একটি পরিবারের প্রতিটি মানুষের জীবনকে সুন্দর ও সুশৃঙ্খল রাখতে প্রতিদিন অসংখ্য কাজ করা হয়। রান্না করা, ঘর গোছানো, সন্তানদের দেখাশোনা, পরিবারের বয়স্ক সদস্যদের যত্ন নেওয়া—এসব কাজের অধিকাংশই নীরবে করে যান নারীরা। অথচ এই শ্রমের অধিকাংশই থেকে যায় হিসাবের বাইরে, স্বীকৃতির আড়ালে। পরিবারের জন্য প্রতিদিন এত কিছু করার পরও নারীর এই অবদানকে অনেক সময় দায়িত্ব হিসেবে দেখা হয়, শ্রম হিসেবে নয়।
আমাদের সমাজে ঘরের কাজকে এখনো অনেক ক্ষেত্রে নারীর স্বাভাবিক দায়িত্ব বলে মনে করা হয়। ফলে এই কাজের জন্য আলাদা কোনো মূল্যায়ন বা স্বীকৃতির প্রয়োজন আছে বলে অনেকেই ভাবেন না। অথচ একটি পরিবার পরিচালনা করতে যে সময়, শ্রম, দক্ষতা ও ধৈর্যের প্রয়োজন হয়, তা কোনো অংশেই কম নয়। একজন নারী দিনের পর দিন বিনা পারিশ্রমিকে এসব দায়িত্ব পালন করেন; কিন্তু অর্থনৈতিক পরিমাপে এই শ্রমের অবদান সহজে দৃশ্যমান হয় না।
বিশ্বজুড়েই নারীরা পুরুষদের তুলনায় অবৈতনিক পরিচর্যা ও গৃহস্থালির কাজে বেশি সময় ব্যয় করেন। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার বিভিন্ন গবেষণায়ও এ বৈষম্যের চিত্র উঠে এসেছে। বাংলাদেশের বাস্তবতায়ও ঘরের কাজের বড় অংশ নারীদের ওপর নির্ভরশীল। বিশেষ করে গ্রামীণ ও নিম্ন আয়ের পরিবারগুলোয় নারীদের ঘরের কাজের পাশাপাশি কৃষিকাজ, গবাদিপশু পালন ও পরিবারের আয়ের সহায়ক নানা কাজেও যুক্ত থাকতে দেখা যায়। অথচ এসব কাজের অনেকটাই যথাযথভাবে মূল্যায়িত হয় না।
ঘরের কাজের স্বীকৃতির অভাব শুধু অর্থনৈতিক বিষয় নয়, এটি নারীর সামাজিক মর্যাদা, আত্মপরিচয় ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রেও প্রভাব ফেলে। অনেক ক্ষেত্রে ঘরের কাজে ব্যস্ত থাকার কারণে নারীরা শিক্ষা, কর্মসংস্থান, বিশ্রাম কিংবা ব্যক্তিগত বিকাশের পর্যাপ্ত সুযোগ পান না। অন্যদিকে একই পরিবারের উপার্জনকারী সদস্যের কাজকে বেশি গুরুত্ব দেওয়ার প্রবণতা নারীর অবদানকে আড়াল করে রাখে। তবে ঘরের কাজের মূল্যায়ন মানেই প্রতিটি পারিবারিক দায়িত্বের জন্য আর্থিক পারিশ্রমিক নির্ধারণ করা নয়; বরং এই শ্রমের গুরুত্ব স্বীকার করা, পরিবারের সদস্যদের মধ্যে দায়িত্ব ভাগ করে নেওয়া এবং নারীর বিশ্রাম, মতামত ও ব্যক্তিগত বিকাশের অধিকার নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি জাতীয় অর্থনৈতিক ও নীতিনির্ধারণী আলোচনায় অবৈতনিক গৃহস্থালি শ্রমের অবদানকে যথাযথভাবে বিবেচনায় আনা প্রয়োজন।
একটি পরিবার কেবল উপার্জনের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে না; এর ভিত্তি গড়ে ওঠে যত্ন, দায়িত্ব ও পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমে। তাই ঘরের কাজকে কেবল নারীর একক দায়িত্ব হিসেবে না দেখে পরিবারের সবার সম্মিলিত দায়িত্ব হিসেবে বিবেচনা করা জরুরি। নারীর শ্রমের স্বীকৃতি কোনো অনুগ্রহ নয়, এটি তার ন্যায্য সম্মান। যে শ্রমের ওপর একটি পরিবারের দৈনন্দিন জীবন নির্ভরশীল, সেই শ্রমকে অদৃশ্য করে রেখে প্রকৃত সমতা প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়। ঘরের কাজের মর্যাদা নিশ্চিত করা, দায়িত্ব ভাগ করে নেওয়া এবং নারীর অবদানকে যথাযথ সম্মান জানানোর মধ্য দিয়েই গড়ে উঠতে পারে একটি মানবিক ও বৈষম্যহীন সমাজ।



