। নতুন করে সার ডিলার নিয়োগে যোগ্যতা এবং সরকারি বিধি অনুসরণ না করে বর্তমান সরকার আওয়ামী লীগের পথ অনুসরণ করেছে বলে অনেকের অভিযোগ। এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ত্যাগী কর্মীরা বিএনপি নেতাদের বিরুদ্ধে নানা কটূক্তি এবং কঠোর সমালোচনা করেছেন। এতে সাধারণ মানুষের মাঝে বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। এ ঘটনায় জামায়াতে ইসলামীর নেতারাও নিন্দা জানিয়েছেন।
সার ডিলার নিয়োগের বিষয়ে কাউনিয়ার ব্যবসায়ী আমজাদ হোসেন, মিঠাপুকুরের আহমদ আলী, পীরগঞ্জের মনসুর মিয়া এবং বদরগঞ্জের সরোয়ার জাহান কে বলেন, সবার ধারণা ছিল বর্তমান সরকার স্বচ্ছতার ভিত্তিতে প্রকৃত ব্যবসায়ীদের সার ডিলার নিয়োগ দেবেন। সরকারি বিধি অনুযায়ী যোগ্য এবং কৃষকদের সঙ্গে সম্পৃক্ততা রয়েছেÑতাদের যাচাই-বাছাই করে নতুন করে সার ডিলার নিয়োগ দেওয়া হবে বলে আশা করা হয়েছিল। কিন্তু বর্তমান সরকার বিএনপির নেতাদের পরামর্শে নেতাদের পরিবারের সদস্য এবং অর্থের বিনিময়ে সুবিধাভোগীদের সার ডিলার নিয়োগ দিয়ে আওয়ামী লীগের পথ অনুসরণ করেছে। এতে আগে যেমন সারের সংকট সৃষ্টি হয়েছিল, তা থেকে বের হওয়া কঠিন হয়ে পড়বে বলে তারা মন্তব্য করেন।
কারণ হিসেবে তারা বলেন, যাদের নামে ডিলারশিপ দেওয়া হয়েছে, তারা প্রকৃতপক্ষে ব্যবসায়ী নন। তারা যদি সারের বরাদ্দ পান তাহলে কালোবাজারে খুচরা সার বিক্রেতাদের কাছে বেশি দামে বিক্রি করে আবারো কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করতে পারে। বিষয়টি সরকারের ভেবে দেখা উচিত।
পীরগাছা উপজেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক জুয়েল কে বলেন, তৃণমূলের ত্যাগী নেতাকর্মীদের বাদ দিয়ে অর্থের বিনিময়ে সুবিধাভোগীদের সার ডিলার নিয়োগ দেওয়ায় তৃণমূল বিএনপিতে বিভক্তি দেখা দিয়েছে।
উপজেলা নেতাদের নামে নানা কটূক্তিমূলক স্ট্যাটাস দিয়ে সাধারণ মানুষের কাছে বিএনপি সরকারকে প্রশ্নের সম্মুখীন করেছেন।
তিনি আরো বলেন, পীরগাছায় নতুন করে সার ডিলার নিয়োগে যাদের নাম তালিকায় এসেছে, তারা কেউ ত্যাগী নেতাকর্মী না। অর্থের বিনিময় ত্যাগীদের বাদ দিয়ে সারের ডিলার নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
বদরগঞ্জ উপজেলা ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি এবং উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান বিএনপি নেতা সাইদুল হক কে বলেন, যারা বিগত ১৭ বছর আওয়ামী লীগের রোষানলে পড়ে জেল-জুলুম ও অত্যাচার সহ্য করেছে, তাদের বাদ দিয়ে উপজেলা ও জেলার নেতারা ফ্যাসিস্টের সুবিধাভোগীদের সারের ডিলার নিয়োগ দিয়েছে। তাদের এই হঠকারী সিদ্ধান্ত তৃণমূল বিএনপির নেতাকর্মীরা মেনে নেবে না। এর জবাব আমরা রাজপথে দেব।
তিনি ১৩ নং কালুপাড়া ইউনিয়নের সার ডিলার নিয়োগের প্রসঙ্গ টেনে বলেন, এই ইউনিয়নে বিএনপির বেশ কয়েকজন ত্যাগী নেতাকর্মী সারের ডিলারশিপের জন্য আবেদন করেছিলেন। কিন্তু জেলা ও উপজেলা নেতারা আওয়ামী লীগের সুবিধাভোগী শহিদুল হক মানিকের মেয়ে অরিনের নামে নতুন করে সারের ডিলারশিপ দিয়েছেন। নেতাদের এই খামখেয়ালিপনা এবং অর্থের প্রতি লোভ দলকে আবার পিছিয়ে দেবে। এর প্রভাব পড়বে সামনের নির্বাচনগুলোতে। তাই বিএনপি সরকারের উচিত ত্যাগীদের মূল্যায়ন করা।
দিনাজপুরের পার্বতীপুরের জমশেদ আলী বলেন, সার ডিলার নিয়োগ পাওয়ার জন্য আমি বিএনপির এক নেতাকে ১০ লাখ টাকা দিয়েছি। কিন্তু তালিকায় আমার নাম আসেনি।
