ভিন্ন ধর্মের কারো সঙ্গে প্রেমের সম্পর্কে জড়িয়েছেন—এমন অভিযোগ তুলে ফেসবুকে ব্যক্তিগত তথ্য ফাঁস করার ঘটনা ঘটেছে। যাদের তথ্য ফাঁস হয়েছে, তাদের অনেকে এখন নানা ধরনের হুমকি, হয়রানি ও ব্ল্যাকমেইলিংয়ের মুখে পড়ছেন। তথ্য যাচাইকারী প্রতিষ্ঠান ডিসমিসল্যাবের অনুসন্ধানে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
৩১ অক্টোবর প্রকাশিত অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে দেখা যায়, চলতি বছরের ১ জুন থেকে ৩১ আগস্টের মধ্যে ২৩টি ফেসবুক পেজ থেকে ২৮৮টি পোস্ট করা হয়েছে, যেখানে ‘ভাগওয়া লাভ ট্র্যাপ’ নামে পরিচিত একটি ষড়যন্ত্র তত্ত্ব প্রচারের পাশাপাশি ব্যক্তিগত তথ্য ফাঁস করা হয়েছে।
পোস্টগুলোতে সেই ব্যক্তিদের ছবি, নাম, বাড়ির ঠিকানা, ফোন নম্বর ও সোশ্যাল মিডিয়া প্রোফাইল উল্লেখ করে দেওয়া হয়েছে, যাদের বিরুদ্ধে মুসলিম নারী ও হিন্দু পুরুষের মধ্যে প্রেমের সম্পর্কের অভিযোগ আনা হয়েছিল।
অনুসন্ধানে ডিসমিসল্যাব দেখেছে, এই প্রচারণার পেছনে রয়েছে একটি ভিত্তিহীন ষড়যন্ত্রের গল্প। এতে অভিযোগ তোলা হয়, হিন্দু পুরুষরা মুসলিম নারীদের ধর্মান্তরিত করার উদ্দেশ্যে পরিকল্পিতভাবে তাদের প্রেমের সম্পর্কে জড়ানোর চেষ্টা করে।
ভারতে ‘লাভ জিহাদ’ নামে একটি বিতর্কিত ষড়যন্ত্র তত্ত্ব প্রচলিত আছে, যেখানে মুসলিম পুরুষদের বিরুদ্ধে প্রেমের সম্পর্কের মাধ্যমে হিন্দু নারীদের ধর্মান্তরিত করার অভিযোগ তোলা হয়। এই ষড়যন্ত্রতত্ত্বের পাল্টা একটি ষড়যন্ত্রতত্ত্ব হিসেবে ‘ভাগওয়া লাভ ট্র্যাপ’-এর বয়ানটি সামনে আসে।
ডিসমিসল্যাবের গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশে এসব ভিত্তিহীন অভিযোগ ব্যবহার করে নির্দিষ্ট ব্যক্তিদের শনাক্ত করা হচ্ছে এবং জনসমক্ষে তাদের হেয় প্রতিপন্ন ও ব্যক্তিগত তথ্য ফাঁস করে দেওয়া হচ্ছে।
অনুমতি ছাড়া কারও ব্যক্তিগত তথ্য ফাঁস করে দেওয়াকে সাধারণত ‘ডক্সিং’ বলা হয়। এটি ভুক্তভোগীদের অনলাইন হয়রানি এবং বাস্তব জীবনে নিরাপত্তার ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিতে পারে।
অনুসন্ধানকারীরা প্রাথমিকভাবে ৫৪টি ফেসবুক পেজ থেকে ‘ভাগওয়া লাভ ট্র্যাপ’ সক্রান্ত ৩ হাজার ৮২৮টি পোস্ট যাচাই করেছেন।
এর মধ্যে ২৩টি পেজ থেকে এমন ২৮৮টি পোস্ট খুঁজে পাওয়া গেছে, যেখানে ব্যক্তিগত তথ্য রয়েছে। একই পোস্ট বারবার গণনা না করে গবেষকেরা স্বতন্ত্র ১৯৪টি পোস্ট খুঁজে পেয়েছেন।
এসব পোস্টের প্রায় ৯৭ শতাংশে ছবি, ৫৫ শতাংশে নাম এবং ৩০ শতাংশে বাড়ির ঠিকানা দেওয়া ছিল।
এ ছাড়া, ১৬ শতাংশ পোস্টে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের প্রোফাইল লিংক এবং ৬ শতাংশ পোস্টে মোবাইল নম্বর দেওয়া ছিল।
পোস্টগুলোর অর্ধেকেরও বেশি (৫৩ শতাংশ) এমন ছিল, যেখানে একজন নারী ও একজন পুরুষকে চিহ্নিত করে তাদের বিরুদ্ধে ভিন্নধর্মাবলম্বীর সঙ্গে প্রেমের সম্পর্কে জড়ানোর অভিযোগ আনা হয়েছে।
অন্য পোস্টগুলোতে কেবল একজনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে।
ডিসমিসল্যাবের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, কিছু পোস্টে পাঠকদের আহ্বান জানানো হয়, যেন তারা অভিযুক্তদের বর্তমান অবস্থান খুঁজে বের করেন। এতে তাদের হয়রানি ও ভয়ভীতি দেখানোর ঝুঁকি আরও বেড়ে গেছে।
গবেষকরা পোস্টের সঙ্গে থাকা প্রতিটি ছবি বা অভিযোগের সত্যতা স্বতন্ত্রভাবে যাচাই করতে পারেননি।
অনুসন্ধানে এমন ব্যক্তিদের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরা হয়েছে, যাদের ব্যক্তিগত তথ্য অনলাইনে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল।
ফাতেমা (ছদ্মনাম) নামে এক তরুণী দেখতে পান, ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে নানা অপতথ্য রটানোর পাশাপাশি ফেসবুকে তার ছবি, ফোন নম্বর এবং বাড়ির ঠিকানা ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। তিনি তার নিজের ও পরিবারের নিরাপত্তা নিয়ে চরম ভয়ের কথা জানিয়েছেন।
