যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক সেনা কর্মকর্তা নিদাল হাসানের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের দৃশ্য সরাসরি সম্প্রচারের পরিকল্পনা ঘিরে দেশটিতে তীব্র বিতর্ক তৈরি হয়েছে। আগামী ৩ ডিসেম্বর টেক্সাসের ফোর্ট হুডে এ দণ্ড কার্যকরের পরিকল্পনা রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ জানিয়েছেন, মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের দৃশ্য জনসাধারণ সরাসরি দেখতে পারবে। ধারণা করা হচ্ছে, প্রায় এক শতাব্দীর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে এই প্রথম কোনো মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের দৃশ্য সরাসরি সম্প্রচার করা হবে।
হেগসেথ বলেন, ‘মানুষকে বুঝতে হবে, এ ধরনের কাজের গুরুতর পরিণতি রয়েছে।
তবে এ সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেছেন মানবাধিকারকর্মী, আইনজীবী ও রাজনীতিকদের একাংশ। জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক দপ্তর জানিয়েছে, মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের দৃশ্য সরাসরি সম্প্রচার কার্যত প্রকাশ্যে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের শামিল হতে পারে। এটি নির্যাতনের ওপর আরোপিত নিরঙ্কুশ নিষেধাজ্ঞার সঙ্গেও সাংঘর্ষিক।
ডেমোক্র্যাট সিনেটর ক্রিস মারফি সিএনএনকে বলেন, এ ধরনের পরিকল্পনা ‘জঘন্য’। এটি উগ্রপন্থি ইসলামিক স্টেটের (আইএস) পরিচালিত মৃত্যুদণ্ডের কথা মনে করিয়ে দেয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত বন্দিদের নিয়ে কাজ করা আইনজীবী জন মিলস এ উদ্যোগকে ‘আধুনিক যুগে নজিরবিহীন’ বলে উল্লেখ করেছেন। তাঁর মতে, হাসানের মামলায় আপিলের প্রক্রিয়া এখনো শেষ হয়নি। তিনি ফেডারেল আদালতে দণ্ডাদেশ ও সাজা পুনর্বিবেচনার আবেদন করতে পারেন। সেক্ষেত্রে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের প্রক্রিয়া স্থগিত হতে পারে।
মিলস মনে করেন, মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের দৃশ্য সরাসরি সম্প্রচার এবং ফায়ারিং স্কোয়াডের মাধ্যমে সাজা কার্যকরের উদ্যোগ ট্রাম্প প্রশাসনের প্রচার পাওয়ার চেষ্টা। তার মতে, মৃত্যুদণ্ডটি বাস্তবে কার্যকর হওয়ার সম্ভাবনা কম।
ভার্জিনিয়ার বাসিন্দা নিদাল হাসান ছিলেন মার্কিন সেনাবাহিনীর একজন মনোরোগ চিকিৎসক। ২০০৯ সালে ফোর্ট হুডের একটি জনাকীর্ণ চিকিৎসাকেন্দ্রে গুলি চালিয়ে ১৩ জন নিরস্ত্র সেনাকে হত্যার দায়ে তিনি দণ্ডিত হন। হামলায় আরো অনেকে আহত হন।
২০১৩ সালে সামরিক আদালতে বিচার চলাকালে হাসান তার কর্মকাণ্ডের জন্য ক্ষমা চেয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, আফগানিস্তানে মুসলিম ও তালেবানদের রক্ষা করার উদ্দেশ্যে হামলাটি চালিয়েছিলেন বলে বিশ্বাস করতেন।
চলতি সপ্তাহের শুরুতে পেন্টাগন ঘোষণা দেয়, ছয় দশকের বেশি সময় পর প্রথমবারের মতো মার্কিন সামরিক বাহিনীতে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হবে। সোমবার পেন্টাগনের এক মুখপাত্র জানান, প্রতিরক্ষামন্ত্রীর সুপারিশে এ দণ্ড কার্যকরের অনুমোদন দিয়েছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
শুক্রবার ট্রাম্প বলেন, হাসানের ফায়ারিং স্কোয়াডের মাধ্যমে মৃত্যুদণ্ড হওয়া উচিত বলে তিনি মনে করেন। তবে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের দৃশ্য সরাসরি সম্প্রচারের বিষয়ে তিনি কোনো মন্তব্য করেননি।
রক্ষণশীল টেলিভিশন চ্যানেল ‘রিয়েল আমেরিকাস ভয়েস’-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে হেগসেথ বলেন, হাসানকে সেনাসদস্যদের একটি ফায়ারিং স্কোয়াড গুলি করে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করবে—‘যেমনটা হওয়া উচিত’। হাসানের শেষ ইচ্ছা কিংবা ট্রাম্পের সঙ্গে যোগাযোগের বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, ‘এসব নিয়ে আমার মাথাব্যথা নেই। ৩ ডিসেম্বর তাঁর সঙ্গে দেখা হবে।
হামলায় সাতবার গুলিবিদ্ধ হওয়া সাবেক মার্কিন সেনা সার্জেন্ট আলোনজো লান্সফোর্ড হাসানের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। বিবিসির ‘টুডে’ অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, হাসানের অপরাধের জন্য এ ধরনের শাস্তি উপযুক্ত।
তবে সবার জন্য মৃত্যুদণ্ডের দৃশ্য সরাসরি দেখার সুযোগ রাখার বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন তিনি। বিশেষ করে তরুণদের ওপর এর সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে চিন্তিত লান্সফোর্ড। অন্যদিকে, হামলায় নিহত সেনাদের পরিবার, বেঁচে যাওয়া ব্যক্তিদের পরিবার এবং আহতদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের দৃশ্য দেখার সুযোগ থাকা উচিত বলে মনে করেন তিনি।
