পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা ও নেপালের সরকারি বা প্রকাশিত খুচরা দরের তুলনায় প্রায় ৩০ থেকে ৪৫ শতাংশ বেশি দামে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) বিক্রি হচ্ছে বাংলাদেশে।
ইরান যুদ্ধ শুরুর ঠিক আগে ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশে এলপিজির যে খুচরা দাম ছিল, বর্তমানে তা প্রায় ৫২ শতাংশ বেড়েছে। মধ্যপ্রাচ্য থেকে সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ায় আমদানিকারকদের আরও দূরের উৎস থেকে এলপিজি আনতে হচ্ছে।
এতে একদিকে যেমন পরিবহন ব্যয় বেড়েছে, পাশাপাশি বাড়তি প্রিমিয়াম দিতে হচ্ছে পণ্যবাহী জাহাজের চালান নিশ্চিত করতে।
ফেব্রুয়ারিতে প্রতি কেজি এলপিজির দাম ছিল ১১৩ টাকা। নভেম্বরে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৭১ টাকা ৬৮ পয়সা।
একই সময়ে মুদ্রা বিনিময় হার সমন্বয়ের পর পাকিস্তানে এলপিজির খুচরা দাম বেড়েছে প্রায় ৩৪ শতাংশ, শ্রীলঙ্কায় ১২ শতাংশ ও ভারতে ৭ শতাংশ। নেপালে সর্বশেষ পাওয়া দাম ফেব্রুয়ারির তুলনায় প্রায় ৬ শতাংশ বেশি।
নভেম্বরের দর অনুযায়ী, প্রতি কেজি এলপিজি পাকিস্তানে প্রায় ১৩২ টাকা, শ্রীলঙ্কায় ১৩০ টাকা এবং নেপালে ১১৯ টাকা। দেশগুলোর প্রকাশিত দাম ও বিনিময় হার ধরে হিসাব করে এ তথ্য পাওয়া গেছে।
তবে পাকিস্তানের ক্ষেত্রে এলপিজির আনুষ্ঠানিক মূল্যের সঙ্গে প্রকৃত বাজারদরের ফারাক থাকতে পারে। দেশটির স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সেখানকার খোলাবাজারে দাম সরকারি দরের প্রায় দ্বিগুণ।
ভারতে গৃহস্থালি গ্রাহকরা প্রতি কেজি এলপিজির জন্য বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৮৭ টাকা দেন। তবে এই দাম বাংলাদেশের সঙ্গে সরাসরি তুলনাযোগ্য নয়, কারণ ভারত সরকার গৃহস্থালি এলপিজিতে ভর্তুকি দেয়।
অন্যদিকে, দিল্লিতে বাণিজ্যিক এলপিজির দাম প্রতি কেজি প্রায় ১৯৪ টাকা, যা বাংলাদেশের চেয়ে বেশি।
বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ সাংবাদিকদের বলেন, ভারতের সঙ্গে দামের তুলনা করার সময় গৃহস্থালি ও বাণিজ্যিক এলপিজির দরের পার্থক্য প্রায়ই বিবেচনায় নেওয়া হয় না।
ভারতের বাসাবাড়ির গ্রাহকরা কম দামে এলপিজি পান, কারণ সরকার এর পেছনে বড় একটি অংশ ভর্তুকি হিসেবে ব্যয় করে। অন্যদিকে, বাণিজ্যিক গ্রাহকদের বাজারে প্রচলিত দাম দিতে হয়।
তিনি বলেন, পাকিস্তানে সরকার নির্ধারিত দাম খোলাবাজারের দরের চেয়ে অনেক কম। আর নেপাল এলপিজির জন্য ভারতের ওপর নির্ভরশীল।
তবে এসব দেশের দামের তুলনায় দেখা যায়, বাংলাদেশে এলপিজির খুচরা দাম কয়েকটি প্রতিবেশী দেশের তুলনায় অনেক বেশি হারে বেড়েছে।
