রবিবার, ১১ অক্টোবর, ২০২৬
২৫শে আশ্বিন, ১৪৩৩

ডেইলি বরিশাল

দক্ষিণাঞ্চলের শীর্ষস্থানীয় ও বস্তুনিষ্ঠ দৈনিক পত্রিকা

ধর্ম ও জীবন

সবাই যখন ফিনিশিং লাইনে, বাংলাদেশ তখন স্টার্টিং পয়েন্টেও নেই!

সবাই যখন ফিনিশিং লাইনে, বাংলাদেশ তখন স্টার্টিং পয়েন্টেও নেই!...

ন
নাজমুল ইসলাম· বিশ্লেষক
প্রকাশ: ১১ অক্টোবর ২০২৬, ৯:২৫ এএমসর্বশেষ: ১১ অক্টোবর ২০২৬, ৯:২৫ এএম
সবাই যখন ফিনিশিং লাইনে, বাংলাদেশ তখন স্টার্টিং পয়েন্টেও নেই!

দক্ষিণ এশিয়ার প্রায় সবাই পারে, বাংলাদেশ পারে না। অনেক আশা, প্রত্যাশা আর প্রতিশ্রুতির ঝুলি নিয়ে জাপানের এশিয়ান গেমসে গিয়েছিল বাংলাদেশ। ফিরেছে একটিমাত্র ব্রোঞ্জ নিয়ে। এ যেন প্রত্যাশার পাহাড় ভেঙে হতাশার ধুলোয় মুখ থুবড়ে পড়া। অথচ এ দৃশ্য নতুন নয়। প্রতিবারই একই গল্প, একই ব্যর্থতা, একই অজুহাত। বদলায় শুধু গেমসের নাম, বদলায় আয়োজক দেশ; বদলায় না বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনের দৈন্যদশা।

অন্য দেশগুলো যখন পদকের জন্য ফিনিশিং লাইনে বুক চিতিয়ে লড়ছে, বাংলাদেশ তখন অনেক ক্ষেত্রেই স্টার্টিং পয়েন্টে পৌঁছানোর প্রস্তুতিটুকুও শেষ করতে পারেনি। ব্যবধানটা এখানেই। কেউ পদকের রঙ নিয়ে ভাবে, বাংলাদেশ ভাবে কীভাবে অংশগ্রহণটুকু নিশ্চিত করে আনুষ্ঠানিকতা সেরে দেশের বিমানে চড়ে বসা যায়। পদক তালিকায় বাংলাদেশের নাম খুঁজতে হয় আতিপাঁতি করে। দক্ষিণ এশিয়ার অন্য দেশগুলো যখন একের পর এক পদক ঘরে তুলছে, তখন আমাদের সান্ত্বনা একটিমাত্র ব্রোঞ্জ। এই ফল কোনো বিচ্ছিন্ন দুর্ঘটনা নয়; বছরের পর বছর ধরে ক্রীড়াঙ্গনে জমে থাকা অবহেলা, অদক্ষতা, অযোগ্যতা আর দায়িত্বহীনতার অনিবার্য পরিণতি।

গেমসে যাওয়ার ব্যাপারে ফেডারেশন কর্মকর্তা-সংগঠকদের উৎসাহের কমতি নেই। তদবির, দেনদরবার আর মন্ত্রণালয়ের দরজায় ছোটাছুটিতে তারা যথেষ্ট সক্রিয়। কিন্তু পদক জেতার প্রস্তুতিতে সেই তৎপরতার ছিটেফোঁটাও দেখা যায় না। নামকাওয়াস্তে অনুশীলন, অপ্রতুল প্রস্তুতি আর প্রতিযোগিতামূলক ম্যাচের অভাব নিয়ে এশিয়ান গেমসের মতো মঞ্চে গিয়ে পদকের স্বপ্ন দেখা নিছক আত্মপ্রবঞ্চনা। যে খেলোয়াড় নিয়মিত শক্ত প্রতিপক্ষের মুখোমুখি হন না, যার প্রস্তুতি পর্যবেক্ষণের কেউ নেই, যিনি পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ ও সহায়তা পান না—তিনি আন্তর্জাতিক মঞ্চে হঠাৎ জাদু দেখাবেন, এমন প্রত্যাশা বাস্তবতাবিবর্জিত।