একই অভিযোগ করে বদরগঞ্জের জাহাঙ্গীর আলম বলেন, আমার সঙ্গে ১২ লাখ টাকা চুক্তি হয়েছিল, ছয় লাখ টাকা দিয়েছি। তিনজনের মধ্যে আমার নাম পাঠানো হয়েছিল। তালিকা প্রকাশের পর দেখি, আমার নাম নেই। এখন কীভাবে টাকা উঠাব, সেটা নিয়ে চিন্তায় পড়েছি।
উপজেলা জামায়াতের আমির কামরুজ্জামান কবির কে বলেন, রংপুরের ছয়টি আসনের পাঁচটিতে জামায়াত এবং একটিতে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) এমপি নির্বাচিত হয়েছে। কিন্তু কোথাও জামায়াত বা এনসিপির নেতাকর্মীদের নামে সারের ডিলার নিয়োগ দেওয়া হয়নি। যে তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে, তাতে শুধু বিএনপি নেতাদের পরিবার এবং আওয়ামী লীগের সুবিধাভোগীদের নাম রয়েছে।
তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, সরকার যেভাবে আওয়ামী লীগের পথ অনুসরণ শুরু করেছে, তাতে রাজপথে নামা ছাড়া বিকল্প পথ খোলা নেই। কারণ এই দলীয়করণ এবং একনায়কতন্ত্রের বিরুদ্ধে ছাত্র-জনতা জীবন বাজি রেখে ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারকে তাড়িয়েছে। বিএনপি এই পথ অনুসরণ করলে সামনের দিন তাদেরও ভালো হবে না।
বদরগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসার সদ্য বদলি হওয়া আঞ্জুমান সুলতানা বলেন, তালিকা নিয়ে জেলা বিএনপির আহ্বায়ক সাইফুল ইসলামের কঠোর নির্দেশনা ছিল। তিনি বারবার বলেছেন, এক নম্বরে বিএনপি নেতাকর্মীদের নাম রাখতে হবে। জামায়াত ও এনসিপি নেতাকর্মীদের রাখা যাবে না। এরপরেও আমরা তিন জনের নাম দিয়ে তালিকা করে জেলায় পাঠিয়েছি।
এ বিষয়ে জেলা বিএনপির আহ্বায়ক ও জেলা পরিষদ প্রশাসক সাইফুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি ফোন রিসিভ না করায় বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।
রংপুর জেলা প্রশাসক ইসরাত জাহান কে বলেন, সার ডিলার নিয়োগের বিষয়টি সরকারের এখতিয়ারের মধ্যে। উপজেলা প্রশাসন যেভাবে আমাদের কাছে তালিকা পাঠিয়েছে, আমরাও সেভাবে মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছি। তারা কীভাবে তালিকা প্রকাশ করেছেন, সেটি তাদের বিষয়। এখানে আমাদের কিছু করার নেই।
বাছাই কমিটির সদস্য ও জেলা বিএনপির ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক সাবেক এমপি অধ্যাপক পরিতোষ চক্রবর্তী জানান, নতুন করে সার ডিলার নিয়োগের তালিকা প্রকাশে কোনো অনিয়ম করা হয়নি।
তৃণমূল নেতাকর্মীরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নেতাদের নিয়ে নানা কটূক্তিমূলক স্ট্যাটাস দিচ্ছেÑএমন প্রশ্নে তিনি বলেন, তারা না বুঝে এমন স্ট্যাটাস দিচ্ছে।
যাদের নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, তারা সবাই বিএনপির। জামায়াত ও এনসিপির কোনো নেতাকর্মীর নাম তালিকায় নেইÑ এমন প্রশ্ন করা হলে তিনি কোনো উত্তর দিতে রাজি হননি।
রংপুর-৩ আসনের জাতীয় সংসদ সদস্য জামায়াতের কেন্দ্রীয় শূরা কমিটির সদস্য অধ্যাপক মাহবুবুর রহমান বেলাল কে বলেন, বিএনপি সরকার এমনভাবে দলীয়করণ শুরু করেছে যে, সামান্যতম সার ডিলার নিয়োগের ক্ষেত্রে যোগ্যতা এবং বিধি-বিধানের তোয়াক্কা করেনি। তারা কৌশল করে এক দুই তিন সিরিয়াল করেছিল। এক নম্বরে তাদের দলীয় লোক এবং যাদের কাছে টাকা নিয়েছিল তাদের নাম রেখে সার ডিলারের তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে। আমরা এর তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাই।



