শচীন টেন্ডুলকার ও ব্রায়ান লারা।
নব্বইয়ের দশকে ব্রিটিশদের মধ্যে বিতর্ক ছিল ‘ব্লার নাকি ওয়েসিস’—কোন ব্যান্ড সেরা? ক্রিকেটপ্রেমীদের আলোচনায় তখন তেমনই এক প্রশ্ন ঘুরে ফিরেছে—ব্রায়ান লারা নাকি শচীন টেন্ডুলকার, টেস্ট ক্রিকেটে কে সেরা?
দুই দশক পেরিয়েও এই বিতর্কের অবসান হয়নি। একদিকে মুম্বাইয়ের ক্রিকেট মাঠ থেকে উঠে আসা শচীন টেন্ডুলকার, যিনি হয়ে উঠেছিলেন রানের এক নিরলস যন্ত্র। টেস্ট ইতিহাসে ২০০ ম্যাচ খেলা একমাত্র ক্রিকেটারও তিনি। অন্যদিকে ক্যারিবীয় ক্রিকেটের রাজপুত্র ব্রায়ান লারা, যার ব্যাটিংয়ে ছিল শৈল্পিক সৌন্দর্য ও আক্রমণাত্মক মানসিকতার অনন্য মিশেল।
লারার বেড়ে ওঠার ধরন ছিল কিছুটা আলাদা। ১১ ভাইবোনের মধ্যে দশম লারা প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণের পাশাপাশি পাড়ার ক্রিকেট থেকেও নিজের খেলার ধরন তৈরি করেছিলেন। অন্যদিকে শচীনের ক্রিকেটীয় শিক্ষা ছিল অনেক বেশি নিয়মতান্ত্রিক। তার কোচ রমাকান্ত আচরেকর সব সময় নিখুঁত ও প্রচলিত ব্যাটিং কৌশলের ওপর গুরুত্ব দিতেন।
দুজনের বেড়ে ওঠার পার্থক্য তাদের ব্যাটিংয়েও স্পষ্ট ছিল। লারার ব্যাটিংয়ে ছিল স্বতঃস্ফূর্ততা ও আগ্রাসন, আর শচীন ছিলেন অনেক বেশি পরিকল্পিত ও হিসেবি। ইংল্যান্ডের সাবেক অধিনায়ক মাইকেল আথারটনের মতে, ব্যাটিংয়ের সৌন্দর্য ও দর্শকদের মুগ্ধ করার ক্ষমতায় লারার মতো আকর্ষণীয় খেলোয়াড় খুব কমই এসেছেন।
টেস্টে সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত রানের রেকর্ড দুবার ভেঙেছেন লারা। ১৯৯৪ সালে ৩৭৫ এবং ২০০৪ সালে অপরাজিত ৪০০ রান করেন তিনি। তবে তার সেরা পাঁচটি ইনিংসের তালিকাতেও এই দুই মহাকাব্যিক ইনিংস জায়গা পাবে কি না, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।
১৯৯৯ সালে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথম টেস্টে মাত্র ৫১ রানে অলআউট হয়েছিল ওয়েস্ট ইন্ডিজ। দ্বিতীয় টেস্টে মাঠে নামার আগে ২১ মাস ধরে টেস্টে কোনো সেঞ্চুরি পাননি লারা। জ্যামাইকায় ম্যাচের টসের সময় অস্ট্রেলিয়ার অধিনায়ক স্টিভ ওয়াহকে তিনি বলেছিলেন, ‘হয়ত এটাই শেষবার আমি এমন কিছু করছি।
প্রথম দিনের শেষ দিকে ৫ রানে ২ উইকেট হারানো ওয়েস্ট ইন্ডিজের হয়ে ব্যাট করতে নামেন লারা। কিছুক্ষণের মধ্যেই দলের স্কোর দাঁড়ায় ৩৪ রানে ৪ উইকেট। গ্যালারির দর্শকদের দুয়োধ্বনির পাশাপাশি ডান কনুইয়ের চোটও সামলাতে হচ্ছিল তাকে।