জালাল আহমেদ বলেন, স্থলবেষ্টিত নেপালের বিপরীতে পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কার গভীর সমুদ্রবন্দর রয়েছে। ফলে দেশ দুটি বড় আকারের এলপিজিবাহী জাহাজ গ্রহণ করতে পারে।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে তিনি তিনটি কাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কথা উল্লেখ করেন—তুলনামূলক কম পরিমাণে এলপিজি কেনা, স্পট মার্কেটের ওপর নির্ভরতা এবং বড় জাহাজ থেকে ছোট জাহাজে এলপিজি স্থানান্তরের বাড়তি ব্যয়।
তিনি বলেন, ‘দেশ হিসেবে ভারতের তুলনায় বাংলাদেশ অনেক ছোট ক্রেতা।
ভারতীয় আমদানিকারকরা একবারে একটি জাহাজে প্রায় এক লাখ টন এলপিজি কিনতে পারেন। বিপরীতে, বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠানগুলো সাধারণত এর চেয়ে অনেক কম পরিমাণে এলপিজি কেনে।
আন্তর্জাতিক বাজারে একই সরবরাহকারীর কাছে ভারত ও বাংলাদেশের ক্রেতারা গেলে বিক্রেতারা স্বাভাবিকভাবেই বড় ক্রেতাদের অগ্রাধিকার দেন। এতে দর-কষাকষিতে তাদের সুবিধা বেশি থাকে।
ভারতে দীর্ঘমেয়াদি সরবরাহ চুক্তি রয়েছে এমন তিনটি রাষ্ট্রায়ত্ত তেল বিপণন কোম্পানি আছে। বাংলাদেশে মাত্র কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের এ ধরনের চুক্তি রয়েছে। অন্য অনেক প্রতিষ্ঠান স্পট মার্কেটের ওপর নির্ভরশীল।
স্পট মার্কেট থেকে কেনাকাটা করলে আমদানিকারকরা দামের ওঠানামার ঝুঁকিতে পড়েন। বিশেষ করে বৈশ্বিক সরবরাহ সংকুচিত হলে প্রতিযোগিতামূলক দামে পণ্যবাহী জাহাজ নিশ্চিত করাও কঠিন হয়ে পড়ে।
দীর্ঘমেয়াদি চুক্তিতে সরবরাহের পরিমাণ ও সময়সূচি সম্পর্কে তুলনামূলক নিশ্চয়তা পাওয়া যায়। তবে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম পরিবর্তনের ঝুঁকি থেকে ক্রেতারা পুরোপুরি সুরক্ষিত থাকেন না।
এছাড়া, বড় মাদার ভেসেল থেকে এলপিজি ছোট জাহাজে স্থানান্তর করে বাংলাদেশের বন্দরে আনতে হয়। এতে পণ্য ওঠানো-নামানো ও পরিবহনের আরেকটি ধাপ যুক্ত হয়, বাড়ে খরচও।
মধ্যপ্রাচ্য থেকে সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ায় এসব সীমাবদ্ধতার প্রভাব আরও প্রকট হয়েছে।
২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরুর আগে বাংলাদেশ তার এলপিজির বড় অংশ উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে সংগ্রহ করত।
কিন্তু সংঘাত, হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলে বিধিনিষেধ এবং যুক্তরাষ্ট্র-বাংলাদেশ পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তির কারণে আমদানিকারকদের বিকল্প উৎস হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের দিকে ঝুঁকতে হয়েছে।
বিইআরসির দেশভিত্তিক আমদানি তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের এলপিজি আমদানিতে যুক্তরাষ্ট্রের অংশ ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে ২৭ দশমিক ৪ শতাংশ থেকে বেড়ে চলতি বছরের সেপ্টেম্বরে ৮৫ শতাংশ হয়েছে।
একই সময়ে ওমান থেকে আসা এলপিজির অংশ ৪১ শতাংশ থেকে কমে শূন্যে নেমে এসেছে।
