সন্তানকে ভালো স্কুলে ভর্তি করানো, দামি বই-খাতা কিনে দেওয়া কিংবা নিয়মিত স্কুলের বেতন পরিশোধ করলেই কি একজন অভিভাবকের শিক্ষাগত দায়িত্ব শেষ হয়ে যায়? বাস্তবে বিষয়টি মোটেও এমন নয়। একটি শিশু স্কুলে কী শিখছে, কতটুকু বুঝতে পারছে, কোন বিষয়ে পিছিয়ে পড়ছে এবং তার শেখার আগ্রহ কতটা বাড়ছে- এসব বিষয়ে অভিভাবকের সচেতন নজরদারি তার শিক্ষাজীবনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
অনেক অভিভাবক মনে করেন, সন্তানকে স্কুলে পাঠানো এবং প্রাইভেট টিউটরের ব্যবস্থা করাই যথেষ্ট। কিন্তু স্কুলের কয়েক ঘণ্টার পাঠদান এবং বাসার বাকি সময়ের মধ্যে যদি কোনো সমন্বয় না থাকে, তাহলে শিশুর শেখার প্রক্রিয়ায় ঘাটতি তৈরি হতে পারে। কারণ শিক্ষা শুধু শ্রেণিকক্ষের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া, যেখানে পরিবার ও বিদ্যালয় উভয়েরই ভূমিকা রয়েছে।
শিক্ষাক্ষেত্রে অভিভাবকের অংশগ্রহণ বা Parental Engagement নিয়ে গত কয়েক দশকে অসংখ্য গবেষণা হয়েছে। ২০২২ সালে Educational Research Review জার্নালে প্রকাশিত একটি গুরুত্বপূর্ণ গবেষণায় গত ৫০ বছরের ২৩টি মেটা-অ্যানালাইসিস পর্যালোচনা করা হয়। এসব বিশ্লেষণের আওতায় ছিল ১ হাজার ১৭৭টি প্রাথমিক গবেষণা।
গবেষণাটিতে দেখা যায়, সন্তানের শিক্ষাজীবনে অভিভাবকের ইতিবাচক অংশগ্রহণের সঙ্গে একাডেমিক সাফল্যের ইতিবাচক সম্পর্ক রয়েছে। বিশেষ করে সন্তানের প্রতি অভিভাবকের প্রত্যাশা, শিক্ষার গুরুত্ব সম্পর্কে ইতিবাচক ধারণা এবং মানসিক সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তবে শুধু হোমওয়ার্ক করিয়ে দেওয়া বা প্রতিটি কাজে হস্তক্ষেপ করার ফল সব সময় ইতিবাচক হয় না।
অন্যদিকে, যুক্তরাজ্যের Education Endowment Foundation (EEF)-এর গবেষণা পর্যালোচনায় দেখা গেছে, কার্যকর Parental Engagement শিক্ষার্থীদের এক বছরের মধ্যে গড়ে প্রায় চার মাসের অতিরিক্ত শিক্ষাগত অগ্রগতির সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। বিশেষ করে বাসায় পড়ার পরিবেশ তৈরি, নিয়মিত বই পড়া এবং সন্তানের শেখার কাজে ইতিবাচকভাবে অংশ নেওয়ার বিষয়গুলো এখানে গুরুত্বপূর্ণ।
অর্থাৎ, অভিভাবকের ভূমিকা শুধু সন্তানকে পড়তে বসানো নয়; বরং তার শেখার পরিবেশকে সমৃদ্ধ করা।
পড়াশোনার দুর্বলতা শুরুতেই শনাক্ত করা কেন জরুরি?
একটি শিশু হয়তো প্রতিদিন যাচ্ছে, হোমওয়ার্ক করছে এবং পরীক্ষায় মোটামুটি নম্বরও পাচ্ছে। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে সে প্রতিটি বিষয় ভালোভাবে বুঝতে পারছে।
অনেক সময় শিশুর Reading Comprehension বা পড়ে বিষয় বোঝার দক্ষতায় দুর্বলতা থাকে। সে বই পড়তে পারে, কিন্তু পড়া বিষয়টি নিজের ভাষায় ব্যাখ্যা করতে পারে না। গণিতে উত্তর বের করতে পারে, কিন্তু কীভাবে সমাধান করেছে তা ধাপে ধাপে লিখতে পারে না। আবার ইংরেজি লেখার সময় প্রয়োজনীয় তথ্য, উদাহরণ কিংবা ব্যাখ্যা যোগ করতে পারে না।
এসব সমস্যা প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্ত না হলে পরবর্তী শ্রেণিতে গিয়ে আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে।
উদাহরণস্বরূপ, তৃতীয় বা চতুর্থ শ্রেণিতে কোনো শিক্ষার্থী যদি একটি গল্পের মূল বক্তব্য বুঝতে না পারে, তাহলে পরবর্তী শ্রেণিতে দীর্ঘ অনুচ্ছেদ বিশ্লেষণ, প্রশ্নের ব্যাখ্যামূলক উত্তর কিংবা সাহিত্যভিত্তিক বিষয় বুঝতে তার সমস্যা হতে পারে।
একইভাবে গণিতের মৌলিক ধারণা দুর্বল থাকলে উচ্চতর শ্রেণির ভগ্নাংশ, শতকরা হিসাব কিংবা বীজগণিত শেখা কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
রিপোর্ট কার্ডই কি সন্তানের প্রকৃত অবস্থার পরিচয়?