অস্ট্রেলিয়ার বোলিং আক্রমণে ছিলেন গ্লেন ম্যাকগ্রা, শেন ওয়ার্ন, জেসন গিলেস্পি ও স্টুয়ার্ট ম্যাকগিলের মতো তারকারা। কিন্তু সব প্রতিকূলতা পেরিয়ে দ্বিতীয় দিন শেষ পর্যন্ত অপরাজিত থাকেন লারা। তার ২১৩ রানের অসাধারণ ইনিংসে ঘুরে দাঁড়িয়ে ম্যাচ জেতে ওয়েস্ট ইন্ডিজ। ক্যারিবীয় ক্রিকেটের কিংবদন্তি ধারাভাষ্যকার টনি কোজিয়ার মতে, এটি ছিল ওয়েস্ট ইন্ডিজ ক্রিকেট ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইনিংস।
এর পরের টেস্টেই বার্বাডোজে আরও বড় কীর্তি গড়েন লারা। জয়ের জন্য ৩০৮ রানের লক্ষ্য পাওয়া ওয়েস্ট ইন্ডিজের হয়ে চতুর্থ ইনিংসে ব্যাট করতে নামেন তিনি, যখন দলের স্কোর ৭৮ রানে ৩ উইকেট।
টেস্টের চতুর্থ ইনিংসে রান তাড়া করার মধ্যে আলাদা এক রোমাঞ্চ রয়েছে। কারণ, এ সময় ব্যাটসম্যানদের সামনে জয়ের জন্য প্রয়োজনীয় রানের হিসাব পরিষ্কার থাকে। তবে ক্ষয়িষ্ণু পিচ, প্রতিপক্ষের বোলিং এবং ইতিহাসের চাপ—সবকিছুর সঙ্গে লড়াই করতে হয় তাদের।
পঞ্চম দিনের খেলা শুরুর আগে অপরাজিত ২ রানে ছিলেন লারা। ঘুম না আসায় এক পুরোনো বন্ধুকে নিজের হোটেল কক্ষে ডেকে নেন তিনি। দুজনে মিলে দেখেন ১৯৯৩ সালে সিডনিতে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে করা তার ২৭৭ রানের ইনিংস এবং জ্যামাইকায় আগের টেস্টের ডাবল সেঞ্চুরির ভিডিও। এরপর কীভাবে রান তাড়া করবেন, কাকে আক্রমণ করবেন আর কার বিপক্ষে সতর্ক থাকবেন, সেই পরিকল্পনা সাজান।
মাঠে নেমে পরিকল্পনা অনুযায়ীই ব্যাট করেন লারা। শুরুতে পেসারদের বিপক্ষে সতর্ক থাকলেও স্পিনারদের বিরুদ্ধে আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠেন। প্রথম ওভারেই ম্যাকগিলকে তিনটি চার মারেন। এরপর ওয়ার্নকে বিশাল ছক্কায় সীমানাছাড়া করেন।
তবে লারার সামনে সবচেয়ে বড় সমস্যা ছিল অন্য প্রান্তে সঙ্গীর অভাব। জিমি অ্যাডামসের ৩৮ রান ছাড়া দলের আর কেউ ৩৮-এর বেশি করতে পারেননি। একপর্যায়ে ২৩৮ রানে ৫ উইকেট থেকে ওয়েস্ট ইন্ডিজের স্কোর দাঁড়ায় ২৪৮ রানে ৮ উইকেট। জয়ের জন্য তখনো প্রয়োজন ৬০ রান।
এরপরও হাল ছাড়েননি লারা। স্পিনারদের বিপক্ষে ওভারের শুরুতেই বাউন্ডারি মারার চেষ্টা করেন, যাতে শেষ দিকে টেলএন্ডার কার্টলি অ্যামব্রোসকে কম বল খেলতে হয়। অ্যামব্রোস আউট হলে ক্রিজে আসেন কোর্টনি ওয়ালশ। জয়ের জন্য তখন প্রয়োজন মাত্র ৬ রান। কিন্তু ওয়ালশ ছিলেন ব্যাটিংয়ে বেশ দুর্বল। তাকে কীভাবে বল মোকাবিলা করতে হবে, প্রতিটি বলের আগে ক্রিজে গিয়ে বুঝিয়ে দেন লারা।
দুই দলের রান সমান হওয়ার পর গ্যালারিতে লারার নামে স্লোগান উঠতে থাকে। শেষ পর্যন্ত গিলেস্পির বল এক্সট্রা কভারের ওপর দিয়ে সীমানাছাড়া করেন তিনি। এরপর দুই হাত উঁচিয়ে মাঠে দৌড় দেন। দর্শকেরা আনন্দে মাঠে নেমে আসেন। অপরাজিত ১৫৩ রানের সেই ইনিংসকে টেস্ট ইতিহাসের অন্যতম সেরা চতুর্থ ইনিংস হিসেবে বিবেচনা করা হয়। অনেকের মতে, এটিই লারার ক্যারিয়ারের সেরা ইনিংস।
