রাধানগর ইউনিয়নের বানিয়াপাড়া গ্রামে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী জরিপ চলমান।
নামের শেষাংশের পদবি এবং স্বীকৃতি জটিলতায় দেশের প্রান্তিক জাতিগোষ্ঠীগুলোর একটি অংশের সরকারি আর্থসামাজিক জরিপের বাইরে পড়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) পরিচালিত ‘ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর’ আর্থসামাজিক অবস্থা ও দারিদ্র্য পরিস্থিতি নিরূপণ’ শীর্ষক এ জরিপে গেজেটভুক্ত জনগোষ্ঠীর নামের সঙ্গে পারিবারিক পদবির মিল না থাকা এবং অঞ্চলভেদে কয়েকটি সম্প্রদায়ের স্বীকৃতির ভিন্নতা নিয়ে মাঠপর্যায়ে অসন্তোষ ও ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে।
জরিপকারীরা বলছেন, সরকারি তালিকায় থাকা জনগোষ্ঠীর নামের সঙ্গে ব্যক্তির ব্যবহৃত পদবি না মিললে অনেকে গণনার বাইরে থেকে যেতে পারেন।
এ ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞরা মত হলো, আত্মপরিচয়, ইতিহাস ও সংস্কৃতির মতো সামাজিক বাস্তবতাগুলো বিবেচনায় না নিয়ে শুধু প্রশাসনিক নিয়মের জটিলতায় পরে জরিপে প্রকৃত জনমিতি ও সঠিক তথ্য নিরূপণ ব্যাহত হতে পারে।
সরকারের গেজেটভুক্ত ৫০টি জাতিগোষ্ঠীর সঠিক জনসংখ্যা নিরূপণে বিবিএস গত ১ অক্টোবর এ জরিপ শুরু করে। প্রাথমিকভাবে এটি ২৫ অক্টোবর শেষ হওয়ার কথা থাকলেও, পরে সময় বাড়িয়ে ৩০ অক্টোবর করা হয়।
মাঠপর্যায়ে জরিপকারীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তালিকায় থাকা জনগোষ্ঠীর নামের সঙ্গে অনেকের ব্যবহৃত পদবির হুবহু মিল না থাকায় অনেককে সংশ্লিষ্ট জনগোষ্ঠীর সদস্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার সুযোগ দেওয়া হচ্ছে না।
সিলেট বিভাগের বিভিন্ন এলাকায় অন্তত ১৫ জরিপকারী জানিয়েছেন, ৫০টি জনগোষ্ঠীর তালিকায় থাকা নির্ধারিত পদবীর সঙ্গে কারও পদবী না মিললে তাকে সেই পরিচয়ে অন্তর্ভুক্ত না করার নির্দেশনা রয়েছে।
কয়েকজন জরিপকারী সাংবাদিকদের জানান, অনেক পরিবার আগে যে পদবি ব্যবহার করত, সময়ের সঙ্গে তা হয়তো এখন আর নেই। কিন্তু জরিপের সফটওয়্যার বা তালিকায় নির্ধারিত নামের সঙ্গে মিল না থাকলে সেই পরিবারকে সংশ্লিষ্ট জনগোষ্ঠীর অধীনে অন্তর্ভুক্ত করার সুযোগ নেই।
এক জরিপকারী বলেন, ‘যাদের নামের সঙ্গে সরকার নির্ধারিত পদবি নেই, তিনি তালিকাভুক্ত জনগোষ্ঠীর অংশ হলেও আমরা সেটি ইনপুট দিতে পারি না।
এই পদ্ধতি নিয়ে সবচেয়ে বেশি উদ্বেগ তৈরি হয়েছে চা-বাগানে বসবাসকারী ও মধ্যে।
অপরদিকে, সরকারি গেজেটে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী হিসেবে স্বীকৃতি থাকলেও ঠাকুরগাঁও ও পঞ্চগড়ের কোচ ও বর্মণ জাতির মানুষদের জেলা প্রশাসকের প্রত্যয়ন ছাড়া জরিপে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি।