মন্ত্রণালয়ে তদবির করে, প্রভাব খাটিয়ে নাম কা ওয়াস্তে থাকা অনেক ফেডারেশনও শেষ পর্যন্ত গেমসে যাওয়ার ব্যবস্থা করে ফেলে। কিন্তু কোন খেলায় পদকের বাস্তব সম্ভাবনা আছে, কোন খেলায় বিনিয়োগ করলে ভবিষ্যতে ফল মিলতে পারে; সেই হিসাবের খাতায় কেউ চূড়ান্ত হিসাবের দু’ঘর আর মেলাতে পারেন না, শেষফল তাই অনিশ্চিতই থেকে যায়। গেমসে যাওয়া যেন মূল লক্ষ্য; অনেকটা পিকনিকের মতো। অথচ জনগণের করের টাকায় বিদেশ সফর কোনো প্রমোদভ্রমণ নয়। এটি দেশের প্রতিনিধিত্ব, যেখানে প্রতিটি সুযোগের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে দায়িত্ব ও জবাবদিহিতা।

এবারের এশিয়ান গেমসে বাংলাদেশের ফুটবল ও হকির বড় ব্যবধানের হারগুলোও কঠিন প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। ১৩-০ কিংবা ১৫-০ গোলে হারার পরও যদি কারও জবাবদিহিতা করতে না হয়, তাহলে ব্যর্থতার দায় নেবে কে? ফেডারেশন বলবে প্রস্তুতির সময় ছিল না, কর্মকর্তা বলবেন সামর্থ্য ছিল না, কোচ বলবেন দল গুছিয়ে ওঠার সুযোগ পাননি। সবাই অজুহাত সাজাবেন, কিন্তু দায় নেওয়ার সময় কাউকে পাওয়া যাবে না। এভাবে চলতে পারে না। এমন হার শুধু স্কোরবোর্ডে লজ্জার সংখ্যা বাড়ায় না; খেলোয়াড়দের আত্মবিশ্বাসে আঘাত করে, ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা নষ্ট করে এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের ভাবমূর্তিতেও কালি ছিটায়।

এবারের গেমসে ক্রীড়া প্রশাসনের আরো ভয়াবহ চিত্র বেরিয়ে এসেছে। কোচকে সরিয়ে কর্মকর্তাদের কোচের ভূমিকায় অবতীর্ণ হওয়ার নজিরও দেখা গেছে। যার কাজ কৌশল নির্ধারণ, প্রশিক্ষণ পরিচালনা ও খেলোয়াড়দের প্রস্তুত করা, সেই পেশাদার কোচকে বাদ দিয়ে কর্মকর্তারা যদি দলের সঙ্গে সফরে গিয়ে সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেন, তাহলে ফল ভালো হওয়ার আশা কোথায়? প্রশাসনিক পদবি কখনোই কোচিংয়ের যোগ্যতার বিকল্প হতে পারে না। মাঠের কৌশল নির্ধারণ করবেন বিশেষজ্ঞ; কর্মকর্তাদের দায়িত্ব হবে প্রয়োজনীয় পরিবেশ ও সহায়তা নিশ্চিত করা। এই মৌলিক বিভাজনটুকু যারা বোঝেন না, তাদের হাতে ক্রীড়াঙ্গনের ভবিষ্যৎ ছেড়ে দেওয়া বিপজ্জনক।

ব্যাডমিন্টন দলের জার্সি নিয়ে ঘটে যাওয়া ঘটনাটিও এই অপেশাদারিত্বের জ্বলন্ত উদাহরণ। জার্সির মাপ কেমন হবে, তাতে খেলোয়াড় ও দেশের নাম কীভাবে লিখতে হবে—এমন মৌলিক বিষয়েও যদি প্রস্তুতির ঘাটতি থাকে, তাহলে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন উঠবেই। শেষ মুহূর্তে শহর থেকে জার্সি কিনে পরদিন খেলতে নামার মতো পরিস্থিতি এশিয়ান গেমসের মতো আসরে কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এটি নিছক একটি দলের ভুল নয়; ফেডারেশনের পুরো ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা, পরিকল্পনাহীনতা ও দায়িত্বহীনতার প্রতিচ্ছবি।

সম্ভাবনা নেই, প্রস্তুতি নেই, পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ নেই—তবু গেমস এলেই বিদেশ যাওয়ার হিড়িক। এই অসুস্থ সংস্কৃতি বন্ধ করতেই হবে। ক্রীড়াবিদদের স্বপ্নকে ফেডারেশন কর্মকর্তাদের সফরের টিকিট বানানোর সুযোগ আর দেওয়া যায় না। এখন প্রশ্ন হলো, এই ব্যর্থতার বৃত্ত থেকে বেরিয়ে আসার পথ কী?

