গাঁজার আসরে মুখ ফসকে কিছু কথা বেরিয়ে যাওয়ার পর জোট খুলেছে প্রায় ৫ বছর আগের এক হত্যা রহস্যের। বেরিয়ে এসেছে ভাড়াটে হত্যাকারীদের তথ্য, যাদের পাঠিয়েছিলেন নিহতেরই আপন বড় ভাই।
২০২১ সালের জুনে মাগুরার সুইপার কলোনিতে মানিক লাল ডোম (৩৫) হত্যার ঘটনায় করা মামলার চার্জশিটের খসড়া ইতোমধ্যে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) সদরদপ্তরে পাঠানো হয়েছে।
কর্মকর্তারা জানান, নিহত মানিকের ছেলে আসন লালের (২১) সঙ্গে অভিযুক্ত এক হত্যাকারীর বাগবিতণ্ডাকে কেন্দ্র করে ৫ বছর আগের ওই ঘটনার জট খুলেছে সম্প্রতি।
একপর্যায়ে মেজাজ হারিয়ে স্থানীয় মাছ বাজারে কাজ করা মেহেদী হাসান আকাশ (৩০) আসনকে হুমকি দিয়ে বলেন—'তোর বাবার যে অবস্থা করেছি, তোরও একই অবস্থা করব।'
দুজনে গাঁজা সেবনের সময় আকাশ এই হুমকি দিয়েছিলেন। যা পরে সিআইডির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সূত্র হিসেবে কাজ করে।
অবশেষে স্থানীয় পুলিশ ও পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) কাছে কয়েক বছর ধরে আটকে থাকার পর মামলাটি সুরাহার দিকে যাচ্ছে।
তদন্তে জানা গেছে, নিহত মানিক মর্গ সহকারী হিসেবে কাজ করতেন। পারিবারিক বিরোধের জের ধরে তার বড় ভাই হীরা লাল ডোম (৫০) চারজনকে ভাড়া করে তাকে হত্যা করেন।
মামলার তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালের ২৯ জুন রাতে মাগুরার সুইপার কলোনিতে নিজ বাড়িতে ছোট ছেলে সুন বাবুকে নিয়ে ঘুমাতে যান মানিক। পরদিন ভোর ৪টার দিকে শিশুটির পাশে পড়েছিল বাবার রক্তাক্ত মরদেহ।
পরদিন মানিকের স্ত্রী আশা রানি মাগুরা সদর থানায় হত্যা মামলা করেন।
প্রথমে স্থানীয় পুলিশ মামলাটি তদন্ত করলেও, পরের বছরের ১২ জানুয়ারি এটি পিবিআইয়ের কাছে হস্তান্তর করা হয়। প্রায় সাড়ে তিন বছর চেষ্টার পরও পিবিআই কোনো আসামিকে শনাক্ত করতে পারেনি।
গত বছরের মে মাসে পিবিআই জেলা আদালতে একটি চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করে। সেখানে অবশ্য কোনো আসামির নামই ছিল না, আর এতে ইতি টানা হয় তদন্তের।
তবে, আদালত ওই প্রতিবেদন প্রত্যাখ্যান করেন এবং একই বছরের অক্টোবরে সিআইডির মাগুরা ইউনিটকে নতুন করে তদন্তের নির্দেশ দেন। তদন্তের দায়িত্ব পান উপপরিদর্শক (এসআই) আনিসুর রহমান।
দায়িত্ব নেওয়ার পর এসআই আনিসুর নিহতের ছেলে আসনকে তার বাবার হত্যাকাণ্ড নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করেন। একপর্যায়ে আসন বাগবিতণ্ডার সময় আকাশের দেওয়া ওই হুমকির বিষয়টি জানান।
এসআই আনিসুর এ সূত্র ধরে এগোনোর সিদ্ধান্ত নেন। পরে চলতি বছরের ২৬ এপ্রিল মাগুরার পুরাতন মাছ বাজার এলাকা থেকে আকাশকে আটক করা হয়।