যুক্তরাষ্ট্র থেকে সরবরাহ নেওয়ায় জাহাজের যাত্রার সময় বেড়েছে।
জ্বালানি খাতের সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের মেক্সিকো উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে এলপিজিবাহী জাহাজ বঙ্গোপসাগরে পৌঁছাতে প্রায় ৪০-৪৫ দিন লাগে। মধ্যপ্রাচ্য থেকে আসতে সময় লাগে প্রায় দুই সপ্তাহ।
ওমেরা পেট্রোলিয়ামের পরিচালক এবং এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সাবেক সভাপতি আজম জে চৌধুরী বলেন, যুক্তরাষ্ট্র থেকে আসা এলপিজির পরিবহন ব্যয় ব্যাপকভাবে বেড়েছে।
তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সংঘাতের আগে প্রতি টনে পরিবহন ব্যয় ছিল প্রায় ৮২ ডলার। বর্তমান পরিস্থিতিতে তা বেড়ে সর্বোচ্চ ২৫০ ডলার হয়েছে।
এই চাপ শুধু বাংলাদেশের একার ওপর সীমাবদ্ধ নয়।
এসঅ্যান্ডপি গ্লোবালের তথ্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বরে যুক্তরাষ্ট্র থেকে প্রোপেন রপ্তানি দৈনিক রেকর্ড ২২ লাখ ব্যারেলে পৌঁছেছে। ওই মাসে এশিয়ার বাজারগুলো যুক্তরাষ্ট্র থেকে ৩ কোটি ৮০ লাখ ব্যারেল প্রোপেন এবং ১ কোটি ৪ লাখ ব্যারেল বিউটেন পেয়েছে।
সরবরাহের জন্য ক্রেতাদের মধ্যে প্রতিযোগিতা বাড়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে দামও বেড়েছে।
এসঅ্যান্ডপি গ্লোবাল অক্টোবরে উত্তর এশিয়ায় প্রোপেনের চালানপ্রতি দাম প্রতি টন ৯৭৭ ডলার এবং বিউটেনের দাম ১ হাজার ৫৭ ডলার নির্ধারণ করে।
প্রতিষ্ঠানটির মতে, পশ্চিমা বাজারে শীতকালীন গ্রেডের পেট্রল তৈরিতে মিশ্রণের জন্য বিউটেনের চাহিদা বেড়েছে। পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্য থেকে সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ায় এর প্রাপ্যতা কমেছে। ফলে বিউটেনের দাম বেশি।
বাংলাদেশের জন্য বিউটেনের বাড়তি দাম বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, বিইআরসি স্থানীয় এলপিজির দাম নির্ধারণে ৩৫ শতাংশ প্রোপেন ও ৬৫ শতাংশ বিউটেনের মিশ্রণ ধরে হিসাব করে।
এই অনুপাতে উত্তর এশিয়ার বাজারদর হিসাব করলে প্রতি টনে মিশ্র এলপিজির গড় দাম দাঁড়ায় প্রায় ১ হাজার ২৯ ডলার।
অন্যদিকে, সৌদি আরামকোর কন্ট্রাক্ট প্রাইস (সিপি) অনুযায়ী একই মিশ্রণের গড় দাম দাঁড়ায় ৭৫৯ ডলার। বাংলাদেশ আমদানির উৎস পরিবর্তন করলেও বিইআরসি এখনো এই সিপিকেই প্রধান বেঞ্চমার্ক হিসেবে ব্যবহার করছে।
নভেম্বরে সৌদি আরামকো প্রোপেনের সিপি প্রতি টন ৭২০ ডলার এবং বিউটেনের ৭৮০ ডলার নির্ধারণ করে। সে হিসাবে উত্তর এশিয়ার বাজারে মিশ্র এলপিজির দাম প্রায় ৩৬ শতাংশ বেশি।
কমিশনের মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতি খুচরা দাম নির্ধারণের মানদণ্ড সম্পর্কে ধারণা দেয়। তবে প্রতিটি আমদানিকারকের প্রকৃত ক্রয়ব্যয় এতে প্রতিফলিত হয় না।