মৌলভীবাজার জেলার আদিবাসী ও অনগ্রসর জনগোষ্ঠী নিয়ে দুই দশকের বেশি সময় ধরে কাজ করছে দুর্বার উন্নয়ন সহায়ক সংস্থা (ডিইউএসএস)। সংস্থাটির চেয়ারম্যান রিংকু চক্রবর্ত্তী ও নির্বাহী পরিচালক তাপস কুমার ঘোষ জানান, চা-বাগানের বিভিন্ন আদিবাসী গোত্রের অর্ধেকের বেশি মানুষ শুধু পদবির কারণে সঠিকভাবে গণনায় অন্তর্ভুক্ত হতে পারছেন না।
উদাহরণ দিয়ে তিনি জানান, কোল জনগোষ্ঠীর মধ্যে কোল, কল, রাউতিয়া, রাউটেল, ঠাকুরিয়া, দাসাও ও দাসো পদবি ব্যবহৃত হয়। কড়া জনগোষ্ঠীর মধ্যে কড়া, মুদি, মোদি, সিং, কোড়া, কোড়ানী, কর্মি, নাগবংশী ও সদ্দার পদবি রয়েছে। তুরি জনগোষ্ঠীর মানুষের মধ্যে তুরি, মৃধা, শিং ও নায়েক পদবি ব্যবহারের কথা জানা যায়।
একইভাবে ওরাওঁ জনগোষ্ঠীর মানুষের মধ্যে ওরাওঁ, উরাং, জানি, লাকড়া, মিঞ্জ, টোপ্পো, এক্কা, তির্কী, কুজুর, বেক, বারোয়া, তিগা, কেরকেট্টা ও কিসপোট্টার মতো পদবি রয়েছে।
ভূমিজদের মধ্যে ভূমিজ, ভৌমিক, সরদার, সিং ও সিং ভূমিজ; মুসহরদের মধ্যে মুসহর, রিকিয়াশন, ভগত, মাঝি, ঋষিদেব, সাদা, ভুঁইয়া, রায় ও বনবাসী এবং বাগদীদের মধ্যে বাগদী, বাকতি, বাক্তি, বাগ, ধর, দলুই, পারিত, রায়, মাল ও লেট পদবি ব্যবহারের উদাহরণও দিয়েছে ডিইউএসএস।
ডিইউএসএস কর্মীরা জানান, মণিপুরি, খাসি, গারো বা ত্রিপুরা জনগোষ্ঠীর সবাই নামের শেষে নিজ নিজ জনগোষ্ঠীর নাম ব্যবহার করেন না। তারপরও তাদের জাতিগত পরিচয় নির্ধারণে শুধু পদবির ওপর নির্ভর করা হয় না।
তাদের মতে, চা-বাগানে বসবাসকারী অন্যান্য জনগোষ্ঠীর ক্ষেত্রেও একই বাস্তবতা বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।
তাদের দাবি, পদবির পাশাপাশি মানুষের আত্মপরিচয়, পারিবারিক ও সামাজিক ইতিহাস, ভাষা, সংস্কৃতি এবং সংশ্লিষ্ট জনগোষ্ঠীর সঙ্গে সম্পর্ক বিবেচনায় নিয়ে জরিপ করা হোক।
জরিপের ম্যানুয়ালে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে সরকারিভাবে স্বীকৃত ৫০টি ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী জাতিসত্তা রয়েছে। যেমন: গারো, কোচ, হাজং, বানাই, বর্মণ, হুদি, ডালু, সাঁওতাল, মণিপুরী, ত্রিপুরা ইত্যাদি। এ তালিকার বাইরে যারা জেলা প্রশাসনের সনদ নিয়ে নিজেদের ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী পরিচয় দিয়ে থাকে তাদের অন্যান্য হিসেবে টেক্সট আকারে নৃ-গোষ্ঠীর নাম লিখতে হবে।
তবে বর্মণ সম্প্রদায়ের একাংশের অভিযোগ, জরিপে তথ্য সংগ্রহকারীরা তাদের পরিবারের তথ্য ফরমের ৪.২ নম্বর ধারা অনুযায়ী লিখছেন।
ম্যানুয়াল অনুযায়ী, ৪.২ তখনই প্রয়োজন হবে, যখন কেউ সরকার স্বীকৃত ৫০টি জনগোষ্ঠীর বাইরে হন এবং নিজেকে আদিবাসী দাবি করেন এবং তার জেলা প্রশাসনের প্রত্যয়নপত্র আছে।
কিন্তু, ঠাকুরগাঁও ও পঞ্চগড়ের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে কোচ ও বর্মণ সম্প্রদায়ের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, জরিপে অন্তর্ভুক্ত হতে গিয়ে অনেকেই নানা বাধার মুখে পড়ছেন।