এসআই আনিসুর সাংবাদিকদের বলেন, 'আকাশের ওই মন্তব্যটি আমার মনে সন্দেহ তৈরি করে। আমি তাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য নিয়ে আসি।'
'জিজ্ঞাসাবাদের এক পর্যায়ে আকাশ সত্য বলে দেন এবং তার ৩ সহযোগীর নাম প্রকাশ করেন। এর পরই তাদের গ্রেপ্তারে দেশজুড়ে অভিযান শুরু হয়,' বলেন তিনি।
পরে ওই হত্যার মূল পরিকল্পনাকারী হীরা লালসহ মোট ৫ অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয় সিআইডি।
অপর অভিযুক্তরা হলেন—লিয়াকত আলী ওরফে ঝন্টু (৬৯), শিকল সাঁইজি ওরফে লিটন পাগলা ওরফে রুবেল (৪০) ও নিরঞ্জন কুমার দাস (৪৩)।
তৎকালীন র্যাব-৪ (বর্তমান এসআরবি-৪)-এর সহায়তায় গত ১৫ জুলাই ঢাকার শাহ আলী মাজার এলাকা থেকে রুবেলকে গ্রেপ্তার করা হয়।
সিআইডির তথ্য অনুযায়ী, মানিক ও হীরা লালের মা-বাবা সরকারি পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে কাজ করতেন। তাদের মৃত্যুর পর হীরা পুরো পেনশনের টাকা আত্মসাৎ করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। আর ওই টাকা নিয়েই দুই ভাইয়ের বিরোধ ছিল।
সিআইডির তদন্ত থেকে জানা যায়, মা-বাবার রেখে যাওয়া এক টুকরো জমি নিয়ে তাদের সম্পর্ক আরও তিক্ত হয়ে ওঠে। আর এসব বিরোধ নিয়ে মানিক প্রায়ই হীরাকে অপমান করতেন।
সেই অপমানের বদলা হিসেবেই হীরা তার ভাইকে হত্যার সিদ্ধান্ত নেন বলে জানান কর্মকর্তারা।
এরপর তিনি হত্যাকাণ্ড ঘটানোর জন্য ৪ জনের সঙ্গে যোগাযোগ করেন, যাদের সঙ্গে মাদক কেনাবেচাকে কেন্দ্র করে মানিকের ওপর আগে থেকেই ক্ষোভ ছিল।
তদন্ত কর্মকর্তা জানান, একবার ঝগড়ার সময় মানিক আসামি ঝন্টুকে চড়ও মেরেছিলেন।
আদালতে অভিযুক্ত আকাশ ও রুবেলের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দির বরাতে সিআইডি জানায়, ঘটনার দিন ভোরে চার ভাড়াটে হত্যাকারী মানিকের শোবার ঘরে প্রবেশ করে। আকাশ মানিকের পা চেপে ধরেন এবং রুবেল ও নিরঞ্জন তার হাত ও বুক চেপে ধরে রাখেন। লিয়াকত মুখ চেপে ধরে মানিককে মেঝেতে টেনে নামান এবং একটি ভারী দা দিয়ে তার গলা কেটে দেন।
মানিকের মৃত্যু নিশ্চিত করার পর হামলাকারীরা ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যায়।
পাঁচ অভিযুক্তই এখন পুলিশ হেফাজতে রয়েছে এবং তাদের দুজনের জবানবন্দি রেকর্ড করা হয়েছে। সিআইডিও অতি সম্প্রতি তাদের তদন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে শেষ করেছে।
তদন্ত কর্মকর্তা এসআই আনিসুর সাংবাদিকদের জানান, 'আদালতে জমা দেওয়ার আগে চূড়ান্ত পর্যালোচনার জন্য চার্জশিটের একটি খসড়া ইতোমধ্যে সিআইডি সদরদপ্তরে পাঠানো হয়েছে।'