প্রথমত, সব ডিসিপ্লিনে ঢালাওভাবে ক্রীড়াবিদ পাঠানোর প্রবণতা বন্ধ করতে হবে। কোন খেলায় পদকের বাস্তব সম্ভাবনা আছে, কোন খেলায় দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ করলে ফল আসতে পারে তার নিরপেক্ষ মূল্যায়ন করতে হবে। নির্দিষ্ট ডিসিপ্লিনে পরিকল্পিত ও পর্যাপ্ত বিনিয়োগ করলে পদকের সম্ভাবনা বাড়তে পারে, কমবে অপ্রয়োজনীয় ব্যয়ও। অংশগ্রহণের সংখ্যা বাড়ানো নয়, বাড়াতে হবে প্রতিযোগিতার সক্ষমতা।

দ্বিতীয়ত, দল বা টিম ডিসিপ্লিন নির্বাচনে তদবির নয়, যোগ্যতাই হতে হবে একমাত্র মাপকাঠি। সাম্প্রতিক পারফরম্যান্স, র‍্যাংকিং, ফিটনেস ও প্রস্তুতির ভিত্তিতে দল গঠন করতে হবে। মন্ত্রণালয়ে কার যাতায়াত বেশি, কার প্রভাব বেশি; সেটি কোনো বিবেচ্য বিষয় হতে পারে না। এই ঘৃণ্য প্রক্রিয়াকে ছুড়ে ফেলতে হবে নিঃসংকোচে। যে ক্রীড়াবিদ মাঠে নিজেকে প্রমাণ করেছেন, তারই সুযোগ পাওয়ার কথা। একইভাবে দলের সঙ্গে সফরে কর্মকর্তা পাঠানোর ক্ষেত্রেও প্রয়োজনের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। ফেডারেশনের সভাপতি বা সাধারণ সম্পাদক হলেই সরকারি খরচে বিদেশ যাওয়ার অধিকার জন্মায় না। এই সুবিধাভোগী সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।

তৃতীয়ত, গেমসের অন্তত দুই থেকে তিন বছর আগে থেকেই পরিকল্পিত প্রস্তুতি শুরু করতে হবে। যোগ্য কোচ, নিয়মিত প্রতিযোগিতামূলক ম্যাচ, আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা, প্রয়োজনমাফিক বিদেশে প্রশিক্ষণ এবং দীর্ঘমেয়াদি ফিটনেস পরিকল্পনা; সবকিছু থাকতে হবে সেই প্রস্তুতির অংশ হিসেবে। কেবল কাগজে-কলমে ক্যাম্প দেখিয়ে কিংবা শেষ মুহূর্তে কয়েকটি অনুশীলন করিয়ে পদক জেতা যায় না। প্রশিক্ষণকালীন ক্রীড়াবিদদের আর্থিক সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে। দিনের হিসাবে ৪৫০ টাকা ভাতা দিয়ে একজন আন্তর্জাতিক মানের খেলোয়াড়ের প্রস্তুতির চাহিদা পূরণ হয় কি না, সেটিও নতুন করে ভাবতে হবে। প্রশিক্ষণের জন্য বরাদ্দ অর্থ সত্যিকার অর্থেই প্রশিক্ষণে ব্যয় হচ্ছে কি না, তার হিসাব প্রকাশ করতে হবে।

চতুর্থত, কোচের কাজ কোচকেই করতে দিতে হবে। কর্মকর্তারা প্রশাসনিক ও সাংগঠনিক দায়িত্ব পালন করবেন; মাঠের কৌশল নির্ধারণ করবেন পেশাদার কোচ। সফরসঙ্গী বাছাইয়ে অগ্রাধিকার পেতে হবে কোচ, ট্রেনার, ফিজিও ও টেকনিক্যাল স্টাফদের। ফেডারেশনের শীর্ষ পদে বসে থাকলেই দলের সঙ্গে বিদেশ সফরের টিকিট নিশ্চিত, এমন জমিদারি প্রথা আর চলতে পারে না। সরকারি সফর কোনো পদাধিকারীর ব্যক্তিগত সুযোগ-সুবিধা নয়।