স্থানীয়রা জানান, বর্মণ ও কোচ সম্প্রদায়ের মানুষেরা বর্মণ, রায়, সিংহ, অধিকারী, সিনহা, সরকারসহ বিভিন্ন পদবি ব্যবহার করে থাকেন।
বর্মণ সম্প্রদায়ের সদস্যদের অভিযোগ, পদবী না মেলায় এবং জেলা প্রশাসকের সনদ না থাকার কারণে অনেক পরিবার জরিপের বাইরে থেকে যাচ্ছে।
পঞ্চগড়ের আটোয়ারী উপজেলার সোনাপাতিলা গ্রামের ২৬ বছর বয়সী অনুপম রায় (অনুপম বর্মণ নামেও পরিচিত) সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমরা আদিকাল থেকেই বর্মণ সম্প্রদায়ের মানুষ। কিন্তু ভোটার তালিকা তৈরি ও সরকারি বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহের সময় তথ্য সংগ্রহকারীরা ভুল করে আমাদের পদবি বর্মণের বদলে রায় লিখেছেন। এ থেকেই বিভ্রান্তির সৃষ্টি হয়েছে।
‘আমাদের পূর্বপুরুষদের জমির দলিলসহ পুরোনো সব নথিতে তাদের বর্মণ হিসেবে পরিচয় দেওয়া হয়েছে। আমার ১৮ বছর বয়সী ছোট বোন জবা রানীর জেলা প্রশাসকের দেওয়া সনদ থাকা সত্ত্বেও তথ্য সংগ্রহকারী তাকে ফরমের ৪.২ নম্বর ধারায় অন্তর্ভুক্ত করেছেন,’ বলেন তিনি।
ঠাকুরগাঁওয়ের রুহিয়া উপজেলার ২৬ বছর বয়সী সুকান্ত বর্মণ জানান, তার পরিবারের সদস্যরা জরিপে অন্তর্ভুক্ত হলেও, অনেক আত্মীয় বাদ পড়েছেন।সংবাদমাধ্যমকে তিনি বলেন, ‘বর্মণ জনগোষ্ঠী সরকারস্বীকৃত হওয়ার পরও জেলা প্রশাসকের প্রত্যয়নপত্র শর্ত দেওয়ার কারণে আমার দুই কাকুর পরিবার জরিপে অংশ নিতে পারেননি। বিষয়টি দাড়িয়েছে একই পরিবারের দুই ভাই আদিবাসী ও আর দুই ভাই আদিবাসী নন।
‘আমাদের এলাকায় কোচ ও বর্মণ জনগোষ্ঠী থেকে কোনো জরিপকারী না নেওয়া ও বিধিবর্হিভূত প্রত্যয়নের শর্ত আরোপের ফলে অসংখ্য পরিবারকে জরিপের বাইরে রেখে জাতিগত পরিচয় বিলুপ্তির চেষ্টা চলছে,’ দাবি করেন তিনি।
এ বিষয়ে জেলা ও বিভাগীয় পরিসংখ্যান কার্যালয়ের কর্মকর্তাদের দাবি, ঠাকুরগাঁও, পঞ্চগড়সহ উত্তরের কয়েকটি জেলায় বসবাসকারী বর্মণরা মূলত ক্ষত্রিয়। তাদের জীবনযাপন ও সংস্কৃতির সঙ্গে বাঙালিদের মিল থাকায় জরিপে তাদের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে না।
কর্মকর্তাদের ভাষ্য, টাঙ্গাইল, জামালপুর ও শেরপুরের বর্মণদের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য আলাদা। এ কারণে ওই এলাকার বর্মণদের সাধারণত ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সদস্য হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
তবে উত্তরের জেলাগুলোর বর্মণ সম্প্রদায়ের যারা জরিপে অন্তর্ভুক্ত হতে চান, তাদের তথ্য সংগ্রহের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন কর্মকর্তারা। এজন্য সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসকের দেওয়া ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সদস্য হিসেবে স্বীকৃতির সনদ দেখাতে হবে বলে জানান তারা।