স্পিনারদের বিপক্ষে লারার দাপটের আরেকটি বড় উদাহরণ ২০০১ সালে শ্রীলংকা সফর। মুত্তিয়া মুরালিধরনের ঘরের মাঠে তিন টেস্টে ৬৮৮ রান করেন তিনি। কলম্বোতে শেষ দুই টেস্টে তার ব্যাট থেকে আসে ২২১ ও ১৩০ রান। সিরিজে দলের মোট রানের ৫৩.৮৩ শতাংশ একাই করেন লারা, যা টেস্ট সিরিজে একজন ব্যাটসম্যানের সর্বোচ্চ অবদান। তবে এত কিছুর পরও ৩-০ ব্যবধানে সিরিজ হারে ওয়েস্ট ইন্ডিজ।
এটাই ছিল ক্যারিয়ারের শেষ দিকে লারার সবচেয়ে বড় আক্ষেপ। তার অসাধারণ ব্যাটিং অনেক সময় দলের হার বিলম্বিত করত, কিন্তু পরাজয় ঠেকাতে পারত না। টেস্টে তার ১৪টি সেঞ্চুরি এসেছে পরাজিত ম্যাচে, যা একটি অনাকাঙ্ক্ষিত রেকর্ড।
ক্যারিয়ারের শুরুর দিকে শচীনকেও প্রায় একই পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। ১৯৮৯ থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত প্রথম ৪৪টি অ্যাওয়ে টেস্টে ১৩টি সেঞ্চুরি করেন তিনি, গড় ছিল ৫৩.৫৭। কিন্তু সেই ম্যাচগুলোর মধ্যে ভারত জিতেছিল মাত্র একটিতে।
১৯৯৯ সালে লারার অপরাজিত ১৫৩ রানের ইনিংসের দুই মাস আগে পাকিস্তানের বিপক্ষে চেন্নাই টেস্টে প্রায় একই রকম পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছিলেন শচীন। চতুর্থ ইনিংসে ২৭১ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে মাত্র ৬ রানে ২ উইকেট হারায় ভারত। প্রচণ্ড গরম, তীব্র পিঠের ব্যথা এবং পাকিস্তানের শক্তিশালী বোলিং আক্রমণের বিপক্ষে একাই লড়াই করেন শচীন।
সুইং ও রিভার্স সুইং সামলে দারুণ সব ড্রাইভ খেলেন তিনি। স্পিনের বিপক্ষেও ছিলেন সাবলীল। এক ওভারে সাকলায়েন মুশতাককে চারটি চার মারেন। শেষ পর্যন্ত ১৩৬ রানের দুর্দান্ত ইনিংস খেলেও দলকে জেতাতে পারেননি শচীন। জয়ের মাত্র ১৭ রান আগে আউট হন তিনি। এরপর দ্রুত অলআউট হয়ে যায় ভারত।
লারার অপরাজিত ১৫৩ এবং শচীনের ১৩৬ রানের মধ্যে ব্যবধান ছিল মাত্র ১৭। ক্রিকেট বিশ্লেষক সিদ্ধার্থ বৈদ্যনাথন লিখেছিলেন, ‘১৫৩ ও ১৩৬-এর মাঝের এই ১৭ রানই যেন দুই কিংবদন্তির শ্রেষ্ঠত্বের ব্যবধান।’ শচীন যদি ওই ম্যাচে দলকে জেতাতে পারতেন, তাহলে দুই ইনিংসের তুলনা হয়ত অন্য রকম হতো।
তবে জয়ের ম্যাচেও শচীন অসংখ্য স্মরণীয় ইনিংস খেলেছেন। ১৯৯৮ সালে চেন্নাইয়ে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথম ইনিংসে ৭১ রানে পিছিয়ে থাকা ভারতকে সামনে থেকে নেতৃত্ব দেন তিনি। অপরাজিত ১৫৫ রানের ইনিংসে ম্যাচের চিত্র বদলে দেন শচীন।