পঞ্চমত, প্রতিটি বড় ব্যর্থতা ও অব্যবস্থাপনার জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। কোন ফেডারেশন কী প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, কী প্রস্তুতি নিয়েছিল, কত অর্থ পেয়েছিল এবং শেষ পর্যন্ত কী অর্জন করেছে—সবকিছুর হিসাব প্রকাশ করতে হবে। তদন্ত হবে, প্রতিবেদন প্রকাশিত হবে, দায় প্রমাণিত হলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বারবার ব্যর্থতার পরও যদি একই ব্যক্তিরা একই চেয়ারে বসে থাকেন, তাহলে পরিবর্তনের আশা অর্থহীন। কোনো ফেডারেশনের চেয়ার কারো ব্যক্তিগত সম্পত্তি কিংবা বংশপরম্পরায় পাওয়া জমিদারি নয়। ক্রীড়াবিদ ব্যর্থ হলে যেমন মূল্যায়ন হবে, তেমনি তাদের প্রস্তুতিতে ব্যর্থ ফেডারেশন ও কর্মকর্তাদেরও জবাব দিতে হবে।

ষষ্ঠত, তৃণমূল থেকে প্রতিভা তুলে আনার স্থায়ী কাঠামো গড়ে তুলতে হবে। স্কুল, কলেজ, জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ে নিয়মিত প্রতিযোগিতা না থাকলে জাতীয় দলের জন্য মানসম্পন্ন খেলোয়াড় তৈরি হবে না। প্রতিভা খুঁজে বের করা, বয়সভিত্তিক প্রশিক্ষণ, দীর্ঘমেয়াদি পরিচর্যা এবং ধাপে ধাপে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তুলে আনার ব্যবস্থা করতে হবে। গেমসের আগে তড়িঘড়ি দল গঠন করে পদকের স্বপ্ন দেখানো বন্ধ হোক।

এশিয়ান গেমস চার বছর পরপর আসে। প্রতিবারই বাংলাদেশ একই প্রশ্নের সামনে দাঁড়ায়—পদক কোথায়? অথচ প্রশ্নটি শুধু পদক নিয়ে নয়; প্রশ্ন হলো, প্রস্তুতি কোথায়, পরিকল্পনা কোথায়, বিনিয়োগের ফল কোথায় আর জবাবদিহি কোথায়?

একটি ব্রোঞ্জ পদককে ছোট করে দেখার সুযোগ নেই। জিন্নাত আক্তারের অর্জন তার পরিশ্রম, লড়াই ও সামর্থ্যের স্বীকৃতি। কিন্তু মাত্র একজন ক্রীড়াবিদের সাফল্য দিয়ে একটি দেশের সামগ্রিক ব্যর্থতা আড়াল করা যায় না। বরং তার অর্জন দেখিয়ে দিয়েছে, সুযোগ পেলে বাংলাদেশের ক্রীড়াবিদরাও নিজেদের মেলে ধরতে পারেন। এখন প্রয়োজন তাদের জন্য সঠিক পরিবেশ তৈরি করা।

অন্যরা যখন ফিনিশিং লাইনে পদকের লড়াই করছে, বাংলাদেশ তখনো স্টার্টিং পয়েন্টে দাঁড়িয়ে থাকবে—এ দৃশ্য আর কত দিন? শুরুটাই যদি ঠিক না হয়, ফিনিশিং লাইন তো বহু দূরের কথা। এবার অন্তত অজুহাতের দৌড় থামিয়ে কাজের দৌড় শুরু হোক। দেশের ক্রীড়াঙ্গনকে কর্মকর্তাদের বিদেশ সফরের ব্যবস্থাপনা থেকে বের করে ক্রীড়াবিদদের স্বপ্নপূরণের জায়গায় ফিরিয়ে আনতে হবে।

নাহলে চার বছর পর আবারও একই প্রশ্ন, একই হতাশা, একই লজ্জা নিয়ে আমাদের ফিরতে হবে।

📢এই সংবাদটি শেয়ার করুন

📢 আপনিও হোন পাঠক সাংবাদিক!

আপনার এলাকার যেকোনো খবর, সমস্যা বা ভিডিও সরাসরি আমাদের নিউজ পোর্টালে জমা দিন

সংবাদ পাঠান ↗
ন

নাজমুল ইসলাম

বিশ্লেষক

রাজনৈতিক রিপোর্টার, বিশ্লেষক ও কলামিস্ট।

সম্পর্কিত আরও সংবাদ