কর্মক্ষম বিশাল জনগোষ্ঠী থাকা সত্ত্বেও ধীরগতিতে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, শ্রমখাতে নারীদের কম অংশগ্রহণ ও দক্ষতার ঘাটতির কারণে বাংলাদেশ অনুকূল জনমিতির সুবিধা নিতে পারছে না। এতে উচ্চ উৎপাদনশীলতা ও প্রবৃদ্ধি অর্জনে ব্যর্থ হচ্ছে দেশটি।
আজ মঙ্গলবার বিশ্বব্যাংকের প্রকাশ করা এক প্রতিবেদনে এ কথা বলা হয়েছে।
'ডেমোগ্রাফিক চেঞ্জ ইন সাউথ এশিয়া: ফ্রম টেলউইন্ডস টু হেডউইন্ডস ফর ডেভেলপমেন্ট' শীর্ষক এ প্রতিবেদনে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সুবিধা হারানোর ঝুঁকিতে আছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রক্ষেপণ অনুযায়ী, ২০৪৫ সালে বাংলাদেশে কর্মক্ষম জনসংখ্যার অনুপাত সর্বোচ্চ হবে। ফলে এই ডেমোগ্রাফিক ট্রানজিশন বা জনমিতিক পরিবর্তনের সুফল পুরোপুরি কাজে লাগাতে বাংলাদেশ সময় পাবে প্রায় দুই দশক।
কিন্তু, যথেষ্ট কর্মসংস্থান তৈরি, শ্রমিকদের বাজার উপযোগী দক্ষতায় তৈরি করা এবং উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর জন্য জরুরি সংস্কার প্রয়োজন বলে মনে করে বিশ্বব্যাংক।
একইসঙ্গে বয়স্ক জনসংখ্যার চাপ সামলাতে স্বাস্থ্যসেবা ও সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থা জোরদার করা আবশ্যক বলেও উল্লেখ করা হয়েছে প্রতিবেদনে।
এতে বলা হয়, ২০৫১ সালের মধ্যে বাংলাদেশে জনসংখ্যার একটি বড় অংশজুড়ে থাকবে ৬৫ বছর বা তার বেশি বয়সী মানুষ। মাথাপিছু আয়ের তুলনামূলক নিম্নস্তরে থাকতেই এই রূপান্তরটি ঘটবে, যা দেশটির ক্রমবর্ধমান বয়স্ক জনগোষ্ঠীর জন্য সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার সক্ষমতা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়েছে যে, বাংলাদেশ এখনো অনুকূল জনসংখ্যা বিন্যাসকে কর্মসংস্থান ও উৎপাদনশীলতার বৃদ্ধিতে পুরোপুরি কাজে লাগাতে পারেনি।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশের মোট শ্রমশক্তির প্রায় ৮৪ শতাংশ বা আনুমানিক ৫ কোটি ৮০ লাখ মানুষ অনানুষ্ঠানিক খাতে কর্মরত।
একদিকে, আনুষ্ঠানিক খাতে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো অত্যন্ত ধীরগতিতে কর্মসংস্থান তৈরি করছে। অন্যদিকে, ছোট প্রতিষ্ঠানগুলোতে সাম্প্রতিক সময়ে গড়ে শ্রমিক সংখ্যা কমেছে। এমনকি উচ্চশিক্ষাও আনুষ্ঠানিক খাতে কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা দিতে পারছে না।
শ্রমখাতে নারীদের কম অংশগ্রহণ এবং শিক্ষা-দক্ষতার ধারাবাহিক ঘাটতি দেশের এই বিশাল কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর সুবিধা নেওয়ার সক্ষমতাকে আরও সীমিত করে দিচ্ছে।
বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ-ভুটান অঞ্চলের বিভাগীয় পরিচালক জ্যঁ পেসমে বলেন, 'বাংলাদেশের ডেমোগ্রাফিক সুযোগ নির্ভর করছে দেশটি এখন কী ধরনের কার্যক্রম নিচ্ছে তার ওপর। প্রতিষ্ঠানগুলোকে ভালো মানের কর্মসংস্থান তৈরিতে সহায়তা করা, তরুণদের বাজার উপযোগী দক্ষতায় রূপান্তর করা এবং নারীদের কর্মক্ষেত্রে আসার পথের বাধাগুলো দূর করা।'
তিনি আরও বলেন, বয়স্ক জনসংখ্যার জন্য বাংলাদেশের স্বাস্থ্যসেবা এবং বৃদ্ধদের সামাজিক নিরাপত্তা জোরদার করা প্রয়োজন। এই পরিবর্তনের ফলে তৈরি হওয়া ক্রমবর্ধমান অর্থায়নের চাহিদা মেটাতে অভ্যন্তরীণ সম্পদ সংগ্রহ বাড়াতে হবে।
প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়েছে, দক্ষিণ এশিয়ার ডেমোগ্রাফিক সুবিধা ইতোমধ্যে দুর্বল হতে শুরু করেছে। এ অঞ্চলের কর্মক্ষম জনসংখ্যা বর্তমানে প্রায় ১১৭ কোটি। এক দশকের কম সময়ের মধ্যে এটি সর্বোচ্চ চূড়ায় পৌঁছাবে এবং এরপর সংকুচিত হতে শুরু করবে।
প্রক্ষেপণ অনুযায়ী, ২০৪৯ সালের মধ্যে দক্ষিণ এশিয়া বয়স্কদের অঞ্চলে পরিণত হবে, যেখানে মোট জনসংখ্যার ১৪ শতাংশের বয়স হবে ৬৫ বছর বা তার বেশি। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ২০৫১ সালে এই পর্যায়ে পৌঁছানোর কথা রয়েছে।
বিশ্বব্যাংকের দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক ভাইস প্রেসিডেন্ট জোহানেস জুট বলেন, 'দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর অর্থনীতি উন্নয়নের তুলনায় দ্রুত এবং আগেই বার্ধক্যের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।'
প্রতিবেদনে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে পেনশন ও স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার বড় ধরনের দুর্বলতার কথা তুলে ধরা হয়েছে।
এ অঞ্চলের কর্মক্ষম জনসংখ্যার মাত্র ১৭ শতাংশ পেনশন স্কিমে অবদান রাখেন, অন্যদিকে বয়স্কদের মধ্যে মাত্র ১০ শতাংশ পেনশন সুবিধা পান—যা বিশ্বের সর্বনিম্ন। একইসঙ্গে দীর্ঘায়ু লাভ করা মানুষদের স্বাস্থ্যসেবা এবং দীর্ঘমেয়াদী সেবাগুলোও অপর্যাপ্ত বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।