ইউনেসকোর আন্তর্জাতিক আদিবাসী ভাষা দশকের (আইডিআইএল) গ্লোবাল টাস্কফোর্স সদস্য সমর এম সরেন সাংবাদিকদের বলেন, 'বিভিন্ন নৃ-গোষ্ঠীর আর্থসামাজিক পরিস্থিতি সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহের এই জরিপ নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। তবে মাঠপর্যায়ে এর বাস্তবায়ন নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন রয়েছে।'
আদিবাসী ভাষার এই গবেষক ও ভাষা প্রযুক্তিবিদের ভাষ্য, সমতলের কয়েকটি উপজেলায় মাত্র এক মাসের মধ্যে জরিপ শেষ করার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে ৬ জন তথ্যসংগ্রহকারীকে। অথচ কোনো কোনো ইউনিয়নেই আদিবাসী-অধ্যুষিত গ্রামের পরিবার সংখ্যা শতাধিক।
এত অল্প সময়ে ও সীমিত জনবল দিয়ে একটি উপজেলার প্রতিটি পরিবারের কাছে পৌঁছে নির্ভুল তথ্য সংগ্রহ করা কতটা সম্ভব, সেই প্রশ্ন তুলেছেন তিনি।
বিশেষ করে নৃ-গোষ্ঠীর পরিচয় নির্ধারণের বিষয়টি জটিল। ধর্ম, পেশা, ভাষা, সাংস্কৃতিক চর্চা ও স্থানীয় সামাজিক পরিচয়ের কারণে একই জনগোষ্ঠী বিভিন্ন নামে পরিচিত হতে পারে। আবার একই জনগোষ্ঠীর মানুষ নিজেদের ভিন্ন পরিচয়েও পরিচিত করতে পারেন।
ফলে মাঠপর্যায়ে এসব বাস্তবতা সম্পর্কে পর্যাপ্ত ধারণা না থাকলে কেউ গণনা থেকে বাদ পড়তে পারেন। একই সঙ্গে একটি জনগোষ্ঠীর মানুষ একাধিক পরিচয়ে তালিকাভুক্ত হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে।
জরিপের পূর্ণাঙ্গ পদ্ধতি নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন সমর এম সরেন। তার মতে, কমিউনিটির সদস্যদের পাশাপাশি উপজেলা পর্যায়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কাছেও জরিপের পদ্ধতি সম্পর্কে বিস্তারিত ধারণা স্পষ্ট নয় বলে মাঠপর্যায়ে জানা গেছে।
অথচ, সংবেদনশীল জনগোষ্ঠী নিয়ে এমন জরিপের শুরুতেই কয়েকটি বিষয় পরিষ্কার থাকা জরুরি। কাকে কোন জনগোষ্ঠীর সদস্য হিসেবে বিবেচনা করা হবে, পরিচয় কীভাবে যাচাই করা হবে, তথ্য কীভাবে সংরক্ষণ করা হবে এবং ভবিষ্যতে তা কীভাবে ব্যবহার ও প্রকাশ করা হবে, এসব বিষয়ে স্পষ্ট নির্দেশনা থাকা প্রয়োজন।
কারণ এখানে শুধু মানুষের সংখ্যা গণনা করা হচ্ছে না। তাদের পরিচয়, পরিবার, বসতি ও জীবনযাপনের গুরুত্বপূর্ণ তথ্যও সংগ্রহ করা হচ্ছে।
জরিপে খাসজমি বা খাসজলাশয়ের আশপাশে বসবাসকারী ভূমিহীন আদিবাসী পরিবারগুলোর অবস্থান, বসতি ও পারিবারিক তথ্যও সংগ্রহ করা হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন।
এ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে, এসব তথ্য কোথায় সংরক্ষণ করা হবে, কারা তা ব্যবহারের সুযোগ পাবেন এবং তথ্যের নিরাপত্তা কীভাবে নিশ্চিত করা হবে।
মাঠপর্যায়ে বসবাসকারী কিছু ভূমিহীন আদিবাসী এ ধরনের উদ্বেগের কথা জানিয়েছেন। তাদের আশঙ্কা, যেসব তথ্যের ভিত্তিতে সরকার তাদের সহায়তা করতে পারে, সেসব তথ্যই একসময় ভূমিদখলকারী বা স্বার্থান্বেষী ব্যক্তিদের হাতে গেলে তাদের বসতভিটা হারানোর ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
