গত বছরের ৩০ নভেম্বর। আন্তসীমান্ত মাদক ও অস্ত্র চোরাচালান নিয়ে প্রতিবেদন করার জন্য পরিচিত একটি আইপি টেলিভিশন চ্যানেলের সাংবাদিক লুৎফুজ্জামান ফকির আলিফ নেত্রকোণার পুলিশ সুপারের সঙ্গে এক বৈঠকে নিজের জীবনের ওপর আসা হুমকির কথা জানিয়েছিলেন।
পুলিশ কর্মকর্তা ও সহকর্মী সাংবাদিকদের উপস্থিতিতে তিনি বলেছিলেন, ‘আমি বাইরে বের হলে ওরা আমাকে গুলি করবে।
আলিফকে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। অভিযোগ রয়েছে, যেসব চোরাচালান চক্রের বিরুদ্ধে তিনি সতর্ক করেছিলেন, তাদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরাই এই হত্যাকাণ্ডে জড়িত। তার আশঙ্কার কথা জানানোর পর পুলিশ কী পদক্ষেপ নিয়েছিল, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
গত ১২ মাসে গুলিতে নিহত দুই সাংবাদিকের একজন আলিফ। দুজনেরই হত্যাকাণ্ড ঘটেছে ঢাকার বাইরে।
গত বছরের ১৮ ডিসেম্বর খুলনার আড়ংঘাটার একটি চায়ের দোকানে গুলি করে হত্যা করা হয় ৪৫ বছর বয়সী এমদাদুল হক মিলনকে। তিনি অনলাইন পোর্টাল বর্তমান সময় পরিচালনার পাশাপাশি শলুয়া প্রেসক্লাবের সভাপতির দায়িত্বে ছিলেন।
এমন পরিস্থিতির মধ্যেই আজ সোমবার দেশে পালিত হচ্ছে সাংবাদিকদের ওপর সংঘটিত অপরাধের দায়মুক্তি অবসানের আন্তর্জাতিক দিবস।
মানবাধিকার সহায়তা সংস্থা হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস) নিজস্ব অনুসন্ধানের পাশাপাশি ১৬টি সংবাদমাধ্যমের তথ্য পর্যবেক্ষণ করে। সংস্থাটির হিসাবে, ২০১৭ সালে সাংবাদিকদের ওপর হামলার ঘটনা ছিল ৩২টি। এরপর প্রায় প্রতিবছরই এ সংখ্যা বেড়েছে। ২০২৫ সালে তা দাঁড়ায় ৩১৮টিতে।
২০২৬ সালের প্রথম নয় মাসে সাংবাদিকদের ওপর ২৮৮টি হামলার ঘটনা নথিভুক্ত করেছে এইচআরএসএস। এসব ঘটনায় ৫১৮ জন সাংবাদিক নির্যাতন ও হয়রানির শিকার হয়েছেন এবং আহত হয়েছেন ২৯৭ জন।
ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরও হামলার এই প্রবণতা কমেনি। সর্বশেষ তথ্য পাওয়া গেছে জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তিন মাসের। এ সময়ে ৮৮টি হামলার ঘটনা নথিভুক্ত করেছে এইচআরএসএস। গত বছরের একই সময়ে এ সংখ্যা ছিল ৮৪। আর ২০২৩ সালের তৃতীয় প্রান্তিকে ছিল ৪৪টি।
আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) সংগ্রহ করা তথ্যেও একই ধরনের চিত্র উঠে এসেছে।
আসকের হিসাবে, ২০২৪ সালে ৫৩১ জন এবং ২০২৫ সালে ৩৮১ জন সাংবাদিক হয়রানির শিকার হয়েছেন। ২০১৭ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে কোনো বছরেই এ সংখ্যা এত বেশি ছিল না।
চলতি বছরের প্রথম নয় মাসে ৩১৫ জন সাংবাদিক হয়রানির শিকার হয়েছেন।
উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের হাতে সাংবাদিকদের হয়রানির ঘটনা ২০২৪ সাল থেকে প্রতিবছর বেড়েছে। আসকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে এ ধরনের ঘটনা ছিল ১৫টি, ২০২৫ সালে ২৩টি এবং ২০২৬ সালের প্রথম নয় মাসেই তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪২টিতে। অন্তত ২০১৭ সাল থেকে কোনো বছরে এ সংখ্যা এত বেশি ছিল না।
অন্যদিকে, ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে রাজনৈতিক কর্মীদের হাতে সাংবাদিকদের হয়রানির চিত্রও বদলেছে।
২০১৭ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত এ ধরনের বেশিরভাগ ঘটনার জন্য আওয়ামী লীগের কর্মীদের দায়ী করেছে আসক। ২০১৮ সালে এ সংখ্যা ছিল সর্বোচ্চ ৭০টি।