অন্যদিকে, হাসানের মৃত্যুদণ্ড সরাসরি সম্প্রচারের সিদ্ধান্তের নিন্দা জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের ক্যাথলিক বিশপদের সংগঠন। সংগঠনটির সভাপতি আর্চবিশপ পল কোকলি এক বিবৃতিতে গভীর ধাক্কা ও দুঃখ প্রকাশ করেন।
তিনি বলেন, ‘আমাদের ঈশ্বর জীবনদাতা। হাসানের কর্মকাণ্ড কোনোভাবেই সমর্থনযোগ্য নয়। কিন্তু এই সিদ্ধান্ত মৃত্যুকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা সংস্কৃতির বর্বর প্রচার। সিদ্ধান্তটি পুনর্বিবেচনা করা উচিত।
যুক্তরাষ্ট্রে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের সময় সাধারণত নির্দিষ্ট কিছু ব্যক্তিকে উপস্থিত থাকার অনুমতি দেওয়া হয়। বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে সাংবাদিক, দণ্ডিত ব্যক্তির স্বজন এবং নির্দিষ্ট ব্যক্তিদের সাক্ষী হিসেবে উপস্থিত থাকার বিধান রয়েছে। তবে দেশটিতে এর আগে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের দৃশ্য সরাসরি সম্প্রচার করা হয়নি বলে জানিয়েছেন ফোর্ডহাম বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অধ্যাপক ডেবোরা ডেনো।
মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের বিভিন্ন পদ্ধতি নিয়ে গবেষণা করা ডেনো বলেন, সরাসরি সম্প্রচার করা হলে যুক্তরাষ্ট্রে এমন এক ধরনের স্বচ্ছতা তৈরি হবে, যা আগে দেখা যায়নি। তার মতে, মৃত্যুদণ্ডের পক্ষে অবস্থান নেওয়া ব্যক্তিদেরও এটি কীভাবে কার্যকর করা হয়, তা দেখার সুযোগ দেওয়া যেতে পারে।
তবে এক্ষেত্রে বয়সসীমা নির্ধারণ গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন তিনি। মার্কিন সেনাবাহিনীর বিধিমালা অনুযায়ী, সাংবাদিক ও দণ্ডিত ব্যক্তির স্বজনদের মতো নির্দিষ্ট শ্রেণির মানুষ সামরিক মৃত্যুদণ্ড প্রত্যক্ষ করতে পারেন। ১৮ বছরের কম বয়সীদের এ সুযোগ দেওয়া হয় না।
সরাসরি সম্প্রচারের ক্ষেত্রেও এসব বিধিনিষেধ বহাল থাকবে কি না, প্রতিরক্ষা দপ্তরের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, এ বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য পরে জানানো হবে।
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বিশ্বের ১৭টি দেশে দুই হাজার ৭০০-এর বেশি মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে। এর মধ্যে প্রকাশ্যে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনা জানা গেছে ইরান ও আফগানিস্তানে। ইরানে ১১টি এবং আফগানিস্তানে ছয়টি এমন ঘটনার তথ্য পাওয়া গেছে।
পিউ রিসার্চ সেন্টারের গত জুলাইয়ের এক জরিপে দেখা যায়, যুক্তরাষ্ট্রের ৬৬ শতাংশ মানুষ হত্যার দায়ে দণ্ডিত ব্যক্তিদের মৃত্যুদণ্ড সমর্থন করেন। গত পাঁচ বছরে এ সমর্থন ছয় শতাংশ বেড়েছে।
হোয়াইট হাউসে ফিরে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প জো বাইডেনের সময়ে ফেডারেল পর্যায়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ওপর আরোপিত স্থগিতাদেশ তুলে নেন।
যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীতে সর্বশেষ মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছিল ১৯৬১ সালে। ওই বছর ১১ বছর বয়সী এক অস্ট্রীয় মেয়েকে ধর্ষণের দায়ে দোষী সাব্যস্ত এক মার্কিন সেনাকে ফাঁসি দেওয়া হয়। তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ডোয়াইট ডি আইজেনহাওয়ার মৃত্যুদণ্ডের অনুমোদন দিয়েছিলেন। ভুক্তভোগীর পরিবার পরবর্তী প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডির কাছে ক্ষমার আবেদন জানালেও দণ্ড কার্যকর করা হয়।
অন্যদিকে, ফায়ারিং স্কোয়াডের মাধ্যমে মার্কিন সামরিক বাহিনীতে সর্বশেষ মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছিল ১৯৪৫ সালের জানুয়ারিতে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষ পর্যায়ে এডি স্লোভিক নামের এক মার্কিন সেনাকে সেনাবাহিনী থেকে পালিয়ে যাওয়ার অপরাধে গুলি করে হত্যা করা হয়।
সামরিক আইন অনুযায়ী, মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে প্রেসিডেন্টের অনুমোদন এবং উচ্চতর আদালতে আপিলের প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়া প্রয়োজন। হাসানের মামলায় সেই প্রক্রিয়া শেষ না হওয়ায় ৩ ডিসেম্বর নির্ধারিত দণ্ড কার্যকর হবে কি না, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে।