সিলেট বিভাগীয় পরিসংখ্যান অফিসের যুগ্ম পরিচালক মোহাম্মদ আজাদুর রহমান সাংবাদিকদের বলেন, কোনো জনগোষ্ঠী যেন তালিকা থেকে বাদ না পড়ে, সে বিষয়ে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, সরকারি তালিকায় থাকা নামের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে তথ্য সংগ্রহের পাশাপাশি তালিকার বাইরে কেউ যেন অন্তর্ভুক্ত না হন, সে বিষয়েও সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে।
তার ভাষ্য, কিছু বেসরকারি সংস্থা বা এনজিও নিজেদের পক্ষ থেকে নতুন কিছু অন্তর্ভুক্ত করতে চাইছে। তবে সরকারি তালিকার বাইরে কাউকে অন্তর্ভুক্ত না করার বিষয়ে তারা সতর্ক রয়েছেন।
আজাদুর রহমান আরও বলেন, এবার তথ্য সঠিকভাবে সংগ্রহের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। প্রয়োজন হলে ভবিষ্যতে আবারও জরিপ করা হবে।
কুলাউড়া উপজেলা পরিসংখ্যান কর্মকর্তা ফয়সল আহমেদ নিয়াজি বলেন, তালিকা থেকে বাদ পড়া ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার সুযোগ রয়েছে। যারা পদবি পরিবর্তনের জন্য জেলা প্রশাসকের (ডিসি) কার্যালয়ে যোগাযোগ করছেন, তারা সেখান থেকে প্রয়োজনীয় ছাড়পত্র নিয়ে পদবি সংশোধন করে নিবন্ধিত হতে পারবেন।
তিনি বলেন, তালিকা তৈরির জন্য ব্যবহৃত অ্যাপসটি বন্ধ হয়ে গেলেও ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ চাইলে পুনরায় অ্যাপসটি চালু করে বাদ পড়াদের অন্তর্ভুক্ত করার সুযোগ দিতে পারবেন। সেক্ষেত্রে তাদের তথ্য ডেটাবেজে যুক্ত করা সম্ভব হবে।
তিনি আরও বলেন, ‘ভুঁইয়া পদবিধারীরা তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হতে পারেননি। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হলেও এখনো কোনো সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা পাওয়া যায়নি। নির্দেশনা পেলেই ব্যবস্থা নিতে পারব।
পঞ্চগড়ের আটোয়ারী উপজেলায় তথ্য সংগ্রহের দায়িত্বে থাকা বিষু কিশকো বলেন, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা অনুযায়ী বর্মণ সম্প্রদায়ের সদস্যদের ফরমের ৪.২ নম্বর ধারায় তালিকাভুক্ত করা হয়েছে।
এ বিষয়ে ঠাকুরগাঁও জেলা পরিসংখ্যান কর্মকর্তা মো. ফয়সাল হাসান সাংবাদিকদের বলেন, ঠাকুরগাঁওয়ের বর্মণ সম্প্রদায়ের যাদের জেলা প্রশাসকের দেওয়া ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সদস্য হিসেবে স্বীকৃতির সনদ রয়েছে, তাদেরই জরিপে অন্তর্ভুক্ত হতে বলা হয়েছে।
রংপুর বিভাগীয় পরিসংখ্যান কার্যালয়ের যুগ্ম পরিচালক শফিকুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা অনুযায়ী তারা জরিপ পরিচালনা করছেন।
এ পর্যন্ত রংপুর বিভাগে বর্মণ সম্প্রদায়ের কতজনকে জরিপে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, তা জানাতে চাননি শফিকুল। তিনি বলেন, এ সংক্রান্ত পরিসংখ্যান ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ প্রকাশ করবে।