উৎস, চুক্তির শর্ত, চালানের পরিমাণ, পরিবহন ও বিমা ব্যয় এবং সরবরাহকারীকে দেওয়া প্রিমিয়ামের ওপর নির্ভর করে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ক্রয়মূল্যে পার্থক্য হতে পারে।
আজম বলেন, কোম্পানিগুলো আন্তর্জাতিক বাজারের অন্যান্য দরের ভিত্তিতে এলপিজি কিনলেও দেশ এখনো সৌদি সিপি বেঞ্চমার্ক ব্যবহার করছে।
তিনি বলেন, ‘বর্তমানে পরিস্থিতি আরও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে। দেশের অভ্যন্তরীণ চার্জও বেড়েছে, যা স্থানীয় বাজারে দামের ওপর প্রভাব ফেলেছে।
বিইআরসির নভেম্বরের মূল্য সমন্বয়ে সংরক্ষণ ও বোতলজাতকরণ চার্জ ৪০ শতাংশ বেড়ে প্রতি কেজি ১৬ টাকা ৭৪ পয়সা থেকে ২৩ টাকা ৪৮ পয়সা হয়েছে।
পরিবেশকদের চার্জ ৭০ শতাংশ বেড়ে ৪ টাকা ১৭ পয়সা থেকে ৭ টাকা ৮ পয়সা হয়েছে। আর খুচরা বিক্রেতাদের চার্জ ৫৫ শতাংশ বেড়ে ৩ টাকা ৭৫ পয়সা থেকে ৫ টাকা ৮৩ পয়সা হয়েছে।
১২ কেজির একটি সিলিন্ডারের ক্ষেত্রে সংরক্ষণ ও বোতলজাতকরণ চার্জ ২০১ টাকা থেকে বেড়ে ২৮২ টাকা হয়েছে। পরিবেশকদের চার্জ ৫০ টাকা থেকে বেড়ে ৮৫ টাকা এবং খুচরা বিক্রেতাদের চার্জ ৪৫ টাকা থেকে বেড়ে ৭০ টাকা হয়েছে।
ব্যবসায়ীরা কমিশন বাড়ানো ও বিতরণব্যবস্থায় পরিবর্তনের দাবিতে আন্দোলন করছিলেন। এর মধ্যে সারা দেশে এলপিজি বিক্রি বন্ধ রেখে দুই দিনের ধর্মঘটের ঘোষণাও আসে।
বাজারে প্রতিষ্ঠানগুলোর আধিপত্যও সমস্যাকে আরও জটিল করেছে।
বাংলাদেশে এলপিজি পরিচালনার লাইসেন্সধারী প্রতিষ্ঠান রয়েছে প্রায় ৩৩টি। তবে বিইআরসির কারিগরি কমিটির উপস্থাপিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে মাত্র ১৬টি প্রতিষ্ঠান ১৭ লাখ ৪০ হাজার টন এলপিজি আমদানি করেছে। এর মধ্যে ৭টি প্রতিষ্ঠানের হাতেই ছিল মোট আমদানির ৮৬ শতাংশ।
দেশের লাইসেন্সধারী প্রতিষ্ঠানগুলোর সম্মিলিত বার্ষিক বোতলজাতকরণ সক্ষমতা ৬৩ লাখ ৮০ হাজার টন। বেসরকারি খাতে সংরক্ষণ সক্ষমতা প্রায় ১ লাখ ৪১ হাজার ৬৩৫ টন।
২০২৫-২৬ অর্থবছরে আমদানির পরিমাণ ছিল বার্ষিক বোতলজাতকরণ সক্ষমতার মাত্র ২৭ শতাংশের মতো। অর্থাৎ লাইসেন্সপ্রাপ্ত সক্ষমতার বড় অংশই অব্যবহৃত থাকছে।
বাজারে সরাসরি উপস্থিতি প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রেও সরকার সমস্যায় পড়েছে।
বেসরকারি অপারেটরদের ওপর নির্ভরতা কমানো এবং সংকটের সময় বিকল্প সরবরাহ নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) নিজেই এলপিজি আমদানির পরিকল্পনা নেয়।
তবে দরপত্রের মাধ্যমে গ্রহণযোগ্য প্রস্তাব না পাওয়ায় বিপিসি এখন বিকল্প ব্যবস্থা খুঁজছে বলে জানান জালাল আহমেদ।
রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থাটি এখন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে তাদের সংরক্ষণাগার ব্যবহারের এবং বিপণন অংশীদার খুঁজে বের করার বিষয়ে আলোচনা করছে।
‘তবে এখনো কোনো ব্যবস্থা চূড়ান্ত হয়নি,’ বলেন তিনি।