২০২৫ ও ২০২৬ সালে রাজনৈতিক কর্মীদের হাতে সংঘটিত প্রায় সব হামলার জন্য বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর কর্মীদের দায়ী করা হয়েছে। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বিএনপির কর্মীদের বিরুদ্ধে ২৭টি এবং জামায়াত কর্মীদের বিরুদ্ধে ২২টি হামলার অভিযোগ নথিভুক্ত করেছে আসক।
ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনের সময়কার ঘটনাসহ চলতি বছরে রাজনৈতিক কর্মীদের হাতে সাংবাদিকদের ওপর হামলার মোট সংখ্যা প্রায় ৬৭টিতে পৌঁছাতে পারে। ২০১৮ সালের পর এটিই হবে সর্বোচ্চ।
দায়িত্ব পালনকালে সাংবাদিকদের ওপর শারীরিক হামলার ঘটনাও ২০২৪ সালের পর দ্বিগুণের বেশি হয়েছে। ২০২৪ সালে এ ধরনের ঘটনা ছিল ৫৪টি। ২০২৫ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১১৮টিতে। চলতি বছরের প্রথম নয় মাসে এ সংখ্যা ছিল ৮৮টি।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ঢাকার বাইরের জেলাগুলোতে কর্মরত সাংবাদিকেরা সব সময়ই বেশি ঝুঁকির মধ্যে থাকেন।
তিনি বলেন, ‘এই দেশে সাংবাদিকদের হয়রানি ও সহিংসতার শিকার হওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে ভিন্নমত সহ্য করার মানসিকতার অভাব। তৃণমূল পর্যায়ে পরিস্থিতি আরও খারাপ, কারণ সেখানে সুরক্ষার ব্যবস্থাও কম।
গণঅভ্যুত্থানের পর রাজনৈতিক স্বাধীনতা বেড়েছে। তবে সমালোচনা সহ্য করার সংস্কৃতি দেশের রাজনীতিতে এখনো গড়ে ওঠেনি।
ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘এই সংস্কৃতি হারিয়ে গিয়েছিল। বলা যায়, এখনো তা ফিরে আসেনি। আমার সমালোচক মানেই আমার শত্রু—এমন মানসিকতাই আমরা এখানে দেখতে পাচ্ছি।
এদিকে,সংবাদমাধ্যম ওসংবাদমাধ্যম কার্যালয়ে হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনার ১০ মাসের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও তদন্তকারীরা এখনো অভিযোগপত্র জমা দিতে পারেননি।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি আগুনে ক্ষতিগ্রস্তসংবাদমাধ্যম ভবন পরিদর্শনে গিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ পুলিশকে দুই মাসের মধ্যে অভিযোগপত্র জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়ার কথা জানান। একইসঙ্গে অপরাধীদের ‘দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি’ নিশ্চিত করার আহ্বানও জানান তিনি।
কিন্তু ২৮ এপ্রিলের সেই সময়সীমা পেরিয়ে গেছে অনেক আগেই।
জুন মাস নাগাদ দুই মামলায় ৩৭ জন সন্দেহভাজনকে গ্রেপ্তার করেছিল পুলিশ। এর আগের কয়েক মাসেও কাউকে গ্রেপ্তার করা হয়নি।সংবাদমাধ্যমের আগের এক প্রতিবেদনে বলা হয়,সংবাদমাধ্যম কার্যালয়ে হামলার মামলায় গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের মধ্যে অন্তত ১৭ জন জামিন পেয়েছেন। বিতর্কিত বক্তা আতাউর রহমান বিক্রমপুরী দুই মামলাতেই জামিন পান। আদালত জামিনের ক্ষেত্রে উল্লেখ করেন, আসামিদের নাম প্রাথমিক অভিযোগে ছিল না এবং ঘটনাস্থল থেকেও তাদের গ্রেপ্তার করা হয়নি।
তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার সময়সীমা কয়েক দফা পেছানো হয়েছে। সর্বশেষ সময়সীমা ছিল ২৫ অক্টোবর। কিন্তু পুলিশ সেই সময়ের মধ্যেও প্রতিবেদন জমা দিতে পারেনি।
এ বিষেয়ে সম্পাদক পরিষদের সভাপতি ও নিউ এজ সম্পাদক নুরুল কবীর বলেন, ‘দুটি সংবাদপত্রের কার্যালয়ে অগ্নিসংযোগের মতো অপরাধের তদন্ত থমকে আছে, বিষয়টি সত্যিই বিস্ময়কর এবং অগ্রহণযোগ্য।