অনেক অভিভাবক পরীক্ষার ফলাফল হাতে পাওয়ার পরই সন্তানের পড়াশুনার খোঁজ নিতে শুরু করেন। কিন্তু রিপোর্ট কার্ড আসলে একটি নির্দিষ্ট সময়ের শিক্ষাগত অবস্থার সংক্ষিপ্ত চিত্র। এটি সন্তানের প্রতিদিনের শেখার অগ্রগতি, দুর্বলতা কিংবা আচরণগত সমস্যার পূর্ণ বিবরণ দেয় না।
একজন শিক্ষার্থী পরীক্ষায় ভালো নম্বর পেলেও হয়তো নিয়মিত হোমওয়ার্ক করছে না, ক্লাসে মনোযোগ দিচ্ছে না কিংবা নিজের সামর্থ্যের তুলনায় কম কাজ করছে। আবার কোনো শিক্ষার্থী কম নম্বর পেলেও সে হয়তো আন্তরিকভাবে চেষ্টা করছে, কিন্তু নির্দিষ্ট কিছু বিষয়ে অতিরিক্ত সহযোগিতা প্রয়োজন।
তাই অভিভাবকদের শুধু নম্বর দেখলে চলবে না।
সন্তান ক্লাসে নিয়মিত উপস্থিত থাকছে কি না।
শিক্ষক যে বিষয়গুলো পড়াচ্ছেন, সেগুলো বুঝতে পারছে কি না।
বাড়ির কাজ নিজে সম্পন্ন করছে কি না।
পড়ার সময় মনোযোগ ধরে রাখতে পারছে কি না।
কোনো বিষয় নিয়ে ভয়, অস্বস্তি বা অনীহা তৈরি হয়েছে কি না।
শিক্ষক তার কোন দক্ষতায় উন্নতি এবং কোন ক্ষেত্রে দুর্বলতা দেখছেন।
স্কুলে যাচ্ছে, কিন্তু কী শিখছে?
শিশুর স্কুলে যাওয়া এবং প্রকৃত অর্থে শেখার মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। একটি শিশু প্রতিদিন শ্রেণিকক্ষে উপস্থিত থেকেও অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় না বুঝে ফিরে আসতে পারে।
তাই বাসায় ফিরে শুধু আজ স্কুলে কী পড়েছ? প্রশ্ন করলেই হবে না। বরং একটু ভিন্নভাবে জানতে হবে, আজ নতুন কী শিখলে? কোন বিষয়টি তোমার কাছে কঠিন মনে হয়েছে? কিংবা 'আজকের পড়া থেকে আমাকে কিছু বুঝিয়ে বলতে পারবে?
এ ধরনের প্রশ্ন শিশুকে নিজের শেখা বিষয় নিয়ে চিন্তা করতে উৎসাহিত করে। পাশাপাশি অভিভাবকও বুঝতে পারেন, সন্তান আসলে কতটুকু শিখেছে।
শিক্ষক শিশুকে পাঠদান করেন, কিন্তু সেই শিক্ষাকে নিয়মিত অনুশীলনের মাধ্যমে স্থায়ী করার জন্য পরিবারের সহযোগিতা প্রয়োজন। বাসায় পড়ার নির্দিষ্ট সময়, বই পড়ার অভ্যাস, পর্যাপ্ত ঘুম এবং মনোযোগের উপযোগী পরিবেশ-সবকিছুই শিশুর শিক্ষাজীবনে ভূমিকা রাখে।
অভিভাবকের সচেতন উপস্থিতি শিশুকে এই বার্তা দেয় যে তার পড়াশোনা পরিবারের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। তবে নজরদারি যেন কখনো অতিরিক্ত চাপ বা ভয়ের কারণ না হয়। শিশুকে বুঝতে দিতে হবে, ভুল করলে তাকে অপমান করা হবে না; বরং ভুল থেকে শেখার সুযোগ দেওয়া হবে।
কারণ ভালো শিক্ষার্থী তৈরি হয় শুধু পরীক্ষার নম্বর দিয়ে নয়, বরং শেখার আগ্রহ, আত্মবিশ্বাস, দায়িত্ববোধ এবং নিয়মিত অনুশীলনের মাধ্যমে।