ঠাকুরগাঁওয়ের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ রফিকুল হক সাংবাদিকদের বলেন, আদিবাসী কল্যাণ সমিতির সুপারিশের ভিত্তিতে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সদস্য হিসেবে স্বীকৃতির সনদ দেওয়া হয়।
ঐতিহাসিক নথি অনুযায়ী, ব্রিটিশ ভারতের ১৮৭১-৭২ সালের আদমশুমারিতে কোচ, পালিয়া ও রাজবংশীদের অধিকাংশকে একই জনগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল। ওই আদমশুমারিতে বৃহত্তর পাবনা, বগুড়া, রাজশাহী, মালদহ, রংপুর ও দিনাজপুরে কোচ সম্প্রদায়ের মানুষের বসবাসের তথ্যও ছিল।
বর্তমানে বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলে কোচ সম্প্রদায়ের মানুষ বর্মণ, রায় ও সরকারসহ বিভিন্ন পদবি ব্যবহার করেন। ১৯৩১ সালের আদমশুমারিতেও উত্তরাঞ্চলের এ সম্প্রদায়কে একটি উপজাতি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল।
২০২২ সালের জনশুমারি অনুযায়ী, রংপুর বিভাগে বর্মণ সম্প্রদায়ের সদস্যসংখ্যা ৭ হাজার ৬৪৬। তবে সম্প্রদায়টির সদস্যদের দাবি, তাদের প্রকৃত জনসংখ্যা এর চেয়ে অনেক বেশি।
মাঠপর্যায়ে তথ্য সংগ্রহের সময়সীমা শেষ হয়ে গেলেও, জরিপে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার সুযোগ এখনো আছে বলে জানান প্রকল্প পরিচালক ও বিবিএসের উপপরিচালক ফারহানা সুলতানা।
জটিলতাগুলো নিয়ে মন্তব্য এবং এ জরিপের বিস্তারিত জানতে চাওয়া হলে তিনি সাংবাদিকদের জানান, সরকার স্বীকৃত বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর কেউ যদি পদবী বা জাতীয় পরিচয়পত্রের ভুলের কারণে জরিপ থেকে বাদ পড়ে যান, তারা সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসকের দপ্তরের মাধ্যমে সঠিকভাবে আবেদন করে জরিপে অন্তর্ভুক্ত হতে পারবেন।
‘চা বাগানের অনেকের এনআইডিতে পদবী ভুল আসছে। আমি বলেছি পদবী ভুল হলেও আমরা তাদেরকে জরিপে নিয়ে আসব। পদবীর কারণে কাউকে আমরা বাদ দেবো না,’ যোগ করেন তিনি।
বর্মণদের সমস্যার বিষয়ে ফারহানা সুলতানা বলেন, ‘তাদের ইস্যু নিয়ে ইতোমধ্যে উচ্চপর্যায়ে কথা বলে একটা সিদ্ধান্ত হয়েছে। বর্মণরা ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী হলেও, তাদের অনেক সিনিয়র সিটিজেন আছেন যারা নিজেদের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী না বলে ক্ষত্রিয় বর্মণ বলেন। এখন তাদের পরিবারের লোকদের তো আমরা জরিপে আনতে পারি না।
‘তারপরও আমরা যত অভিযোগ পাচ্ছি, সেগুলো যাচাই বাছাই করছি। যদি দেখি কারও পূর্বপুরুষরা ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠি হিসেবে পরিচিত ছিলেন, আমরা তাদের অন্তর্ভুক্ত করার সুপারিশ করছি। অনেকক্ষেত্রে বাঙালি পরিবার পাচ্ছি, যারা জরিপে ঢোকার চেষ্টা করছে, সে বিষয়ে আমরা সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসকের সঙ্গে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নিচ্ছি,’ যোগ করেন তিনি।