শচীনের ব্যাটিং দেখে অস্ট্রেলিয়ার অধিনায়ক মার্ক টেলরকে শেন ওয়ার্ন বলেছিলেন, ‘আমাদের অবস্থা শেষ!’ ওয়ার্নের বোলিং মোকাবিলার জন্য নেটে লেগ স্টাম্পের বাইরের অংশে খসখসে জায়গা তৈরি করে অনুশীলন করেছিলেন শচীন। ম্যাচে কখনো রাফ ব্যবহার করে লেগ সাইডে শট খেলেছেন, আবার কখনো দেরিতে খেলে অফ সাইডে রান করেছেন। ১৯৯৮ সালের সেই সিরিজে ১১১.৫ গড়ে ৪৪৬ রান করেছিলেন তিনি।
২০০৮ সালে আবারও চেন্নাইয়ে ম্যাচ জেতানো সেঞ্চুরি করেন শচীন। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ৩৮৭ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে ১৪১ রানে ২ উইকেট হারায় ভারত। এরপর অপরাজিত ১০৩ রানের ইনিংস খেলে দলকে জয় এনে দেন তিনি। এটি ছিল ভারতের টেস্ট ইতিহাসে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ সফল রান তাড়া করে পাওয়া জয়। মুম্বাইয়ে সন্ত্রাসী হামলার পর সেই জয় ভারতীয়দের জন্য বিশেষ আবেগের মুহূর্ত হয়ে উঠেছিল।
মাত্র ১৬ বছর বয়সে টেস্ট অভিষেকের পর থেকেই শচীনকে ঘিরে ছিল প্রত্যাশা ও চাপ। দিনের বেলায় বাইরে বের হওয়াও তার জন্য কঠিন হয়ে পড়েছিল। তবে শচীনের কাছে মানুষের প্রত্যাশা কখনো বোঝা হয়ে ওঠেনি। বরং তিনি বলেছিলেন, মানুষ তার কাছে কিছু আশা করে—এ বিষয়টি তিনি উপভোগ করতেন।
অন্যদিকে শচীন খেলতেন কোটি মানুষের প্রত্যাশা নিয়ে, আর লারার কাঁধে ছিল ওয়েস্ট ইন্ডিজের আত্মসম্মান রক্ষার দায়িত্ব। টেস্ট ক্রিকেটে ডন ব্র্যাডম্যান ও জর্জ হেডলির পর নিজের দলের মোট রানের তুলনায় সবচেয়ে বেশি অবদান রাখা ব্যাটসম্যানদের একজন লারা।
শচীনের শ্রেষ্ঠত্বের অন্যতম কারণ ছিল পরিস্থিতি অনুযায়ী নিজের ব্যাটিংয়ে পরিবর্তন আনার ক্ষমতা। ২০০৩-০৪ সালে অস্ট্রেলিয়া সফরে রানখরার পর সিডনি টেস্টে কভার ড্রাইভ না খেলার সিদ্ধান্ত নেন তিনি। কথা রেখেছিলেন শচীন। অপরাজিত ২৪১ রান করেন, যার মধ্যে ১৮৮ রানই আসে লেগ সাইড থেকে।
পরিসংখ্যানে লারার সঙ্গে শচীনের তুলনা বেশ জটিল। ক্যারিয়ার গড়ে শচীন সামান্য এগিয়ে থাকলেও বাংলাদেশ ও জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ম্যাচ বাদ দিলে লারার গড় ছিল ৫২.৫৩, শচীনের ৫১.০১। ২০১১ বিশ্বকাপের পর শচীন অবসর নিলে তার ক্যারিয়ার গড় আরও বেশি থাকত বলেও বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে।
ব্যাটিং পজিশনেও দুজনের মধ্যে পার্থক্য ছিল। শচীন বেশির ভাগ সময় চার নম্বরে ব্যাট করলেও লারা ছিলেন তিন নম্বরে বেশি সফল। ৪৫ টেস্টে তিন নম্বরে ব্যাট করে ৬০.৪৬ গড় ছিল তার। ১৯৪৫ সালের পর থেকে টেস্টে তিন নম্বর ব্যাটসম্যানদের গড় চার নম্বরের তুলনায় প্রায় আড়াই রান কম। সে বিবেচনায় লারার এই রেকর্ড তার শ্রেষ্ঠত্বের দাবিকে আরও জোরালো করে।
