উচ্চমাধ্যমিক সার্টিফিকেট (এইচএসসি) পরীক্ষায় নাটোর জেলার ১৮টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে অংশ নেওয়া কোনো পরীক্ষার্থীই কৃতকার্য হতে পারেনি। এমন ফলাফলে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্ট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর প্রধানরা।
এ ঘটনায় প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রধানদের কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়েছেন জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে শতভাগ অকৃতকার্য হওয়ার পেছনে কী কারণ রয়েছে, তা জানতে চেয়েছে শিক্ষা বিভাগ। একই সঙ্গে তাদের সশরীরে কার্যালয়ে উপস্থিত হয়ে এমন ফলাফলের কারণ সম্পর্কে সন্তোষজনক ব্যাখ্যা দেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
শিক্ষা অফিস সূত্রে জানা গেছে, প্রতি বছর এইচএসসি পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর জেলার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর ফলাফল পর্যালোচনা করা হয়। এরই ধারাবাহিকতায় এবার জেলার ১৭৭টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে ১৮টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কোনো শিক্ষার্থী পাশ না করার বিষয়টি সামনে এসেছে। তার মধ্যে আবার দুটি এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার মান, পাঠদান কার্যক্রম, শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি, নিয়মিত পরীক্ষা গ্রহণ এবং শিক্ষকদের দায়িত্ব পালনের বিষয়গুলো খতিয়ে দেখার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তবে এমন ফলাফলে হতবাক হয়েছেন সংশ্লিষ্ট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর প্রধানরা। তাদের কেউ কেউ মনে করছেন, শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় অমনোযোগিতা, নিয়মিত ক্লাশে উপস্থিত না থাকা, পরীক্ষার প্রস্তুতির ঘাটতি এবং বিভিন্ন প্রতিকূলতার কারণে এমন ফলাফল হতে পারে। তবে কোনো কোনো প্রতিষ্ঠান পরীক্ষার খাতা পুনর্মূল্যায়ন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আবার কোনো কোনো প্রতিষ্ঠান ডিসেম্বরের পরীক্ষার জন্য প্রস্তুতি নেবে বলে জানা গেছে।
শতভাগ অকৃতকার্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো হলো—নাটোর সদর উপজেলায় বেগম খালেদা জিয়া মহাবিদ্যালয়; বাগাতিপাড়া উপজেলায় পৌর মহিলা টেকনিক্যাল অ্যান্ড বিএম কলেজ, তমালতলা টেকনিক্যাল অ্যান্ড বিএম কলেজ, টিপুরিয়া হাইস্কুল অ্যান্ড টেকনিক্যাল কলেজ; গুরুদাসপুর উপজেলায় নূর মোহাম্মদ বিশ্বাস টেকনিক্যাল স্কুল অ্যান্ড বিজনেস কলেজ, চাঁচকৈড় নাজিম উদ্দিন স্কুল অ্যান্ড কলেজ, দুর্গাপুর স্কুল অ্যান্ড কলেজ, বঙ্গবন্ধু টেকনিক্যাল বিজ্ঞান ও তথ্য এবং বিজনেস ইনস্টিটিউট; লালপুর উপজেলার মাকড়াম উচ্চবিদ্যালয় ও কলেজ, রাধাকান্তপুর উচ্চবিদ্যালয় ও কলেজ, নেংগোপাড়া আলিম মাদ্রাসা, রামপুর জামিরিয়া আলিম মাদ্রাসা; সিংড়া উপজেলার আগাপাড়া উচ্চবিদ্যালয় ও কলেজ; নলডাঙ্গা উপজেলার সরকুতিয়া স্কুল অ্যান্ড কলেজ ও সাতার ভাগ স্কুল অ্যান্ড কলেজ। এর মধ্যে এমপিওভুক্ত দুটি প্রতিষ্ঠান হলো—গুরুদাসপুর উপজেলার চলনবিল টেকনিক্যাল স্কুল অ্যান্ড কমার্স কলেজ ও নলডাঙ্গা উপজেলার শাঁখারীপাড়া ফাজিল মাদ্রাসা।
নলডাঙ্গা উপজেলার শাঁখারীপাড়া ফাজিল মাদ্রাসার অধ্যক্ষ হাবিবুর রহমান বলেন, এবার প্রতিষ্ঠান থেকে কেউ পাশ না করায় আমরা বিস্মিত হয়েছি। প্রতি বছরই ভালো ফলাফল করে শিক্ষার্থীরা। এবার কেন এমন হলো বুঝতে পারছেন না। খাতা পুনর্মূল্যায়নের আবেদন করবেন বলেও জানান তিনি।
গুরুদাসপুর উপজেলার চলনবিল টেকনিক্যাল স্কুল অ্যান্ড বিএম কলেজের অধ্যক্ষ মোখলেছুর রহমান বলেন, ২৩ পরীক্ষার্থীর সবাই বাংলা ও ইংরেজিতে অকৃতকার্য হয়েছে। বোর্ড চ্যালেঞ্জ করা হবে। পাশাপাশি সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ডিসেম্বরে অকৃতকার্যদের যে পরীক্ষার সুযোগ দেওয়া হয়েছে তাতেও তারা অংশগ্রহণ করবে।
শিক্ষাবিদ সুবিধ কুমার মৈত্রের মতে, কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে একজন শিক্ষার্থীও পাশ না করা উদ্বেগজনক। এর পেছনে শুধু শিক্ষার্থীদের ব্যর্থতা নয়, পাঠদান পদ্ধতি, শিক্ষকদের ভূমিকা, প্রতিষ্ঠান পরিচালনা এবং শিক্ষা ব্যবস্থাপনার দুর্বলতাও থাকতে পারে। তাই শুধু কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়েই দায়িত্ব শেষ না করে সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।
জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা রোস্তম আলী হেলালী জানান, ১৮টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ফলাফল শূন্য হওয়ার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। কেন এমন ফলাফল হয়েছে, তা জানতে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানপ্রধানদের নোটিশ দেওয়া হয়েছে। ৫ দিনের মধ্যে প্রতিবেদনসহ তাদের সশরীরে কার্যালয়ে উপস্থিত হয়ে ব্যাখ্যা দিতে বলা হয়েছে। ব্যাখ্যা পর্যালোচনা করে পরবর্তী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
নাটোর জেলা প্রশাসক সুমনী আক্তার বলেন, শতভাগ অকৃতকার্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর বিষয়ে খোঁজখবর নিতে জেলা শিক্ষা কর্মকর্তাকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। কারণ জেনে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
প্রসঙ্গত, ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষে নাটোর জেলায় উচ্চমাধ্যমিক সাধারণ, কারিগরি ও মাদ্রাসা বোর্ডের অধীনে ১৭৭টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান অংশ নেয়। এর মধ্যে ১৮টি প্রতিষ্ঠান থেকে কোনো পরীক্ষার্থী কৃতকার্য হতে পারেনি।