নিজের পরিস্থিতির বর্ণনা দিতে গিয়ে তিনি ডিসমিসল্যাবকে বলেন, ‘আমি এখন চোরের মতো লুকিয়ে আছি।
পোস্টগুলোতে দেওয়া ফোন নম্বর ধরে ১২ জনের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন অনুসন্ধানকারীরা। তাদের মধ্যে দুজন জানান, এসব অভিযোগ বা পোস্টের সঙ্গে তাদের কোনো সম্পর্কই নেই। অন্যরা জানিয়েছেন, এভাবে টার্গেট হওয়ার ফলে তারা মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছেন।
ভুক্তভোগীরা হুমকি, অনাকাঙ্ক্ষিত যোগাযোগ, হয়রানি ও ব্ল্যাকমেইলের শিকার হওয়ার কথা জানিয়েছেন। নিরাপত্তা ঝুঁকি ও সামাজিকভাবে হেয় হওয়ার ভয়ে অনেকে তাদের প্রাত্যহিক রুটিন বদলে ফেলেছেন। আবার অনেকে পড়াশোনাও বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়েছেন।
একজন জানিয়েছেন, তার ব্যক্তিগত তথ্য ছড়িয়ে পড়ায় তার পেশাগত ও পারিবারিক জীবন পুরোপুরি বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে।
আরেক ভুক্তভোগী জানিয়েছেন, তার মোবাইলে কল এলেই তিনি হুমকি পাওয়ার আশঙ্কায় আতঙ্কিত হয়ে পড়েন।
ডিসমিসল্যাবের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, অল্প কয়েকটি ফেসবুক পেজ থেকেই এই ধরনের বেশির ভাগ পোস্ট করা হয়েছে। গবেষণায় চিহ্নিত ২৮৮টি পোস্টের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশই মাত্র পাঁচটি পেজ থেকে প্রকাশ করা হয়েছে।
২৩ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এই পোস্টগুলোতে মোট রিয়্যাক্ট, কমেন্ট ও শেয়ারের সংখ্যা ছিল ১ লাখ ৯ হাজার ৮১৫। এর মধ্যে ‘মোল্লার আলো’ নামে একটি ফেসবুক পেজের ২০টি পোস্টেই ৩৮ হাজারের বেশি ইন্টার্যাকশন দেখা গেছে, যা এই পুরো অনুসন্ধানে নথিভুক্ত মোট এনগেজমেন্টের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ।
অনুসন্ধানকারীরা ‘সেভ মুসলিম গার্লস’ নামে একটি ওয়েবসাইটও খুঁজে পেয়েছেন, যেখানে মুসলিম নারী ও হিন্দু পুরুষের কথিত সম্পর্ক নিয়ে বিভিন্ন তথ্য প্রকাশ করা হয়।
ওয়েবসাইটটিতে এমন সম্পর্কে জড়িত বলে অভিযুক্ত নারীদের একটি তালিকা দেওয়া হয়েছে, যা ভৌগোলিক অবস্থান অনুযায়ী সাজানো। এর কনটেন্টে বিভিন্ন আপত্তিকর বর্ণনার পাশাপাশি পাঠকদের উৎসাহিত করা হয়েছে যেন তারা অভিযুক্তদের পরিচয় বা ব্যক্তিগত তথ্য সরবরাহ করেন।
এই অনুসন্ধানের মাধ্যমে সামনে এসেছে, অনলাইনে ষড়যন্ত্রমূলক প্রচারণা চালিয়ে কীভাবে মানুষকে জনসমক্ষে হেয় করা এবং তাদের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা নষ্ট করা হচ্ছে।
মেটার কমিউনিটি স্ট্যান্ডার্ডস অনুযায়ী, নির্দিষ্ট কিছু ব্যক্তিগত তথ্য—যেমন: ফোন নম্বর ও বাড়ির ঠিকানা প্রকাশে বিধিনিষেধ রয়েছে। কিন্তু, কিছু বিশেষ ক্ষেত্রে এর ব্যতিক্রম রয়েছে।
ডিসমিসল্যাবের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ব্যক্তিগত তথ্য সংবলিত এই পোস্টগুলো ফেসবুক থেকে সরানো হয়নি, বরং সেগুলো অনলাইনেই রয়ে গেছে।
তবে, মেটার নিজস্ব স্বয়ংক্রিয় সিস্টেম বা মডারেটররা এই পোস্টগুলো শনাক্ত বা পর্যালোচনা করেছে কি না, তা এই নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
ভুক্তভোগীদের মধ্যে যারা সাক্ষাৎ দিয়েছেন, তাদের কেউই ফেসবুক কর্তৃপক্ষের কাছে এই পোস্টগুলোর বিরুদ্ধে রিপোর্ট করেননি। অনেকে জানিয়েছেন, পোস্টগুলোর সরাসরি লিঙ্ক তাদের কাছে নেই। আবার অনেকে নিরাপত্তার ভয়ে ফেসবুক ব্যবহার করাই ছেড়ে দিয়েছেন।
অনুসন্ধানকারীরা আরও জানিয়েছেন, এসব পেজ কারা পরিচালনা করছে বা এই কার্যক্রমের পেছনে কোনো সুসংগঠিত চক্র আছে কি না, তা শনাক্ত করা তাদের পক্ষে সম্ভব হয়নি।