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষেও দুজনের রেকর্ড ছিল দুর্দান্ত। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে লারার গড় ৫১, সেঞ্চুরি ৯টি। শচীনের গড় ৫৫, সেঞ্চুরি ১১টি। অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে পেস বোলিংয়ের বিপক্ষে শচীন ছিলেন বেশি কার্যকর। অন্যদিকে বাউন্সি উইকেটে লারা তুলনামূলক কিছুটা সমস্যায় পড়তেন। শেন ওয়ার্নের মতে, শচীন সামান্য এগিয়ে থাকলেও গ্লেন ম্যাকগ্রার পছন্দ ছিলেন লারা।
পেস বোলিংয়ের বিপক্ষে শচীনের দক্ষতা বেশি থাকলেও স্পিন খেলার ক্ষেত্রে সর্বকালের সেরাদের একজন হিসেবে বিবেচিত হন লারা। টেস্টে স্পিনারদের বিপক্ষে তার গড় ছিল ৮২.৫২। ওয়ার্নের বিপক্ষে ৭১.৫৭ এবং মুরালিধরনের বিপক্ষে অবিশ্বাস্য ১২৪ গড় ছিল তার। লারার মতে, বোলার বল ছাড়ার মুহূর্ত থেকেই তিনি বুঝতে চেষ্টা করতেন বলটি কীভাবে খেলতে হবে।
ব্যাট হাতে দুজনই অসাধারণ হলেও অধিনায়ক হিসেবে নিজেদের সেভাবে মেলে ধরতে পারেননি। অধিনায়ক হিসেবে ২৫ টেস্টে শচীনের জয় মাত্র ৪টি। লারা ৪৭ টেস্টে নেতৃত্ব দিয়ে জিতেছেন ১০টি, তার ব্যাটিং গড় ছিল ৫৭.৮৩। তবে অধিনায়ক হিসেবে লারার যোগ্যতা নিয়ে সবসময়ই প্রশ্ন ছিল। ৪০০ রানের বিশ্বরেকর্ড গড়ার সময়ও অভিযোগ উঠেছিল, ব্যক্তিগত রেকর্ডের দিকে মনোযোগ দিতে গিয়ে তিনি দলের জয়ের সম্ভাবনা কমিয়ে দিয়েছেন।
ব্যাটসম্যান হিসেবে শচীনের রেকর্ডকে তুলনামূলকভাবে বেশি নিখুঁত বলা যায়। দেশের বাইরের মাঠে তার গড় ছিল ঘরের মাঠের চেয়েও বেশি। যে ১০টি দেশে তিনি টেস্ট খেলেছেন, প্রতিটিতেই গড় ছিল অন্তত ৪০। লারা ভারত ও নিউজিল্যান্ডে এই গড় ধরে রাখতে পারেননি। যদিও ভারতের বিপক্ষে তার খেলা ছিল মাত্র তিন টেস্ট।
তবে পরিসংখ্যানের বিশালতায় শচীন অনেকটাই এগিয়ে। ২০০ টেস্ট খেলার রেকর্ডের পাশাপাশি তার সংগ্রহ ১৫ হাজার ৯২১ রান ও ৫১টি সেঞ্চুরি। লারার চেয়ে ৬৯টি টেস্ট বেশি খেলেছেন শচীন এবং সেঞ্চুরিও করেছেন ১৭টি বেশি। লারার সাবেক সতীর্থ জিমি অ্যাডামসের মতে, লারা কখনো কখনো ব্যাটিংয়ে একঘেয়েমি অনুভব করতেন, কিন্তু শচীনের ক্ষেত্রে এমনটা কখনো দেখা যায়নি।
শচীনের ব্যাটিংয়ের প্রশংসা করেছিলেন ক্রিকেটের আরেক কিংবদন্তি ডন ব্র্যাডম্যানও। ১৯৯৬ সালে শচীনের ব্যাটিং দেখে নিজের স্ত্রীকে ডেকে এনে বলেছিলেন, শচীনকে ব্যাট করতে দেখে তার মনে হচ্ছিল, তিনি যেন নিজের ব্যাটিংই দেখছেন। শচীনের ব্যাটিংয়ের কৌশল, শট খেলার ধরন ও ভারসাম্য ব্র্যাডম্যানকে মুগ্ধ করেছিল।
