খুঁজে বের করতে হবে। এসব প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক সংকট, বিষয়ভিত্তিক দক্ষ শিক্ষকের অভাব, অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা ও ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা আছে কি না, তা গবেষণার মাধ্যমে বের করতে হবে। গবেষণার ফল অনুযায়ী প্রতিষ্ঠানগুলোর সমস্যার সমাধান করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, শ্রেণিকক্ষভিত্তিক পাঠদান নিশ্চিত করার পাশাপাশি শিক্ষায় বৈষম্য কমাতে হবে। শহর ও গ্রামের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে সুযোগের বড় পার্থক্য রয়েছে। সচ্ছল পরিবারের শিক্ষার্থীরা ভালো শিক্ষার সুযোগ পেলেও অসচ্ছল পরিবারের অনেক শিক্ষার্থী পিছিয়ে পড়ছে। বিশেষ করে কলেজ পর্যায়ে বিষয়ভিত্তিক দক্ষ শিক্ষকের সংকট দূর করা জরুরি। বিজ্ঞান বা অন্য কোনো বিষয় পড়ানোর জন্য সংশ্লিষ্ট বিষয়ে দক্ষ শিক্ষক থাকতে হবে। শিক্ষার্থীদের শুধু পরীক্ষার প্রস্তুতি নয়, শ্রেণিকক্ষে প্রকৃত শিক্ষা নিশ্চিত করতে হবে।
তৃতীয়ত, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর নিয়মিত তদারকি ও পরামর্শ দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে বলে মনে করেন তিনি। তার মতে, এ কাজে শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও স্থানীয় শিক্ষা প্রশাসনকে যুক্ত করতে হবে। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলের দরিদ্র পরিবারের অভিভাবকদের মতামতকে গুরুত্ব দিতে হবে। শুধু দুর্বলতা চিহ্নিত করলেই হবে না, তা কাটিয়ে উঠতে প্রতিষ্ঠানগুলোকে সহযোগিতাও করতে হবে।
এ প্রসঙ্গে থাইল্যান্ডের উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, সেখানে দুর্বল ফল করা প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রের (আইসিইউ) মতো বিশেষ ব্যবস্থার আওতায় এনে তাদের ঘাটতি চিহ্নিত করা হয়। এরপর এক থেকে দুই বছর ধরে সেসব ঘাটতি কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা চলে। বাংলাদেশেও শূন্য পাস করা প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য এমন উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে।
অকৃতকার্য শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ নিয়েও ভাবার পরামর্শ দেন রাশেদা কে চৌধুরী। ‘এক বা দুই বিষয়ে অকৃতকার্য শিক্ষার্থীদের এক মাসের মধ্যে আবার পরীক্ষার সুযোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত ইতিবাচক। তবে দুইয়ের বেশি বিষয়ে অকৃতকার্য হওয়া শিক্ষার্থীদের জন্যও বিকল্প পথ তৈরি করতে হবে। এসব শিক্ষার্থীকে ভবিষ্যতের কর্মসংস্থানের উপযোগী করে তুলতে স্বল্পমেয়াদি কারিগরি ও বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ, ভাষা শিক্ষা এবং বিভিন্ন দক্ষতা উন্নয়নমূলক কোর্সের সুযোগ তৈরি করা যেতে পারে। পরীক্ষায় অকৃতকার্য হওয়া যেন তাদের কাছে জীবনের শেষ মনে না হয়, সেজন্য সরকারকে উদ্যোগ নিতে হবে’, যোগ করেন তিনি।