তবে শচীনের সবচেয়ে বড় গুণ ছিল তার দীর্ঘস্থায়ী পারফরম্যান্স। অল্প বয়সে প্রতিভার ঝলক দেখানো অনেকের পক্ষেই সম্ভব, কিন্তু দীর্ঘ সময় ধরে সেই মান ধরে রাখা কঠিন। শচীন দুটোই করেছেন।
১৭তম জন্মদিনের কিছুদিন পর ১৯৯০ সালে ওল্ড ট্রাফোর্ডে ম্যাচ বাঁচানো সেঞ্চুরি করেন তিনি। ১৯ বছর বয়সের মধ্যেই দক্ষিণ আফ্রিকায় একটি এবং অস্ট্রেলিয়ায় দুটি সেঞ্চুরি হয়ে যায় তার। আবার ২০১০ সালে, ৩৭ বছর বয়সেও টেস্ট ক্রিকেটে সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহক ছিলেন শচীন। ওই বছর ৭টি সেঞ্চুরি করেন এবং তার গড় ছিল ৭৮.১। ক্যারিয়ারের শেষ কয়েকটি বছর ছাড়া প্রায় পুরো সময়ই ভারতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন তিনি।
অন্যদিকে ধারাবাহিকতায় শচীন এগিয়ে থাকলেও নিজের সেরা সময়ের ব্যাটিংয়ে লারার বিস্ফোরণ ছিল আরও বেশি। ক্রিকেট বিশ্লেষক হিমানিশ গাঞ্জুর সমসাময়িক ব্যাটসম্যানদের একই প্রতিপক্ষের বিপক্ষে পারফরম্যান্স তুলনা করে দেখেছেন, লারার টেস্ট গড় তার সময়ের ব্যাটসম্যানদের সামগ্রিক গড়ের চেয়ে ১৮.৩ রান বেশি। শচীনের ক্ষেত্রে ব্যবধানটি ১৫.৯ রান।
সমসাময়িকদের তুলনায় লারার এই পরিসংখ্যান তার অসাধারণত্বকে আরও স্পষ্ট করে। ক্যারিয়ারে এমন কিছু সিরিজ খেলেছেন, যা শচীনের সেরা সিরিজগুলোর চেয়েও এগিয়ে। দুজনের মধ্যে সেরা একক ইনিংসটির কৃতিত্বও লারার। তার আক্রমণাত্মক ব্যাটিংয়ের ভয় প্রতিপক্ষের বোলারদের সবসময় তাড়িয়ে বেড়াত। ৯০ বলের কমে তিনটি টেস্ট সেঞ্চুরি রয়েছে তার।
দলের সামগ্রিক অবদান এবং দীর্ঘ সময় ধরে রান করে যাওয়ার ক্ষেত্রে শচীনকে ছাড়িয়ে যাওয়া প্রায় অসম্ভব। কিন্তু লারার বিশেষত্ব হলো, শুধু ব্যাটিংয়ের সৌন্দর্য কিংবা সেরা সময়ের অসাধারণ পারফরম্যান্সেই নয়, সামগ্রিক রেকর্ডের বিচারেও তিনি শচীনের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে অনেক ক্ষেত্রে এগিয়ে থাকেন।
তাই টেস্ট ক্রিকেটে কে সেরা—শচীন টেন্ডুলকার নাকি ব্রায়ান লারা? এই প্রশ্নের সহজ কোনো উত্তর নেই। একজনের শ্রেষ্ঠত্ব ধারাবাহিকতা, দীর্ঘ ক্যারিয়ার ও অবিশ্বাস্য রানসংখ্যায়; অন্যজনের মহত্ত্ব ব্যাটিংয়ের শৈল্পিকতা, বিস্ফোরক ইনিংস এবং প্রতিকূল পরিস্থিতিতে একাই ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার ক্ষমতায়। শেষ পর্যন্ত পছন্দের জায়গাটি হয়ত নির্ভর করবে একজন ক্রিকেটপ্রেমী কোন গুণকে বেশি গুরুত্ব দেন তার ওপর।






